আজাদ হিন্দ ফৌজের হাজারো সৈন্যের শহীদ স্থান ঝিকরগাছা

আজাদ হিন্দ ফৌজের হাজারো সৈন্যের শহীদ স্থান ঝিকরগাছা

কলাম ও ফিচার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাজেদ রহমান, সিনিয়র সাংবাদিক।।

আজাদ হিন্দ ফৌজের হাজারো সৈন্যের শহীদ স্থান ঝিকরগাছা। ব্রিটিশ আর্মির নির্মম নির্যাতন ও বুলেটের আঘাতে যশোরের ঝিকরগাছায় জীবন প্রদীপ নিভেছিল নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বাধীন আজাদ হিন্দ ফৌজের বহু সেনার।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের আত্মসমর্পনে যখন অনিশ্চিত হয়ে যায় স্বাধীনতার জন্য আজাদ হিন্দ ফৌজের ভারত অভিযান ঘটনাটি তখনকার ১৯৪৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরের।

পশ্চিমবঙ্গের ব্যারাকপুরের নীলগঞ্জে ব্রিটিশ আর্মির ট্রানজিট ক্যাম্পে বহু আজাদ হিন্দ সেনাদের ‘নেতাজি জিন্দাবাদ’ ‘আজাদহিন্দ জিন্দাবাদ’ ধ্বনি দেওয়ার অপরাধে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়।

স্থানীয়দের সরব তৎপরতা ও নেতাজিপ্রেমী-গবেষকদের প্রয়াসে নীলগঞ্জ ট্রাজেডির অনেক কিছুই এখন উদঘাটিত। কিন্তু দেশভাগের পরিণতিতে চাপা পড়ে যায় ঝিকরগাছার বর্বরতার ইতিহাস।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত সরকার নেতাজি ও আজাদ হিন্দ ফৌজ সংক্রান্ত বেশকিছু সরকারি নথি সর্বসাধারণের জন্য উন্মূক্ত করলে সেখানেও মেলে ব্রিটিশ আর্মির ট্রানজিট ক্যাম্পগুলোতে বন্দী সেনানিদের ওপর বর্বরতার প্রমাণ। ব্যারাকপুরের নীলগঞ্জের সঙ্গে যশোহরের ঝিকরগাছার নাম পাওয়া যাচ্ছে অসংখ্য ডকুমেন্টে।

কানাইলাল বসুর ‘নেতাজি : রিডিসকভার্ড’ গ্রন্থেও স্পষ্ট করে রয়েছে ঝিকরগাছার নাম। লেখক সেখানে সংখ্যা উল্লেখ করতে না করলেও বহু আজাদ হিন্দের সেনাদের এখানে অন্তরীন রাখার কথা তিনি জানাচ্ছেন। এসব সেনাদের ভাগ্যে কী পরিণতি ঘটেছিল তা তিনি জানাতে পারেননি। সাত দশক আগে যে জনপদ রঞ্জিত হয়েছিল আজাদ হিন্দের বীর শহিদদের পবিত্র রক্তে, কপোতাক্ষ নদে যাঁদের অন্তিম ঠাঁই হয়েছিল-তাদের কথা হয়ত অনেকে জানেন না।

ঝিকরগাছার কাটাখালের পাশে সম্মিলনী কলেজ ও সংলগ্ন এলাকাটিতেই ছিল ব্রিটিশ আর্মির ট্রানজিট ক্যাম্প। সেনা ছাউনি বা আর্মিদের কর্মকান্ডের গোপনীয়তা রক্ষায় কৃষ্ণনগরের জনবসতির সিংহভাগই খালি করে ফেলা হয়। ঝিকরগাছায় আজাদ হিন্দের সেনাদের ভাগ্যে আসলে কী ঘটেছে তা স্থানীয়রা আদৌ আঁচ করতে পারেনি।

প্রবীন ব্যক্তিরা বলছেন, ‘বর্তমানে যেটা ঝিকরগাছা উপজেলা পরিষদ, সেখানেও ব্রিটিশের মিলিটারিরা থাকতো। দেয়ালে-সীমানা প্রাচীরের চারদিকে তারকাটা-পেরেক পোতা থাকতো। শুনতাম ভয়ঙ্কর সেনাদের এখানে রাখা হতো। এদেরকে সামলাতো গোর্খা সৈন্যরা’। সামরিক ব্যারাক থেকে কিছু সেনাদের মুক্তি মিলেছিল। তবে বাকীদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল তা জানা যায়নি।

তারা আরও জানান, বন্দি সেনারা যাতে করে বিদ্রোহ করতে না পারে-তার জন্য ঝিকরগাছায় ৪টি ট্রানজিট ক্যাম্পে বিভক্ত করে রাখা হয় আজাদ হিন্দের সেনাদের। ক্যাম্পগুলো হচ্ছে-কৃষ্ণনগর, কীর্তিপুর, মোবারকপুর ও পায়রাডাঙ্গা। এর মধ্যে পায়রাডাঙ্গায় রাখা হতো সবচে বিপজ্জনক সেনাদের। বর্তমানে সরকারি শিশুসদন হিসেবে ব্যবহৃত ওই স্থানটিতে আজাদ হিন্দের সেনাদের খুব গোপনে ফাঁসি দেওয়া হত।

ফাঁসি কার্যকরের পরে একটি বিশালাকারের বর্গাকার সুউচ্চ স্থাপনা তৈরি করা হয়। যার নীচে ছিল অন্ধকূপ। জনশ্রুতি রয়েছে, এই কূপের সঙ্গে সংযোগ ছিল কপোতাক্ষের। জোয়ার-ভাটায় ফাঁসি হওয়া সেনার দেহ নদীতে ভেসে যেত। নদীর সঙ্গে সেই সুড়ঙ্গ বা কূপটি না থাকলেও বর্বরতার সেই স্মৃতি হয়ে আজও টিকে আছে ফাঁসি কার্যকরের উচু ঘরটি।

স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক কিলোমিটার পর্যন্ত জনবসতি উঠিয়ে দিয়ে ব্রিটিশ আর্মি অতি গোপনীয়তায় সেনাদের আনা-নেওয়া এবং ‘চরম শাস্তি’ কার্যকর করতো।

আর্মির সবচেয়ে সুরক্ষিত ও নির্মমতার এই ক্যাম্পটির বিষয়ে অনেকে জানলেও স্বাধীন ভারতের বা বাংলাদেশের কোনো রাজনৈতিক নেতা বা সরকারি কর্মকর্তা স্থানটিতে শহিদদের জন্য কোনো স্মৃতিফলক নির্মাণের উদ্যোগ নেননি। ভারতের পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় মুক্তিসংগ্রামীদের এতবড় আত্মত্যাগের কোনো মূল্যই দেননি কেউ।

ভিজিট করুন

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ঃ ইন্দিরা গান্ধীর বিজয় বাণী