মির্জানগর হাম্মাখানা

কেশবপুরের মির্জানগর মোঘল শাসন কেন্দ্র

কলাম ও ফিচার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

 

সাজেদ রহমান, সিনিয়র সাংবাদিক।

২০০৫ সালের রোজার ঈদে গ্রামে গিয়েছিলাম। চাঁদ দেখা যায়নি। ফলে ছুটি একদিন বৃদ্ধি পেল। কি করা যায়। তাই পরদিন বেড়িয়ে পড়লাম। সাথে ছিল কেশবপুরের দৈনিক জনকন্ঠের সাংবাদিক আমার প্রিয় কবির হোসেন। শার্শার শালকোনা থেকে প্রথমে গেলাম কেশবপুরের ভরতভায়না, তারপার কেশবপুরের মির্জানগর। এরপর সাগরদাঁড়ি। কিন্তু মির্জানগর আমাকে অনেক ভাবিয়ে তুলেছে।

এরপর যশোর খুলনার ইতিহাস পড়েছি। যা জেনেছি তা হলো: কপোতাক্ষ নদের শাখা বুড়িভদ্রা নদী আজ মৃত। কপোতাক্ষ নদ বন্ধ্যা। অথচ এখনও দুই নদীর সঙ্গমস্থল ত্রিমোহিনীর পাশে মির্জানগরে ভগ্নপ্রায় মধ্যযুগের শাসক মির্জা সফসিকানের রাজধানীর শেষ নিদর্শন একটি হাম্মামখানা কালের সাক্ষী বহন করছে।

মোগল আমল থেকে এই জঙ্গলাকীর্ণ এলাকায় তৎকালীন রাজা-বাদশা, ওলি-আউলিয়া, ধর্ম প্রচারকরা তাদের নিরিবিলি আশ্রয়স্থল হিসেবে চিহ্নিত করে গড়ে তোলেন কেশবপুরের অনেক স্থানে আকৃষ্ট করা আস্তানা। আজও রয়ে গেছে তাদের সুখ-দুঃখের নির্মমতার স্মৃতিচিহ্ন। আর কিছু কিছু ইমারত আজও অযত্নে অবহেলায় পড়ে আছে ধ্বংসের অপেক্ষায়।

প্রায় এক কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মির্জা সফসিকানের রাজধানীর অসংখ্য ইমারতের ইট বেনিয়া পাকিস্থানীদের শাসনের সময় রাস্তা নির্মাণে ব্যবহার করা হয়। দুটি কামানের একটি ভেঙ্গে যশোর কারাগারের কয়েদিদের ডাণ্ডাবেড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অপরটি যশোর পৌরসভার হেফাজতে শহরের বাসস্ট্যান্ডে রাখা হয়েছে। এমনই ইতিহাস বিজড়িত কেশবপুর উপজেলার মির্জানগর স্থান।

কেশবপুর থেকে পশ্চিম দিকে ১১ কিলোমিটার দূরে ত্রিমোহিনী ইউনিয়নের কপোতাক্ষ নদের তীরের একটি গ্রাম মির্জানগর। এই গ্রামটিই ছিল এককালে মোগলদের অসংখ্য রাজধানীর অন্যতম কেন্দ্র বিন্দু। উত্তাল কপোতাক্ষ নদের তীরে অবস্থিত সবুজ বেষ্টনীর মনোরম পরিবেশের এই গ্রামকেই তৎকালীন মোগল বংশোদ্ভূত ‘মির্জা সফফিকান’ তার রাজধানী গড়ে তোলেন।

ঐতিহাসিক আব্দুল জলিল যশোর খুলনার ইতিহাসে উল্লেখ করেছেন, ‘খাজনা আদায় ও শাসনকাজ পরিচালনায় নিরাপত্তার কথা ভেবে মির্জা সফসিকান মির্জানগরে নগর গড়ে তোলেন।’ ভারত বর্ষের পূর্বাংশে মোগল শাসনামলের সূর্য অস্তমিত প্রায়। বঙ্গের সুবেদার ইসলাম খাঁর প্রধান সেনাপতি মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে যশোর রাজ্যের ভারপ্রাপ্ত শাসক নিযুক্ত হন। সুবেদারের অধীনে এসব শাসককে ফৌজদার বলা হতো।

যশোরের প্রথম ফৌজদার ছিলেন ইনায়েত খাঁ। প্রতাপাদিত্যের পতনের পর যশোর রাজ্যের শাসন ভারপ্রাপ্ত হন রাঘব রায় এবং চাঁদ রায়। পরে চাঁদ রায় প্রতাপাদিত্যের বাড়িতে বসবাসের অনুমতি পান। এদিকে ফৌজদার এনায়েত খাঁ কেশবপুর উপজেলার মির্জানগর নামক স্থানে এক দ্বিতল গৃহে বসবাস করতেন। এই গৃহকেই ‘হাম্মামখানা’ বা হেরেমখানা বলা হয়।

কয়েক বছর শাসন কাজ চালানোর পর ১৬১৮ সালে এনায়েত খাঁর মৃত্যুর পর যশোর রাজ্যের ফৌজদার নিযুক্ত হন সরফরাজ খাঁ। তিনি ছিলেন বঙ্গের সুবেদার আজম খাঁর পুত্র। তার প্রকৃত নাম ছিল আব্দুল্যাহ মির্জা। গুজরাটে থাকাকালীন শাসন কার্যে দক্ষতার জন্যে তিনি সরফরাজ খাঁ উপাধি লাভ করেন। কিন্তু সরফরাজ খাঁ ছিলেন অত্যন্ত অর্থলিপ্সু ও দুর্নীতিপরায়ণ। তাই তাকে লোকে ‘নবাব’ বলে সম্বোধন করত। এ সময় মগফিরিঙ্গি অত্যাচার চরম আকার ধারণ করে। কেশবপুরের মির্জানগরও ‌‍’নবাব বাড়ি’ হিসেবে পরিচিত।

 

মির্জানগর হাম্মামখানা
মির্জানগর হাম্মামখানা

সরফরাজ খাঁর পরে ঈশ্বরপুরে (বর্তমান যশোর) ফৌজদার নিযুক্ত হন মির্জা সফসিকান। তিনি ইরানের রাজ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ইরানের এই বংশের সঙ্গে মোগলদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজা এই সম্পর্কের কারণে রুস্তমের কন্যাকে বিয়ে করেন। শাহ সুজা বঙ্গের সুবেদার থাকাকালীন শ্যালক পুত্র মির্জা সফসিকানকে যশোরের সুবেদার নিযুক্ত করেন। তৎকালীন রাজধানী সরফরাজপুর বসবাসের অনুপযুক্ত মনে করে মির্জা সফসিকান উত্তাল কপোতাক্ষ নদ ও ভদ্রা নদীর মিলনস্থলে শাসন কেন্দ্র স্থাপন করে নিজ আবাস বাড়ি তৈরি করে বসবাস শুরু“করেন। এই স্থানের নাম ত্রিমোহিনী।

ত্রিমোহিনী থাকলেও সফসিকানের সেসব স্মৃতিচিহ্ন কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। মির্জা সফসিকানের নাম অনুসারে এখানকার একটি পল্লীর নামকরণ করা হয় ‘মির্জানগর’। এখানেই তিনি বসবাস করতেন। মির্জানগরের কিংবদন্তিতে জানা যায়, ভদ্রা নদীর কূলেই ছিল বিরাট বিরাট অট্টালিকা। যা ওই সময় প্রশাসনিক কার্যে ব্যবহার করা হতো। এখনো অনেক গৃহের ধ্বংসাবশেষ কালের সাক্ষী হয়ে রয়েছে। এর সংলগ্ন ছিল সফসিকানের আবাসস্থল। যেটি আজো নবাব বাড়ি বলে খ্যাত। এখানে একটি মসজিদ রয়েছে। পরে এলাকার লোক সংস্কার করে ওই মসজিদে নামাজ আদায় করছেন। এই বাড়ির চারপাশ দিয়ে ছিল উঁচু প্রাচীর। তার কোন অস্তিত্বই এখন খুঁজে পাওয়া যাবে না।

নবাবের ‘হেরামখানা’ বা হাম্মামখানা নামে কথিত একটি বড় ঘরের অস্তিত্ব পরিলক্ষিত হচ্ছে। তবে এটি ৮/১০ ফুট মাটির নিচে রয়ে গেছে। এটি যে ‘হেরেমখানা’ ছিল তার প্রমাণ স্বরূপ হেরেমদের গোসলের জন্য নির্মিত ‘বাথটাবের’ অস্তিত্ব আজও বিদ্যমান। এ ঘর সংলগ্ন রয়েছে ছাদ পর্যন্ত বিরাট একটি কূপ।

মির্জানগরের কামান
হাম্মামখানায় পড়ে থাকা বিশাল কামনটি নিয়ে যশোরের বিজয়স্তম্ভে রাখা হয়েছে।

এই কূপটি নিয়ে অনেক কাহিনী ও ইতিহাস রয়েছে। অনেকের অভিমত অত্যাচারী সফসিকান খাজনা পরিশোধ করতে অস্বীকারকারী প্রজাদেরকে এই কূপে রক্ষিত বিষাক্ত মাছের কাঁটার আঘাতে হত্যা করতেন। জনশ্রুতে এবং সরেজমিনে জানা গেছে, এই কূপের পাশে একটি ঘর আছে যেখানে খাজনার অর্থ রাখা হতো।

অনেকের কাছে জানা যায়, এটি ছিল ‘যুদ্ধকেল্লা’। এ প্রাচীরের মধ্যে মাটির নিচে রাখা হতো সৈনিকদের। হাম্মামখানায় পড়ে থাকা বিশাল কামনটি নিয়ে যশোরের বিজয়স্তম্ভতে রাখা হয়েছে।

আবার ইতিহাসে জানা যায়, এটি ছিল ‘হেরেমখানা’ এবং এ কূপের পানি দিয়েই হেরেমরা গোসল করতেন। চুন-সুরকি আর পাতলা ইটের তৈরি এই ঘরটির একটি ‘মিনারে’ বসানো ছিল ৭টি বিভিন্ন ধরনের পাথর। যা সূর্যের আলোতে ঘরের ভেতর এক মহোময় পরিবেশ সৃষ্টি করত। বর্তমানে পাথরের কোন অস্তিত্ব না থাকলেও ফোঁকরগুলো বিদ্যমান রয়েছে। বিশাল চওড়া করে গাঁথুনীর এই হাম্মামখানা দেখলে মন জুড়িয়ে যায়। লেখক সাংবাদিক ও ইতিহাসবিদ।  ভিজিট করুন

মির্জানগর থেকে নিয়ে যশোর বিজয়স্তম্ভে রাখা কামানের ইতিহাস

বাংলার নবাবদের রাজধানী মুর্শিদাবাদ

1 thought on “কেশবপুরের মির্জানগর মোঘল শাসন কেন্দ্র

Leave a Reply

Your email address will not be published.