জগৎ শেঠ পলাশীর যুদ্ধে অর্থের জোগান দিয়েছিলেন

জগৎ শেঠ পলাশীর যুদ্ধে অর্থের জোগান দিয়েছিলেন

কলাম ও ফিচার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
সাজেদ রহমান, সিনিয়র সাংবাদিক।। বাংলা তথা ভারতের ইতিহাস চিরকালের জন্য পালটে দিয়েছিল পলাশীর যুদ্ধ। অনেকেই জানেন, এই যুদ্ধে অর্থের জোগান দিয়েছিলেন জগৎ শেঠ। তবে ‘জগৎ শেঠ’ কোনো ব্যক্তির নাম নয়, একটি পরিবারের উপাধি। যার অর্থ ‘বিশ্বের সওদাগর’।
পলাশীর যুদ্ধে ব্রিটিশদের যিনি অর্থসাহায্য করেন, তাঁর নাম মহতাব রাই। দুই বার গেছি মুর্শিদাবাদ। সর্বশেষ গেছি দার্জিলিং থেকে ফেরার পথে। জীপ চালক বললেন, বহরামপুর হয়ে যখন যাচ্ছি, তখন চলেন ঘুরে যায় নবাবের এলাকা। দিনটি ছিল ২০১৫ সালের ২৫ মে। প্রচন্ড গরম। জীপ ঘুরিয়ে গেলাম সেখানে। ৪ ঘন্টা ঘুরে ফিরে আসার সময় দাঁড়ালাম জগৎ শেঠ-এর বাড়ির সামনে। তখন সূর্য অস্তগামী। ফিরবো বনঁগা। আকাশে মেঘ। যাইহোক দ্রুত ঘুরলাম তার বাড়ি।
‘জগৎ শেঠ’ উপাধির উৎস খুঁজতে হলে আমাদের শুরু করতে হবে হীরানন্দ সাহুর থেকে। স্বর্ণকার থেকে তিনি মহাজন হয়ে উঠেছিলেন। রাজস্থানের নাগৌর শহর ছেড়ে এসে ১৬৫০ সাল নাগাদ পাটনায় বসবাস শুরু করেন। পাটনা তখন এক সমৃদ্ধ বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল। হীরানন্দ ব্যাংকিং এবং মহাজনি কারবার জমিয়ে তোলেন সেখানে।
সম্ভবত এভাবেই ভারতের বাণিজ্যে মারোয়াড়িদের উত্থান শুরু হয়। ব্যবসা ছড়িয়ে দিতে হীরানন্দ তাঁর ছেলেদের বিভিন্ন শহরে পাঠাতেন। তাঁদের একজন মানিক চাঁদ জাঁকিয়ে বসেন সুবা বাংলার রাজধানী ঢাকায়। ক্রমেই তাঁর অর্থভাণ্ডার বাড়তে থাকে। ঢাকায় তখন ছিলেন বাংলা দেওয়ান মুর্শিদকুলি খাঁ। যাঁকে নিয়োগ করেছিলেন মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব। মানিক চাঁদ খুব শীঘ্রই মুর্শিদকুলির প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন।
তারপর রাজনৈতিক পালাবদল ঘটে। ১৭০৪ সালে ঢাকা থেকে মুখসুদাবাদে রাজধানী সরিয়ে আনেন মুর্শিদকুলি খাঁ। নিজের নাম অনুসারে শহরটির নাম দেন মুর্শিদাবাদ। অবশেষে নিজেকে বাংলার নবাব ঘোষণা করেন। মানিক চাঁদও মুর্শিদাবাদে এসে মহিমাপুরে নিজের প্রাসাদ গড়ে তোলেন। রাজস্ব সংগ্রহের দায়িত্ব পান। হয়ে ওঠেন নবাবের কোষাধ্যক্ষ। তাঁর ধনসম্পত্তি এমন বাড়তে থাকে যে জগৎশেঠদের বাড়িকে তুলনা করা হত ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডের সঙ্গে।
বিশ্বের সবচেয়ে ধনী পরিবারগুলির অন্যতম ছিলেন তাঁরা। মানিক চাঁদের দত্তক নেওয়া ছেলে ফতেহ চাঁদের আমলে সম্পত্তি আরও অনেক গুণ বেড়ে যায়। মুঘল সম্রাট মাহমুদ শাহ তাঁকে উপাধি দেন ‘জগৎ শেঠ’। টাঁকশাল, রাজস্ব সংগ্রহ এবং প্রেরণ, সোনা কেনা-বেচা, বিদেশি বণিকদের সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিময় মূল্য নির্ধারণ, জমিদার ও নবাবকে টাকা ধার দেওয়া – সবেতেই জগৎশেঠ সিদ্ধহস্ত। কোনোভাবেই তাঁদের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চেয়ে কম ছিল না।
নবাবের সিংহাসনে সিরাজউদদৌলা বসলে শুরু হয় সমস্যা। তিনি সহজেই উত্তেজিত হয়ে পড়তেন। ঔদ্ধত্যে যত ছিল, সেই তুলনায় বুদ্ধি ছিল কম। জগৎ শেঠদের সঙ্গে তিনি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েন। শতাব্দীপ্রাচীন সম্পর্কে ভাটা শুরু হয়। তখনকার বাংলায় ফরাসি কুঠির প্রধান ছিলেন জাঁ ল। সিরাজউদদৌলার তিনি ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
তবে পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের বিজয় জগৎ শেঠদের পতন ডেকে আনে। বাংলার অর্থবাজারে জগৎশেঠ পরিবারের দাপট আর থাকে না। নবাব মিরকাশিমের নির্দেশে মহতাব রাইকে হত্যা করা হয়। কলকাতায় ব্রিটিশরা টাঁকশাল খোলেন, জগৎশেঠদের ওপর তাঁদের নির্ভরতা কমে আসে। বাংলার প্রথম গভর্নর-জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস মুর্শিদাবাদ থেকে রাজকোষ সরিয়ে আনেন কলকাতায়। জগৎ শেঠদের প্রাসাদ আজও বহন করছে অতীতের সমৃদ্ধি এবং প্রতিপত্তির স্মৃতি।
হাজারদুয়ারি থেকে নসিপুর রাজবাড়ির দিকে গেলে পথেই পাবেন সেই অট্টালিকা। এখন তা জাদুঘর। দেখতে পাবেন টাঁকশালের ভগ্নাবশেষ, নানা সময়ের মুদ্রা, নথিপত্র, জগৎ শেঠ পরিবারের ব্যবহৃত সামগ্রী। মসলিন এবং অন্যান্য বিলাসবহুল পোশাক, সোনা-রুপোর সুতো দিয়ে অলংকৃত বেনারসি শাড়ি এবং আরও নানা ঐতিহাসিক জিনিসপত্র। জগৎ শেঠ পরিবারের আরেক সদস্য হরেক চাঁদের প্রাসাদ রয়েছে কাঠগোলায়।