দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের টালমাটাল অবস্থা ও নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়

কলাম ও ফিচার সাহিত্য
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
সাজেদ রহমান।। সিনিয়র সাংবাদিক।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের টালমাটাল অবস্থা। ইউরোপে টিমটিম করে জ্বলছে নাৎসি বাহিনীর প্রদীপ৷ ভারতে ব্রিটিশরা চুকিয়ে দিচ্ছেন সমস্ত হিসেব-নিকেষ। চলে গেলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। চারিদিকে মন্বন্তর, দুর্ভিক্ষ নিয়ে মানুষ লড়ছে মানুষের মতো করে। কলম ধরছেন বিজন ভট্টাচার্য, প্রেমেন্দ্র মিত্রেরা। সাহিত্য-শিল্পের মধ্যে দিয়ে সোচ্চার হচ্ছেন।
এমন এক সময়ে বাংলা সাহিত্যে হাজির হচ্ছেন চরম বাস্তববাদী কথা সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়। যিনি বিখ্যাত হচ্ছেন ‘দেশ’ পত্রিকায় ‘সুনন্দর জার্নাল’ লিখে। বাঙালির জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, রোজকার সমস্যা, রাজনীতি এই ছিল তাঁর লেখার প্রধান বিষয়।
পরবর্তীতে ছোটোগল্প বিষয়ে ডি.লিট ডিগ্রিও পান। রাজনীতি যেভাবে মানুষের মধ্যে গেঁড়ে বসেছিল তার উদাহরণ আমরা পাব সতীনাথ ভাদুড়ির ‘জাগরী’ (১৯৪৫), ‘ঢোঁড়াই চরিত মানস’ (১৯৪৯), গোপাল হালদারের ‘তেরশো পঞ্চাশ’ (১৯৪৫), সুবোধ ঘোষের ‘তিলাঞ্জলি’ (১৯৪৪) ইত্যাদি উপন্যাসে।
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ও ছিলেন রাজনীতি সচেতন। তাই সমসময় কতখানি গুরুত্বপূর্ণ এবং তাকে লিখে রাখা ততোধিক গুরুত্বপূর্ণ তা হাড়েহাড়ে টের পেয়েছিলেন নারায়ণ। অচিরেই জায়গা করে নিয়েছিল শ্রেণি বৈষম্য, খাদ্য সংকট, মধ্যবিত্ত শ্রেণির অস্তিত্বের লড়াই। এই সমকালীন প্রেক্ষিত উঠে এসেছে তাঁর ‘দুঃশাসন’, ‘হাড়’, ‘ভাঙা চশমা’, ‘টোপ’ ছোটোগল্পে।
কিন্তু এর বাইরে নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের অন্য একটা পরিচয়ও ছিল। একবার ‘কমললতা’ সিনেমার শ্যুটিং চলছে। নাম ভূমিকায় অভিনয় করছেন মহানায়িকা সুচিত্রা সেন। পরিচালক নারায়ণবাবুকে অনুরোধ করলেন, যদি বাড়ি এসে কিছু খুঁটিনাটি বিষয় একটু বুঝিয়ে দেন।
পরে সুচিত্রা সেন জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘দাদা, ঠিক হচ্ছে তো?’ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাহিনি অবলম্বনে উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত এই সিনেমার চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছিলেন স্বয়ং নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়। তাই সুচিত্রা ঠিক মানুষকেই প্রশ্নখানি জিজ্ঞাসা করেছিলেন।
নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় চিত্রনাট্য লিখেছেন ‘কপালকুণ্ডলা’, ‘ইন্দিরা’, ‘দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন’, ‘সাহারা’ এরকম অসংখ্য ছবির। তাঁর কাহিনি নিয়ে নির্মিত হয়েছে ‘চারমূর্তি’, ‘নন্দিতা’, ‘সঞ্চারিণী’, ‘টোপ’ সিনেমা।
তবে তিনি সবচেয়ে জনপ্রিয় ছিলেন বোধহয় শিক্ষক হিসাবে। সাদা ধুতি-পাঞ্জাবি পরা লম্বা লোকটার ক্লাস করতে রীতিমতো ভিড় জমতো ক্লাসঘরে। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায় এমনই ব্যক্তিত্ব যে, সেকালে সিটি কলেজের ছাত্রনেতারা প্রতিশ্রতি দিতেন, ‘বাংলা ক্লাসে নারায়ণবাবুকে এনে দেব।’ আজ কিংবদন্তি সাহিত্যিক-অধ্যাপক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যুদিবস। তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকা, সুনন্দর জার্নাল।