যারা ভারতের ভেলরের সিএমসি বা বাঙ্গালুরের হাসপাতালে গিয়েছিলেন তারাও ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের চিকিৎসা নিতে পারেন

স্বাস্থ্য কলাম ও ফিচার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
তাহমিন হক ববী।। নীলফামারী।।
লক্ষ্য যতই কঠিন হউক না কেন,পথ কিন্ত সব সময় পায়ের নিচেই থাকে। শুধু সেই পথটিকে বেছে নেবার জন্য একটি নির্দেশের প্রয়োজন হয়। আপনি খেয়াল করুন, মাঝে মাঝে একদম সাধারন কোন মানুষের নিজের কথা, নিজের কাজ এবং নিজস্ব ব্যক্তিত্ব আমাদের বহুলাংশে প্রভাবিত করে ফেলে এতোটাই বেশী যে আমরা নিজেদের অজান্তেই তাকে আমাদের প্রেরণার উৎসরূপে গ্রহন করি।
ঢাকার মিরপুর দুই নম্বর সেক্টরে অবস্থিত ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এন্ড রিসার্চ ইনষ্টিটিউট। এই হাসপাতালটি আমার কাছে অতি পরিচিত ২০১৩ সাল থেকে। ঢাকার মিরপুরে এতো সুন্দর একটি হাসপাতাল আছে, যারা ভারতের ভেলরের সিএমসি বা বাঙ্গালুরের হাসপাতালে গিয়েছিলেন তারাও একটি বার মিরপুরে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের চিকিৎসা নিতে পারেন। ফিরে এসে বলবেন ভারতে আর যেতে হবেনা।
বড় বড় স্বপ্ন,বড় বড় বিশ্বাস, বড় বড় লক্ষ্য বড় বড় সিদ্ধান্ত গুলোই সাফল্যের পরিমান নিদ্ধারন করেন। সফল ব্যাক্তি কোন সুপারম্যান নয়, আর নয় সে কোন যাদুশক্তির অধিকারী। সফল ব্যাক্তিও আরও পাঁচটা সাধারন মানুষের মতোই একজন সাধারন মানুষ, কিন্তু তফাৎটা হয়ে যায় মানুষের নিজের ওপরে বিশ্বাস এবং নিজের ক্ষমতার ওপরে বিশ্বাস রাখার পরিমানের ওপরে। সুযোগ কখনও দরজায় এসে কড়া নাড়বেনা, বরং সাফল্যের জন্যে সুযোগ দরজায় কড়া নাড়তে হবে।
জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল মালিক সাহেব ১৯৭৮ সালে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এন্ড রিসার্চ ইনষ্টিটিউট এই প্রতিষ্ঠানটির সূচনা করেন। দীর্ঘ প্রায় ৪২ বছরের বেশি সময় ধরে তিলে তিলে গড়ে উঠেছে এই সেবাকেন্দ্র।
ডা. আবদুল মালিক ও তার সহধর্মীনী ডাঃ অধ্যাপক ফাজিলা তুন নেছা হাসপাতালে আসেন নিয়মিত, এর ব্যবস্থাপনা দেখেন, এই দেশের গরিব মানুষকে সেবা দেয়ার জন্য নিজেকে তৈরি করেন নিত্যদিন। এটি একটি নন-প্রফিট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান। যদিও এটি সরকারী প্রতিষ্ঠান নয়, তবে সরকার প্রতিবছর এজন্য কিছু থোক বরাদ্দ দিয়ে থাকে। এর বাইরে রোগীদের টাকা দিয়েই চলে এই হাসপাতাল, ডাক্তার, নার্স, কর্মকর্তা/কর্মচারী এবং পুরো প্রতিষ্ঠান। একদল মহান প্রাণ চিকিৎসক যাদের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও কিনতে পারেনি, তাদের কঠিন পরিশ্রমের বিনিময়ে সেবা পাচ্ছে লাখ লাখ মানুষ, যাদের হয়ত যাওয়ার আর কোন জায়গা ছিল না।
আমি ২০১৩ সালের পহেলা মার্চ হৃদরোগে আক্রান্ত হই। সকালে ঘুম থেকে উঠেই বুঝতে পারি আমি হৃদরোগে আক্রান্ত। সঙ্গে সঙ্গে ছুটে যাই নীলফামারী হাসপাতালে। এখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আমাকে দ্রুত প্রেরন করা হয় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে। সে সময় নীলফামারীর সিভিল সার্জন ডাঃ শওকত, আবাসিক চিকিৎসক ডাঃ ফজলুল হক তানসেন, মেডিকেল অফিসার ডাঃ শঙ্কর, ডাঃ দিলীপ। তারা সার্বিক ভাবে আমার রংপুরে প্রেরন করা ভর্তি ও সু-চিকিৎসার খোজখবর রাখছিলেন। রংপুরে দীর্ঘ কয়েকদিনের চিকিৎসায় আমি বেশ সুস্থ হয়ে উঠি। রংপুর মেডিকেল হতে আমাকে পরামর্শ দেয়া হয়েছিল ঢাকায় গিয়ে এনজিওগ্রাম করিয়ে নিতে। রংপুর থেকে নীলফামারীর বাড়ীতে ফিরে এলাম।
এরপর পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকা গিয়ে ১৭ মার্চ/২০১৩ ভর্তি হলাম ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এন্ড রিসার্চ ইনষ্টিটিউটে। আমার সু-চিকিৎসার জন্য জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল মালিক, ডাঃ অধ্যাপক ফাজিলা তুন নেছা ও ডাঃ ধীমান বনিক। তারা সকলেই কার্ডিওলজীতে সেরা। এমন তিনজন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হলো। ওনারা একজন হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীকে কি ভাবে সুস্থ করা যায় এমন কিছু কৌশল দেখে শুনে আমি নিজেই অবাক না হয়ে পারিনি। জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল মালিক আমাকে দেখে বলছিলেন “এই ছেলে তোর কি হয়েছেরে”মনে হলো আমি তার কত পরিচিত ও আপন। আমার চিকিৎসার কাগজপত্র দেখে বললেন তোর কিছুই হয়নি-তুই কয়েকদিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাবি।
১৮ মার্চ/২০১৩ বিকালে আমার এনজিওগ্রাম করানো হয়। ধরা পড়লো একটি ব্লক। হার্টে স্টেন্ট (রিং) বসাতে হবে। সে সময় মা বেঁচে ছিলেন। মা ইন্তেকাল করেছিলেন ২০১৬ সালের ১৩ এপ্রিল রাতে। বাবাতো সেই ১৯৮৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারী ইন্তেকাল করেন। অপারেশন রুমে আমাকে শুয়ে রেখে মা এর সঙ্গে আমার আত্বীয়স্বজন ও ডাক্তার কথা বলছিলেন। বৃদ্ধা মা নীলফামারীর বাড়িতে বসে তার কোন সিদ্ধান্ত দিতে পারছিলেননা। অপারেশন রুমে আমাকে ডাক্তার ধীমান বনিক জিজ্ঞেস করলেন আপনি কি করতে চান- স্টেন্ট (রিং)? না ওপেন হার্ট সার্জারী? আমি সরাসরি বলেছিলাম ওপেন হার্ট সার্জারী। বিষয়টি মাকে জানানো হলো। মা সিদ্ধান্ত দিলেন ওপেন করতে দিবোনা- ববীকে স্টেন্ট (রিং) করতে বলো। তাই হলো। মা এর কথা মতো জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল মালিক, ডাঃ অধ্যাপক ফাজিলা তুন নেছা ও ডাঃ ধীমান বনিক আমার স্টেন্ট (রিং) করালেন। খুব মনে আছে আমাকে রিতিমত সুস্থ্য করে দিলেন তারা। এরপর ২৩ মার্চ/২০১৩ আমাকে হাসপাতাল হতে রিলিজ করলেন। সঙ্গে ঔষধ লিখে দিলেন নিয়মিত সেবন করতে। এরপর ৬ মাস পর ফলোআপ করাতে গিয়ে পূর্বের ওষধ কমিয়ে নতুন কয়েকটি ঔষধ লিখে দিয়ে বললেন নিয়মিত খাবে। আর কোন সমস্যা মনে করলে ফোনে কথা বলবে। সেই ২০১৩ সাল। ৭ বছর ভাল ভাবেই চলছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করে ১৩ আগষ্ট/২০২০ সন্ধ্যায় প্রচন্ড বুকে ব্যথা শুরু হয়। খবর পেয়ে আমার সাংবাদিক সহযোদ্ধারা ছুটে এলেন বাড়িতে। আমাকে সঙ্গে সঙ্গে নেয়া হলো নীলফামারী হাসপাতালে। এখানে ইসিজি করা হলো। স্থানীয় ডাক্তাররা আমাকে তাদের সাধ্যমত চিকিৎসা দিলেন। তারপরেও তারা সাহস পেলেন না নীলফামারী হাসপাতালে রেখে আমার চিকিৎসা চালাতে। যেহেতু আমার স্টেন্ট (রিং) পড়ানো আছে। স্থানীয় ডাক্তারের পরামর্শে আমার সাংবাদিক সহযোদ্ধারা ( প্রথম আলোর মীর মাহমুদুল হাসান আস্তাক, কালেরকন্ঠের ভুবন রায় নিখিল, মাছরাঙ্গা টিভির সিয়াম, এটিএননিউজের মামুন রহমান, ইত্তেফাকের শীশ রহমান, ৭১ টিভির বিজয় কাজল, আমাদের প্রেস কাবের কেয়ারটেকার ফেরদৌস রাত তিনটায় আমাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে নিয়ে গিয়ে ভর্তি করায়। এ ছাড়া মোবাইলে আমার ছেলে ইনজামাম-উল-হক নির্ণয়ের কাছে কল করে অসংখ্য সাংবাদিক সহযোদ্ধারা প্রতিক্ষন খোঁজখবর নিতে থাকেন। আমি টিআইবি পরিচালিত নীলফামারী সনাকের সভাপতি দায়িত্ব পালন করছি। পাশাপাশি দৈনিক জনকন্ঠ’এর নীলফামারী স্টাফ রির্পোটার হিসেবে কাজ করছি। সনাকের সদস্য, টিআইবি অফিস, দৈনিক জনকন্ঠ অফিস প্রতিক্ষন আমার খোঁজখবর নিয়েছেন।
রংপুরে ১৪ আগষ্ট/২০২০ ভোর থেকে আমার চিকিৎসা শুরু হলো। দীর্ঘদিনের সাংবাদিকতা, নীলফামারীতে আমার পরিচিতি- আমার অসুস্থতার কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নীলফামারীর জেলা প্রশাসক হাফিজুর রহমান চৌধুরী, জেলা প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তাগন,পুলিশ প্রশাসন, পৌর মেয়র দেওয়ান কামাল আহমেদ, নীলফামারীর সাবেক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ খালেদ রহিম, যশোরের বর্তমান পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেন, ঢাকা এসবি অফিসের পুলিশ সুপার আলমগীর রহমান, ডাঃ মমতাজুল রহমান মিন্টু সহ শতশত ব্যাক্তি আমার খোঁজ নিয়ে আমার জন্য দোয়া প্রার্থনা সুস্থতা কামনা করেন। মসজিদে মসজিদে করা হয় দোয়া। সনাতন ধর্মের অনেকে মন্দিরে প্রার্থনাও করেছেন।
রংপুরে আমার নাভীর কাছে ইনজেকশন দেয়া হয় ৫টি। এ ছাড়া স্যালাইন সহ কত ধরনের চিকিৎসা চলতে থাকে। রংপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আমার পূর্বের (২০১৩) ও বর্তমান অবস্থার চিকিৎসাপত্রের কাগজাদী আমার ছেলে প্রেরন করে দেয় ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এন্ড রিসার্চ ইনষ্টিটিউটে। সেখানেও আমার চিকিৎসার ফলোআপ করা হচ্ছিল। তারপর জানানো হলো ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এন্ড রিসার্চ ইনষ্টিটিউটে আমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। ১৬ আগষ্ট/২০২০ বিকালে রংপুর থেকে ফিরে এলাম নীলফামারী। না এসে উপায়ও ছিলনা। রংপুরে থাকা কালিন প্রতিদিন চোখের সামনে হৃদরোগে আক্রান্ত সহ বেশ কয়েকজন রোগীর মৃত্যু আমাকে দেখতে হয়েছে। এতে করে আমি আরো বেশী বেশী মানষিকভাবে ভেঙ্গে পড়ছিলাম। রংপুরে থাকা কালিন রংপুরের সাংবাদিক সহ আমার পরিচিত অনেকে ছুটে এসেছিলেন। কেউ কেউ তাদের বাড়ি হতে আমার জন্য নরম ভাত, স্যুপ, সুজি রান্না করে নিয়ে এসে আমাকে খাইয়ে গেছেন। যা ভুলবার নয়।
নীলফামারীতে ফিরে এসে বাড়িতে বিশ্রাম সহ চিকিৎসকদের দেয়া ঔষধ সেবন করছিলাম। যোগাযোগ রাখছিলাম ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এন্ড রিসার্চ ইনষ্টিটিউটে। আমাকে সেখানে যাওয়ার অনুমতি দেয়া হলো ৬ সেপ্টেম্বর। ছেলে সহ ৫ সেপ্টেম্বর রাতের ট্রেনে রওনা দিলাম। ট্রেনের একটি কেবিনে ছেলে সহ আমি। আমার নীলফামারীর সহযোদ্ধা সাংবাদিকরা আমাকে নীলফামারী রেলষ্টেশনে নিয়ে গিয়ে ট্রেনে উঠিয়ে দিলেন। ঢাকায় আমাকে সব সময় সঙ্গ দিলেন জি-টিভির জয়েন্ট এডিটর মেহেদী হাসান। তার বাসায় আমাকে রাখলেন। তার গাড়ীতে করে আমাকে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এন্ড রিসার্চ ইনষ্টিটিউটে নিয়ে যাওয়া নিয়ে আসা তার সহযোগীতা ভুলবার নয়। এসময় ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এন্ড রিসার্চ ইনষ্টিটিউটে আমাকে দেখতে আসেন বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ড কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক (কল্যাণ ও পুর্নবাসন) সরকার ফারহানা আক্তার সুমি।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এন্ড রিসার্চ ইনষ্টিটিউটে যেহেতু আমার আগেই ৬ সেপ্টেম্বর চেকআপের সময় ছিল সেহেতু কোন অসুবিধা হলোনা। প্রথমেই আমাকে হাজির করা হলো ডাঃ ধীমান বণিকের কাছে। তিনি নিজে একজন কার্ডিয়াক সার্জন এবং সহযোগী অধ্যাপক। আমাকে দেখার পর তিনি ইকো, ইটিটি, রক্ত, ইসিজি টেষ্ট করতে দিলেন। সেখানে দুইদিন ধরে আমার টেষ্ট করানো হলো। টেষ্টের রির্পোট দেখে বললেন সব ঠিক আছে আপাতত। নতুন করে ঔষধ লিখে দিলেন এবং তিনমাস পর আবার গিয়ে চেকআপ করাতে বললেন। “আমার কিছুই হয়নি” একজন কার্ডিয়াক সার্জনের মুখে যখন এমন কথা শুনি তখনি মনে হলো আমি সুস্থ হয়ে গেছি।
গতকাল ৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যার ঢাকা হতে বাড়ি ফিরেছি। নিজেকে এখন অনেকটাই সুস্থ মনে হচ্ছে। নিয়মিত ঔষধ সেবন করছি।
আমার অসুস্থতার পর থেকে আমার জন্য যারা দোয়া করেছেন সহযোগীতা করেছেন আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ।
বিশেষ করে আমি রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগের যে সকল চিকিৎসরা আমার প্রথম পর্যায়ের সু-চিকিৎসা দিয়েছেন সেই সকল কাগজাদী দেখে ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এন্ড রিসার্চ ইনষ্টিটিউট কর্তৃপক্ষ বলেছেন রংপুরের চিকিৎসা সঠিক ছিল। নীলফামারী ও রংপুর হাসপাতালের যে সকল চিকিৎসক আমার চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন তাদের প্রতি রইল আমার স্যালুট।
২০১৩ -২০২০- ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনে এটুকু সেবা নিয়েছি তাতে আমি নিজেকে ধন্যমনে করছি। যতদিন ওই হাসপাতালটিতে ছিলাম বা গিয়েছি আমি রেজিস্ট্রেশন ডেস্ক থেকে শুরু“ করে লিফটম্যান, সুইপার, নার্স, কেয়ারটেকার, দারোয়ান, ডাক্তার, প্রশাসন যতটা পেরেছি একা একা খেয়াল করেছি। ভিড়ের মাঝে তাদের লক্ষ্য করেছি। কাজের চাপ দেখেছি। মানুষ গিজগিজ করছে সেবা নেয়ার জন্য, লিফটে ওঠার জন্য, কাউন্টারে টেষ্টের টাকা জমা দেয়ার জন্য। সবাইকে মনে হয়েছে আন্তরিক।

বাংলাদেশের হাসপাতাল এবং সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবহার ভাল হয় না। লিফটম্যান মুখ গোমরা করে থাকে, নার্সরা একবারের বেশি দুবার ডাকলে বিরক্ত হয়, খাবার বহনকারী গাড়ির ছেলেটি বলে, পারলে খান, না পারলে খাইয়েন না। কিন্তু এখানে ঠিক তার উল্টো।লিফটম্যানকে দেখবেন হাসিমুখে সবাইকে যার যার তলায় নামিয়ে দিতে চাইছে, ভিজিটররা তর্কে জড়িয়ে গেছেন, সেটা সামাল দিচ্ছে, সবাইকে ভাই ডেকে জায়গা করে দিতে বলছে, কোন রোগীকে নিতে গেলে সবাইকে সহযোগিতা করতে বলছে। কখনও হাসি ছাড়া দেখিনি। নার্সদের দেখেছি বিভিন্ন তলায় সারাক্ষন দৌড়ের ওপর। কিন্তু কাউকে হাসি ছাড়া দেখিনি। কাউন্টারে টেষ্ট ফির টাকা নেন যে ভদ্রলোক তাকেও একবারও বিরক্ত মনে হয়নি। কিন্তু হাজার হাজার মানুষ গিজগিজ করছে হাসপাতালের সেবা নেয়ার জন্য।

কয়েকজন নার্সদের সঙ্গে কথা হয় আমার। এবার যখন ইটিটি, ইকো ও ইসিজি করছিলাম ঠিক তখন । তারা সকলেই বললেন এই হাসপাতাল হতে তাদের সকলকে ভারতের ভেলরের সিএমসি হতে প্রশিক্ষন নিতে হয়েছে। এ ছাড়া আমাদের সকলের খোজখবর সব সময় নিয়ে থাকেন জাতীয় অধ্যাপক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল মালিক, ডাঃ অধ্যাপক ফাজিলা তুন নেছা। কোন রোগী যাতে এই প্রতিষ্ঠান হতে বিমুখ না হয় সেদিকে নজরদারী করা হয় বেশী। আমরা এখানে সকল হৃদরোগীকে নিজেদের ভাই, বোন, মা, বাবার চোখে দেখেই সেবা দিয়ে যাচ্ছি। তাদের কথা এমনটাই যে হাসপাতালের পরিবেশ তো গম্ভীর করে রাখার প্রয়োজন নেই। হাসপাতাল হবে বাড়ির মতো। মানুষ হেসে-খেলে চিকিৎসা নিয়ে যাবে। আমরা সহজ থাকলে রোগীরা অনেক বেশি সহজ থাকেন। তাতে সেবাটা অনেক বেশি কার্যকরী হয়। আমাদের মুখ গোমরা দেখলে আপনি কি সহজে কথা বলতে পারবেন? আমি তাকে বললাম, জ্বি, আমি সেটা জানি। কিন্তু বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে দেখি না তো, তাই জিজ্ঞেস করলাম। উত্তর পেলাম আমাদের রোগীদের আমরা সব সময় হাসি উপহার দিয়ে থাকি। হাসি মুখে রোগীরাও অনেক সুস্থবোধ করেন। আমাদের পুরো পরিবেশ এখন এমন হয়ে গেছে।
এই হাসপাতালের ব্যবস্থা দেখে, ডাক্তারদের প্রফেশনাল দায়িত্ববোধ দেখে, নার্সদের সেবা – ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের সবকিছু দেখে আমি মুগ্ধ। আমি এখন বলছি, হার্টের কোন সমস্যা হলে আপনারা হার্ট ফাউন্ডেশনে গিয়ে সেবা নিয়েন।
বাংলাদেশে জঙ্গলের মধ্যে হঠাৎ খুব সুন্দর একটি সাজানো বাগান দেখলে মনটা ভাল হয়ে যায়। অনেক সময় বিশ্বাসও করতে কষ্ট হয়। কিন্তু কেউ কেউ যে সফল হয়ে যান তার প্রমাণ দিচ্ছেন ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এন্ড রিসার্চ ইনষ্টিটিউট।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশনের পরিধি আরও বড় হোক, অনেক বড়! সেই সঙ্গে দাবি করি-রংপুর বিভাগীয় শহরে যদি ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন এন্ড রিসার্চ ইনষ্টিটিউটের একটি শাখা প্রতিষ্ঠা করা হতো তাহলে রংপুর বিভাগের আট জেলা সহ উত্তরাঞ্চলের হৃদরোগীরা খুবই উপকৃত হতো। কারন এই অঞ্চলে হৃদরোগের রোগীর সংখ্যা অনেক বেশী। Tahmin Huq Boby

Leave a Reply

Your email address will not be published.