পশ্চিমবঙ্গের বসিরহাট ও পলাশির যুদ্ধ

পশ্চিমবঙ্গের বসিরহাট ও পলাশির যুদ্ধ

কলাম ও ফিচার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
সাজেদ রহমান, সিনিয়র সাংবাদিক।।  ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে পরাজিত হন বাংলার নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা। মুর্শিদাবাদের তখতে বসে তিনি লর্ড ক্লাইভের হাতে তুলে দিয়েছিলেন বাংলার কয়েকটি অঞ্চল। লর্ড ক্লাইভ ছিলেন বাংলার প্রথম ইংরেজ জায়গিরদার। ওই সময় থেকে পশ্চিমবঙ্গের বসিরহাট একটি মহকুমা হিসেবে চিহ্নিত হয়। ইছামতীর নোনতা জল থেকে নুন তৈরি হত তখন। ইছামতী ধারে বর্তমানে সোলাদানার বাগুন্ডি গ্রামে ইংরেজ কোম্পানি ‘সল্ট সুপারিন্টেন্ডেন্ট’ অফিস খুলেছিল। নুন বিকিকিনির এক জমজমাট কেন্দ্র হয়ে ওঠে বসিরহাট।
জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের বিখ্যাত প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিমকি দেওয়ান বা লবণ-কর্তার পদ দিয়ে। তাঁর প্রথম পোস্টিং ছিল সেই বাগুন্ডি। কলকাতার বরানগর ঘাট থেকে ইছামতী দিয়ে তিনি সেখানে যেতেন। থাকতেন টাকির জমিদার মুন্সি কালীনাথ রায়চৌধুরীর বাড়িতে।
পরবর্তীকালে ব্রিটিশ আমলেই ১৮১০ সালে বসিরহাটে রমরমিয়ে নীলের ব্যবসাও শুরু হয়। একই সঙ্গে নীল আর নুনের ব্যবসা করে প্রচুর মুনাফা করত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ইছামতীর দু’ধারে নীলকুঠি তৈরি হয়। ১৮৪০ সালে এই নদীর ধারে হাট শুরু হয়। বসিরহাটের পুরোনো বাজার চালু হয় ১৯০০ সালে। আর ১৯২২ সালে নতুন বাজারের পথ চলা শুরু হয়েছিল।
স্বাধীনতা সংগ্রামী দীনেশচন্দ্র মজুমদার বসিরহাটে জন্মেছিলেন ১৯০৭-এ। ব্রিটিশ আমলের শেষ দিকে বসিরহাট হয়ে উঠেছিল কৃষকদের তেভাগা আন্দোলনের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রাণকেন্দ্র। তবে বসিরহাটের ইতিহাস খুবই প্রাচীন। জায়গাটির নামকরণ কীভাবে হল, তা নিয়েও রয়ে গেছে ধোঁয়াশা। কেউ বলেন, ডক ঘাটের ইজারাদার বসু পরিবারের থেকে ‘বসুর হাট’ অথবা ‘বসুদের হাট’ কথাটি এসেছে।
পরে সেটাই হয়ে গেছে ‘বসিরহাট’। কারো কারো মতে, ‘বসি’ মানে ‘নিচু জমি’। সেখান থেকেই এসেছে ‘বসিরহাট’ নামটা। আবার ‘বশি’ মানে নুন। বসিরহাটে যে একটা সময়ে নুনের বাণিজ্য চলত, সে তো জানাই গেছে। তার থেকেও নামটা আসতে পারে। কিছু লোক বলেন, বাঁশের হাট থেকে এরকম নাম হয়েছে। ‘বসতি’ থেকেও বসিরহাট নামটা আসতে পারে, এই সম্ভাবনার কথাও বলেছেন কিছু মানুষ।
ভাষাবিদ সুকুমার সেন জানিয়েছেন, ‘বশী’ নামের কোনো ব্যক্তির থেকে জায়গার নাম হয়েছে। তাঁর মতে, ‘বশী’ শব্দের অর্থ হল ‘জিতেন্দ্রিয়’, ‘স্বাধীন’, ‘মুক্ত’ কিংবা ‘স্বতন্ত্র’। ওই যুক্তিকে অনুসরণ করেই, বসিরহাটে এক সময়ে করমুক্ত বাণিজ্য চলত বলে এই ধরনের নামকরণ হয়েছে জায়গাটার, সেটাও অনেকে দাবি করেন। আবার একটা প্রচলিত কথা হল, বসির মহম্মদ বা বসির খানের থেকে গোটা অঞ্চলের নাম হয়েছে বসিরহাট।
মধ্যযুগে এখানে বসিরের নামে হাট বসত বলে একটা মত চালু আছে। এখানে মুসলমান জনবসতি গড়ে উঠেছিল ১২০০ সালের পর। বসিরহাটের শাহি মসজিদ গড়ে ওঠে ১৪৬৬ সালে। ভারত স্বাধীন হলে বাংলাদেশ সীমান্তের একটি মহকুমা অঞ্চল ও শহর হিসেবে বসিরহাট পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। ভিজিট করুন