"প্রিয় কবি, আমি আপনার একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিতে চাই

“প্রিয় কবি, আমি আপনার একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিতে চাই

সাহিত্য মতামত
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
.
১. এক তরুণ কবি আমাকে ইনবক্সে লিখলেন, “প্রিয় কবি, আমি আপনার একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নিতে চাই। দুই বাংলার ২৫জন কবির সাক্ষাৎকার নিয়ে আমি একটি বই প্রকাশ করবো।” আমি সম্মতি দিয়ে লিখলাম, “প্রশ্নগুলো পাঠাও, আমি সময় মতো উত্তর লিখে পাঠাবো।” ক’দিন পরে তিনি আবার ইনবক্সে লিখলেন, “দু’এক দিনের মধ্যেই আমি প্রশ্নগুলো পাঠাচ্ছি।” এর তিন দিন পর তিনি আবার ইনবক্স করে জানালেন, “কবি, আমি বড়ো বিপদে পড়েছি, আমার ৫০ হাজার টাকা দরকার। আপনাকে এভাবে বলতে খারাপ লাগছে, কিন্তু কোনো উপায় না দেখে বলতে হলো।” আমি উত্তরে লিখলাম, “তুমি আমার ছোটো ভাইয়ের মতো, তোমার বিপদে সাহায্য করতে পারলে ভালো লাগতো। কিন্তু আমার অপারগতার জন্যে আমি দুঃখিত। আশা করি তুমি সত্বর বিপদমুক্ত হবে।” না, ওই তরুণ কবি আমার সাক্ষাৎকার নেবার জন্যে আর কখনো ইনবক্স করেনি।
২. বেশ ক’বছর আগে এক ভদ্রলোক বইমেলায় আমাকে বললেন যে তিনি একজন সাংবাদিক। একটি দৈনিকের সাথে যুক্ত। পরদিন বললেন, “আমরা প্রথম পাতায় লেখকদের ফিচার করছি, আপনি নিশ্চয়ই দেখেছেন।” আমি বললাম, “জ্বী, দেখেছি।” এর পর তিনি বললেন, “আপনি তো বেশ পরিচিত লেখক, আপনারও একটা ফিচার করতে চাই।” আমি বললাম, “বেশ তো, একদিন কথা বলে নিন।” দু’দিন পর ভদ্রলোক আবারও এলেন লিটলম্যাগ চত্বরে। বললেন, “আপনার সাথে কথা বলবো।” আমি বললাম, “বলুন।” তিনি আমতা আমতা করে বললেন, “আমাদের পত্রিকায় বেশ খরচ হয়। আপনি যদি…।” আমি বললাম, “আমি যদি,…কি বলুন!” তিনি আরেকটু কাছে এসে বললেন, “আপনি যদি কিছু টাকার ব্যবস্থা করতেন।” আমি বললাম, “ভাই, আপনি সম্ভবত আমাকে চেনেন না! ওই যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেখছেন, আমি ওখানে আশির দশকের শেষ দিকে দাঁপিয়ে বেড়াতাম। আমি কিন্তু এই দেশে বা এই ভাষায় আগন্তুক নই।” তিনি এবার একটু সরে দাঁড়ালেন, “আপনি ব্যাপারটিকে ওভাবে নিচ্ছেন কেনো!” আমি বললাম, “দয়া করে আর কথা বাড়াবেন না। আপনি এবার যেতে পারেন।” ভদ্রলোক আর কখনো আমার ফিচার করতে আসেননি।
৩. ঢাকায় আমাদের অনেক বন্ধু, ছোটো ভাইয়েরা টিভি সাংবাদিক। এদের কারো কারো উপর বইমেলা কাভার করার দায়িত্ব পড়ে। হাতে গোণা কয়েকজন কাজটি সূচারু রূপে করলেও, অনেকেই এটাকে নিজেদের তুলে ধারার জন্যে, গুরুত্ব বাড়াবার জন্যে নানা কৌশল অবলম্বন করেন। আমাদের এমন একজন বন্ধুকে দীর্ঘ দিন ধরে লক্ষ্য করছি তিনি মেলায় এলেই তার পিছে ভিড় লেগে যায়। তিনি নিয়মিত তার সদ্ব্যবহার করেন। একদিন, বিকেলে লিটলম্যাগ চত্বরে তেমন ভিড় ছিলো না। আমি চত্বরের মাঝামাঝি দু’টি চেয়ার নিয়ে আরেক তরুণ কবি বন্ধুর সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম। ওই সময় দেখা গেলো ক্যামেরা হাতে পাশ দিয়ে যেতে যেতে আমাদের সেই বড়ো টিভির বড়ো বন্ধু আমাকে বললেন, “আজ একটু থাইকেন কিন্তু, আমি কিছুক্ষণ বাদে আসতাছি।”
লিটলম্যাগে কতোরকম আড্ডা হয়। আড্ডা দিতে দিতে সময়ও চলে যায় বেশ দ্রুত। ঘণ্টা দেড়েক পরে এক ভদ্রলোক হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে বললেন, “ভাই আপনি তাড়াতাড়ি আসেন। বস আপনার জন্যে অপেক্ষা করছেন।” আমি প্রথমে ধরতে পারিনি, জিজ্ঞেস করলাম, “কার কথা বলছেন?” তিনি বললেন, “কিছুক্ষণ আগে বস আপনাকে থাকতে বলে গেলেন, আমি উনার এসিসটেন্ট।” আমি বললাম, “ও আচ্ছা। ” লোকটি আমাকে তাড়া দিলেন, “তাড়াতাড়ি চলেন।” আমি আমার তর্জনি তাক করে দেখিয়ে বললাম, “ওই দেখুন, ওটা ‘শব্দগুচ্ছ’ পত্রিকার স্টল। ওখানে গিয়ে বলুন, হাসানআল আব্দুল্লাহ’র নতুন বইগুলো দিন। ওখানকার ছেলেটি আপনাকে দু’খানা বই দেবে। বই দুটো নিয়ে আপনার বসকে দেবেন। আর বলবেন আমি ধন্যবাদ জানিয়েছি।”
ভদ্রলোক দ্রুত স্টলের দিকে ছুটলেন, কিন্তু আমার মনে হলো অর্ধেক পথ গিয়ে তিনি বুঝতে পারলেন ঘটনাটি কি ঘটলো। তিনি এবাইট টার্ন করে যেদিক থেকে এসেছিলেন সেদিকে চলে গেলেন। আমার সাথে বসা তরুণ কবি বললেন, “অন্তত এটা বুঝতে শিখুক, কবি ক্যামেরার পিছনে দৌড়ায় না।” আমি বললাম, “ওদের কোনো দোষ নেই, বহুলোক এভাবে মুখ দেখানোর দৌড়ে নিজেদেরকে নিয়োজিত রেখেছে।” -কবি  হাসানআল আব্দুল্লাহ