ছুটে চলেছে নারী অগ্রযাত্রায়

ছুটে চলেছে নারী অগ্রযাত্রায়

জাতীয় খবর
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ছুটে চলেছে নারী অগ্রযাত্রায়

সমুদ্র হক ॥ ছুটে চলেছে নারী। থেমে নেই অগ্রযাত্রা। কেউ কী ভেবেছিল বাংলাদেশের কিশোরী ঘোড়দৌড়ে বিশ্ব মাতিয়ে দেবে! হ্যাঁ-তাই হয়েছে। ঘোড়াকে মাঠে চরাতে গিয়ে খেলার সঙ্গী করে ঘোড়ায় ছুটতে শিখেছে। এরপর ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে তেজি ঘোড়াকে ছুটিয়ে সবার আগে গন্তব্যে পৌঁছে। আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে। প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে। এই কিশোরীর নাম তাসমিনা আক্তার। বয়স ১৭।

বগুড়ার নারী ক্রিকেটার। নারী পুরুষের সমতায় নিজেদের গড়ে তুলেছে। স্কুটিতে চলাচলে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের হাজারও নারী স্কুটিতে চলাচল করছে। দল বেঁধে বাইসাইকেলে চড়ে স্কুলে যাচ্ছে গ্রামের মেয়েরা। মোটর গাড়ি চালাচ্ছে। পঞ্চাশের দশকেই বগুড়ার মেয়েদের পরিচিতি ছিল ‘ফরোয়ার্ড’। এখন বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চলের প্রতিটি গ্রামের মেয়ে একবিংশ শতককে হাতের মুঠোয় নিয়ে এগিয়ে চলেছে আগামীর পথে। আজ (সোমবার) বাংলার নারীর অগ্রযাত্রা নিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে পালিত হচ্ছে ‘বিশ্ব নারী দিবস’। এ বছরের প্রতিপাদ্য- উইমেন ইন লিডারশিপ : এ্যান ইকুয়াল ফিউচার ইন কোভিড-১৯ ওয়ার্ল্ড (নেতৃত্বে নারী কোভিড-১৯ পৃথিবীতে সমান ভবিষ্যত)।

দেশে কর্মজীবী নারী বাড়ছে। নারীর কাজের গতি ও সময় পুরুষের চেয়ে বেশি, এটি গবেষণার ফলাফল। এই গতিতে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) পঞ্চম লক্ষ্য নারী পুরুষের সমতা নির্ধারিত সময়ের আগেই অর্জন সম্ভব হবে। চলতি বছর দেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে দৃঢ়তার সঙ্গে এমনই আশা করা হয়েছে। এই লক্ষ্য নিয়ে দেশের নারী সকলক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। জেন্ডার সমতা ও নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশের ঈর্ষণীয় সাফল্য এসেছে।

নারীর অগ্রযাত্রা আরও এগিয়ে দিতে জাতিসংঘ নারী সংন্থা পাঁচটি পয়েন্ট দিয়েছে। ১. দূর থেকে সুপেয় খাবার পানি আনতে বিশেষ যানের ব্যবহার। ২. বাইসাইকেলে চলাচল (সঙ্গে যোগ হয়েছে স্কুটি, মোটরসাইকেল)। ৩. অন্তর্জাল প্রবেশ (ইন্টারনেটে এ্যাকসেস) ৪. স্যানিটারি প্যাড (পিরিয়ডে নারীর চলার গতি ধরে রাখা) ৫. পরনে প্যান্ট (যা এখন নারীর ফ্যাশন নয়। কর্মক্ষেত্রে নারী দ্রুত এগোতে পারে)। এগুলো নারীর জীবনের চলার গতি বাড়িয়ে লিঙ্গ সমতার আবহ তৈরিতে সহায়ক হয়েছে।

বাইসাইকেল, স্কুটি ও মোটরবাইকে নারীকে দ্রুত চলাচল ও স্বাধীনতার সুযোগ করে দিয়েছে। এখন নারী ঘোড়ায় ছুটছে। নারীর উন্মুক্ত পরিসর তৈরিতে অন্তর্জালে বেড়েছে নারীর সচেতনতা। হ্যাস ট্যাগ মি টু বা হ্যাস ট্যাগ টাইমস আপের মতো সামজিক মাধ্যমে লিঙ্গ বৈষম্য উন্মোচিত হচ্ছে। কয়েক শতাব্দী ধরে যে কাজ শুধু পুরুষের বলে ধরে নেয়া হতো তার পালাবদল ঘটেছে। সকল কাজে যুক্ত হয়েছে নারী।

নারীর বাহনে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছে বাইসাইকেল ও স্কুটি। গাড়ি আছে এমন পরিবারের নারী সদস্য গাড়ি চালাচ্ছে। গ্রামের বেশিরভাগ কিশোরী বাইসাইকেলে স্কুলে যায়। কিশোরীর ঘোড়ায় ছুটে চলার দৃশ্য প্রথম দৃষ্টিতে আসে বগুড়ায়। কয়েকটি মেলায় ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেয় নওগাঁর ধামইরহাটের মেয়ে তাসমিনা আক্তার। আগে বিভিন্ন মেলার ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নিত অভিজ্ঞ পুরুষ সওয়ারী। উল্কার মতো আবির্ভাব হলো কিশোরী তাসমিনার। ঘোড়দৌড়ের মাঠে নিজের ঘোড়াকে ছুটে সকলের আগে চিহ্নিত পয়েন্টে পৌঁছালে মুহুর্মুহু করতালিতে উল্লাস করে দর্শক। কিশোরী তাসমিনার সাফল্যে অলিম্পিয়া ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ফর চিলড্রেন এ্যান্ড ইয়ং পিপল ক্যাটাগরিতে ‘দ্য হর্স গার্ল’ প্রামান্যচিত্র পুরস্কৃত হয়। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় প্রামান্যচিত্রটি।

এদিকে স্কুটিতেও মেয়েরা এগিয়ে চলেছে। বগুড়ার একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক ইমতিয়াজ জানালেন, তাদের মোটরসাইকেল বিক্রির ১০ শতাংশ ক্রেতা নারী। স্কুটি বিক্রির ৯০ শতাংশ নারী। নারীর ক্ষমতায়নে দশটি প্রযুক্তির একটি স্কুটি। গ্রামে কিশোরীদের স্বাচ্ছন্দ্যে পথ চলার সঙ্গী হয়েছে বাইসাইকেল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিভিন্ন সমীক্ষায় অর্থনীতির মূলধারায় নারীর অবদান ক্রমেই বাড়ছে। এক জরিপের ফলাফল : কর্মজীবী পুরুষের চেয়ে কর্মজীবী নারী তিনগুণ বেশি কাজ করে। দেশে বর্তমানে ৬ কোটিরও বেশি কর্মজীবী নারী ও পুরুষ। গড় হার পুরুষ ৭০ শতাংশ ও নারী ৩০ শতাংশ। তবে কৃষি, গার্মেন্টস ও ইপিজেডে নারী ও পুরুষ শ্রমিকের সমতা এসেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারী শ্রমিক বেশি। জনপ্রশাসন ও অন্যান্য চাকরিতে নারী পুরুষের আনুপাতিক হার এখনও ৫০ : ৫০ হয়নি। বেশিরভাগ সেক্টর এখনও সমতার অবস্থানে নেই। এগুলোকে চিহ্নিত করে সমতা বাস্তবায়নের কাজ চলমান।

জনপ্রশাসন, পরিসেবা খাতের নারী কর্মজীবী কাজ শেষে ঘরে ফিরেই শিশু পরিচর্যা ও গৃহস্থালির সকল কাজই করেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) এক জরিপে দেখা গেছে পুরুষের চেয়ে অন্তত তিনগুণ বেশি কাজ করে নারী। ঘরে বাড়তি এই কাজের জন্য নারী কোন বেতন পান না। একবিংশ শতকে কর্মজীবী নারীর চিত্র : এমন কোন সেক্টর নেই যেখানে নারী কর্মজীবী নেই।

কৃষিক্ষেত্রে নারী শ্রমিকের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। গণমাধ্যম ও শিল্পী সত্তার পেশাকেও বেছে নিচ্ছে নারী। তবে শিল্প উদ্যোক্তা হিসেবে নারী এখনও পিছিয়ে। দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তির মূলধারায় নারীর অবদান দিনে দিনে বাড়ছে।

এদিকে রাজনৈতিক অঙ্গনেও এগিয়ে যাচ্ছে নারী। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২২ জন নারী সরাসরি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তারপরও নারীর ক্ষমতায়নে কাক্সিক্ষত অর্জন আসেনি। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোকে ২০২০ সালের মধ্যে ৩৩ শতাংশ পদ নারীর জন্য নির্ধারণ করা আছে। বাংলাদেশের নারী হিমালয়ের চূড়ায় উঠেছে। প্রতিটিক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে। নারীর ঘোড়া ও স্কুটিতে ছুটে চলার গতি বলে দিচ্ছে ওরা আসছে…। সূত্র-জনকণ্ঠ।