কেশবপুরে বিরল প্রজাতির কালোমুখো হনুমান পেটের জ্বালায় ছিনতাই করছে

জাতীয় খবর
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কবির হোসেন, কেশবপুর

কেশবপুরের বিরল প্রজাতির কালোমুখো হনুমানের চরম খাবার সংকট বিরাজ করছে। খাবারের অভাবে হনুমান প্রতিনিয়ত বাসাবাড়ি খাবারের দোকান এবং হাসপাতালে রোগির জন্য নিয়ে যাওয়া খাবার হানা দিয়ে ছিনিয়ে ছিনিয়ে খাচ্ছে। আর এই ক্ষুধার জ্বালায় মানুষের হাতে হনুমান প্রায়ই আহত ও নিহত হচ্ছে। সম্প্রতি মানুষের হাতে একটি শিশু হনুমান জখম হলে হনুমানদল ওই আহত বাচ্চা নিয়ে থানায় এক ঘন্টা অবস্থান করে হামলার প্রতিবাদ করেছে। 
কেশবপুরের বিরল প্রজাতির কালোমুখো হনুমান সম্প্রতি তাদের অধিকার আদায়ের জন্য কেশবপুর থানা ঘেরাও করে প্রতিবাদ জানিয়ে এক অন্যন্য নজির স্থাপন করেছে। গত ২২ সেপ্টেম্বর মানুষের আঘাতে আহত হয় একটি শিশু হনুমান। এরপর হনুমানদল আহত শিশু হনুমানটিকে নিয়ে কেশবপুর থানা ঘেরাও করে। তারা প্রায় এক ঘন্টা থানার গেটের সামনে অবস্থান করে অবরোধ করে থাকে। কেশবপুর থানার ওসি মোঃ শাহিন জানান, থানায় গেটের সামনে একদল হনুমান অবস্থান করার আমি বাইরে বেরিয়ে গিয়ে দেখি দুটো মা হনুমান থানার দেয়ালের গায়ে আলাদা বসে আছে। তাদের একটার কোলে একটি রক্তাক্ত আহত শিশু হনুমান। তখন আমি বুঝতে পারি বাচ্চাটিকে কেউ মেরে আহত করেছে। আর আহত করার অভিযোগ জানাতেই হনুমানদল থানায় এসেছে। তিনি আরও জানান, ২০ থেকে ২৫টি হনুমান দলবদ্ধভাবে থানার গেটের সামনে ও ডিউটি অফিসারের কক্ষে অবস্থান নেয়। আমি হনুমান দলের সামনে দাঁড়িয়ে বাচ্চা হনুমানের ওপর হামলাকারীদের বিষয়ে দেখবো বলে আশ্বাস দেই। প্রায় এক ঘন্টা অবস্থানের পর কিছু খাবার দিলে তা খেয়ে হনুমানদল থানা থেকে চলে যায়। 
কেশবপুরের হনুমান অনেকটা মানুষে মতো আচরন করে। প্রায় শহরের খোলা বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে হনুমান মারা যাচ্ছে। তখন ওই দলের সকল হনুমান মৃত হনুমানের চারপাশে নীরবে বসে শোক প্রকাশ করে থাকে। ৫/৬ বছর আগে শহরের জনৈক ব্যক্তি একটি হনুমানকে ইয়ার গানের গুলি করে হত্যা করে। সেই সময় হনুমানদল তার বাড়ির ছাদে গিয়ে লাফালাফি ঝাপাঝাপি করে গাছের ডাল ভাংচুর করে। কয়েক বছর আগে অজ্ঞাত কেউ একটি হনুমানের লেজ কেঁটে দেয়। ওই সময়ও হনুমানরা দলবেঁধে থানার ভেতর গিয়ে ঘেরাও করেছিল। ৪ বছর আগে নছিমনের ছাপায় একটি বাচ্চা হনুমান মারা গেলে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে মা হনুমানটি হাসপাতাল রোডে অবস্থান করে প্রতিটি চলন্ত নছিমনের ওপর হামলে পড়ে চাকা কাঁমড়াতে থাকে। এমন অনেক প্রতিবাদের নজির স্থাপন করেছে কেশবপুরের হনুমানরা
সরকাবিভাবে কেশবপুরের প্রায় ৫শ’ হনুমানের জন্য প্রয়োজনের তুলনায় অতিঅল্প পরিমান খাবার সরবরাহ করা হয়। প্রতিদিন হনুমানের খাবারের জন্য ২ হাজার ৬৬ টাকার খাবার বরাদ্ধ থাকলেও দেয়া হয় মাত্র ১২শ’ টাকার মতো। খাবার বেশী না থাকায় ৮টি পয়েন্টের জায়গায় এখন মাত্র তিনটি পয়েন্টে খাবার দেয়া হচ্ছে। সরকারিভাবে যে পরিমান খাবার দেয়া হচ্ছে তাতে এক পয়েন্টের হনুমানদেরও পেট ভরে না। প্রয়োজনীয় খাবার ও রক্ষনাবেক্ষনের অভাবে ক্রমেই কমে যাচ্ছে কেশবপুরের ঐতিয্যবাহী বিরল প্রজাতির কালোমুখো হনুমান। এক সময় হাজার হাজার হনুমান থাকলেও এখন তার সংখ্যা কমে হাতে গোনা ২শ’ ৬০টিতে মতান্তরে ৫শ’টিতে নেমে এসেছে। উন্নয়নে ধারাবাহিকতায় মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে, বেতন বেড়েছে, দ্রব্যমূল্যসহ সবকিছুরই পরিমান বাড়লেও কেশবপুরের বিরল প্রজাতির হনুমানের খারারের পরিমান দিনদিন কমে যাচ্ছে। তারপর ঠিকাদার বরাদ্ধকৃত খাবার ঠিকমতো দেয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। খাবার বাজেট কমে যাওয়ায় এবং তাদের রক্ষায় কার্যকরী ভূমিকা গ্রহন না করায় বিরল প্রজাতির হনুমানদের ধবংসের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। ক্ষুধার্ত হনুমান গুলো পেটের জ্বালায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শহরের অলিগলি, বাসাবাড়ি, উপজেলা পরিষদ, থানা, হাসপাতালসহ সর্বত্র। হামলা করছে দোকানপাট ও বাসাবাড়িতে। কেঁড়ে নিচ্ছে পথচারি ও হাসপাতালে ভর্তি রোগির জন্য নিয়ে যাওয়া খাবার। শহরের হাসপাতাল এলাকার মুদি ব্যবসায়ীরা আব্দুল বারি, আলমঙ্গীর হোসেনসহ সকলেই জানান, খাদ্য সংকটের কারণে প্রতিদিন হনুমান হাসপাতালের ভর্তি রোগীদের জন্যে নিয়ে যাওয়া খাদ্য কেড়ে কেড়ে খায়। কোন মানুষের হাতে ব্যাগ দেখলেই হনুমানরা হামলা করে জড়িয়ে ধরে ব্যাগ কেড়ে নেয়। তাদের দোকান থেকে কলা, বিষ্কুট, রুটিসহ বিভিন্ন রকমের খাবার ছিনিয়ে নিয়ে যায়। রামচন্দ্রপুর গ্রামের কার্তিক চন্দ্র ঠাকুরের মতো অনেকেই বলেছেন, হনুমানের খাদ্য কমে যাওয়ায় ওদের অত্যাচার বেড়ে গেছে। এলাকার সকল গাছের ফল খেয়ে ফেলছে। হনুমানদের বাঁচিয়ে রাখতে হলে তাদের খাদ্য সরবরাহ বাড়াতে হবে এবং তাদের জন্যে পরিকল্পিত বিচরন ভূমি বানাতে হবে। সরকারি ভাবে সরবরাহকৃত খাদ্য চাহিদার তুলনায় কম হওয়ায় খাদ্য সংকটের কারণে অনেক হনুমান এলাকাছাড়া ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে সভাপতি করে খাবার তদারকি করতে ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি আছে তবে কমিটির তেমন মিটিং হয় না।
কেশবপুর উপজেলা বন কর্মকর্তা আব্দুল মোনায়েম হোসেন হনুমানের খাবার সংকটের কথা স্বীকার করে জানান, প্রতিদিন হনুমানের যে খাবার দেয়া হচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারে কম। যশোর বন কর্মকর্তার অফিস ঠিকাদারের মাধ্যমে প্রতিমাসে ৬০ থেকে ৬২ হাজার টাকা হনুমানের খাবার বরাদ্ধ দেয়। ঠিকাদার প্রতিদিন শহরের চারটি পয়েন্টে ২ কেজি কাঁচা বাদাম, ২ কেজি পাউরুটি ও ৩৫ কেজি পাকা কলা খেতে দেয়। ঠিকাদার ঠিকমতো খাবার সরবরাহ করছে কিনা তা দেখার জন্য উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে সভাপতি করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি আছে। তবে ওই কমিটির তেমন মিটিং হয় না। আমি প্রায় তিন মাস এখানে এসেছি। এসময়ে কোন মিটিং হয়নি। বনকর্তা আরও বলেন, আগে তুলনায় হনুমান বেড়ে এখন প্রায় ৬শ’ হনুমান রয়েছে।
কয়েক বছর আগেও হনুমানের খাবার বরাদ্ধ বেশী ছিল। তখন ৮টি পয়েন্টে হনুমানদের খাদ্য খাওয়ানো হত। সেগুলো হলো বন বিভিাগের অফিস, পুরাতন ব্রীজের এপার-ওপার, ব্রহ্মকাঠি, রামচন্দ্রপুর ঈদগাহ মাঠ, রামচন্দ্রপুর বকুলতলা, শিশুতলা,ও দূগার্পুর।  তখন প্রতিদিন ৭৬ কেজি কলা, ৪ কেজি কাঁচা বাদাম, ৫ কেজি পাউরুটি সরবরাহ করা হত। ২০১২ সালের পর হনুমানের খাবারের রবাদ্ধ কমিয়ে দেয়া হয়। যা বরাদ্ধ রয়েছে ঠিকাদার তাও ঠিকমতো দিচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। হনুমানের খাবার খাওয়ানো কাজে নিয়জিত আতিয়ার রহমান জানায়, বর্তমানে যে খাবার দেয়া হয় তাতে এক পয়েন্টের হনুমানের পেট ভরে না। তিনটি পয়েন্টে সেই খাবার ভাগ করে দেয়া হয়। খাবার অভাবে শহরের বাইয়ে বাকি পয়েন্ট গুলোতে খাবার দেয়া হয়না।
কেশবপুরের বিরল প্রজাতির কালোমুখো হনুমান রক্ষায় ২০০১ সালে বিপন্ন এই হনুমান রক্ষায় প্রথম এগিয়ে আসে পিস নামের একটি সংস্থা। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি সাপেক্ষে কেশবপুরে বিলুপ্ত প্রায় প্রজাতির হনুমান সংরক্ষণ ও পরির্চয়ার নামে তারা ৫ বছরের একটি প্রকল্প গ্রহন করে। এর কিছুদিন পরে সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রনালয় স্থানীয় ঠিকাদারের মাধ্যমে প্রতিদিন হনুমানের সামান্য খাবারের ব্যবস্থা করে। এতো অল্প খাবারে হনুমানের জটর জ্বালা জুড়ায় না। খাবারের জন্য উৎপাতের কারণে হনুমানদের নানাভাবে মানুষের রোষানলে পড়ে অগনিত হনুমান আহত ও নিহত হয়। ২০০৫ সালে বালিয়াডাঙ্গা এলাকায় বিষ ছিটানো আমের মুকুল খেয়ে একই দিনে ৬টি বড় হনুমান মারা যায়। উপজেলা পাড়ার আটআনা ডাক্তার ১৩/০৩/০৬ তারিখে তার ছাদের ওপর একটি হনুমানকে গুলি করে হত্যা করে। শহরের সাহাপাড়ায় কে বা কারা কুপিয়ে হত্যা করে একটি হনুমান। এ বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর পাঁজিয়া ইউনিয়নের বেলকাটি গ্রামে একটি বড় হনুমানকে হত্যার অভিযোগ রয়েছে। খাদ্য অন্বেষণ করতে গিয়ে শহরের খোলা বিদ্যুতের তারে ষ্পৃষ্ট হয়ে প্রতিনিয়ত হনুমানের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটছে। খাবার সন্ধানে ভবঘুরে হনুমান দলছুট হয়ে বিভিন্ন যানবহনের ছাদের ওপর উঠে অন্যত্র চলে যাচ্ছে এবং মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ মিজানূর রহমান জানান, মূলত খাবারের অভাবে বিরক্ত করায় কে বা কারা ওই হনুমানের বাচ্ছাটিকে জখন করে আহত করেছে। তিনি হনুমানের খাবার সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, বর্তমানে হনুমানের খাবারের জন্য বছরে সাড়ে ৭ লাখ টাকা বরাদ্ধ রয়েছে। হনুমান থানা ঘেরাও করার ঘটনার পর আমি জেলা প্রশাসককের কাছে তাদের খাবার বাড়ানোর জন্য অনুরোধ করেছিলাম। তিনি জেলা প্রশাসকের তহবিল থেকে কিছু পরিমান খাবারের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দিয়েছেন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ে হনুমানের খাবারের বরাদ্ধ বাড়ানোর আবেদন করার কয়েকদিন আগে বন ও পরিবেশ মন্ত্রনালয় আরও ২ লাখ টাকা বরাদ্ধ বৃদ্ধি করেছে। তিনি বলেন, কেশবপুরের বিরল প্রজাতির হনুমান যাতে বংশ বৃদ্ধি ও ভালভাবে বাস করতে পারে তার সকল ব্যবস্থা গ্রহনে উপজেলা প্রশাসন চেষ্টা করে যাচ্ছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে সভাপতি করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট খাবার তদারকি কমিটির মিটিং তেমন হয় না স্বীকার করে নির্বাহী অফিসার জানান, এটা তদারকির জন্য কয়েজন কর্মকর্তার উপর দায়িত্ব দেওয়া আছে। মিটিং হয় না।
আবহমান কাল থেকে কেশবপুরে হনুমানের বসবাস। কবে কখন কি ভাবে হনুমানদের কেশবপুরে আগমন ঘটেছে তার সঠিক কোন ইতিহাস কারো কাছে নেই। তবে অধিকাংশ প্রবীন ব্যক্তিদের মতে, এক সময় কেশবপুর নদ-নদী ও বন বাদাড় পরিবেষ্ঠিত ছিল। কালের গর্ভে বনাঞ্চল উজাড় হওয়ায় খাবারের জন্য হনুমান ৮০’র দশকের দিকে লোকালয়ে মানুষের মাঝে চলে আসে। হনুমানরা দলবদ্ধভাবে বিচরন করে। এক একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দেয় একটি বড় পুরুষ হনুমান। দলের প্রধান পুরুষ হনুমানটি অত্যন্ত বদমেজাজী। দলের ভেতর যদি কোন মা হনুমান পুরুষ বাচ্চা প্রসব করে তাহলে আর রেহাই নেই। যেভাবেই হোক বাচ্চাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করে ওই পুরুষ হনুমানটি। আর এ ধরনের আচরনের কারন আনুসন্ধানে জানা যায়, দলনেতা ওই পুরুষ হনুমানটির বধ্যমুল ধারনা পুরুষ শাবকটি বড় হয়ে তার কর্তর্ৃত্ব নিয়ে নিতে পারে। প্রাণী বিজ্ঞানীদের মতে, হনুমানরা সাধারণত ৫ বছর বয়স থেকে ৬ মাস অন্তর বাচ্চা প্রসব করে থাকে। এদের গড় আয়ু ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। এক একটির ওজন ৫ থেকে ৩০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। হাত ও পায়ের পাতা মুখের মতোই কালো। শরীর ধূসর বর্ণের লোম দিয়ে আচ্ছাদিত। তবে পেটের দিকটা কিছুটা সাদা ও লালচে ধরনের। চলাফেরা করার সময় এরা লেজ উচুঁ করে চলে থাকে। 
কবির হোসেন
কেশবপুর
০১৭১১-২৫০৩৫৬।

Leave a Reply

Your email address will not be published.