সিউড়ির মোরাব্বা

বীরভূমের সিউড়ির মোরাব্বা

কলাম ও ফিচার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
সিউড়ির মোরাব্বা
সাজেদ রহমান।। সিনিয়র সাংবাদিক।।
পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম-এর জেলা শহর সিউড়ি গেছি মাত্র একবার। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি। শুনেছিলাম সেখানকার সিউড়ির মোরাব্বা বিখ্যাত। তাই কবিতা হোটেলে ব্যাগ রেখে চললাম মোরব্বার খোঁজে।
অনেক দোকানেই পাওয়া যায় মোরব্বা। স্বাধীনতার বহু আগে নবাবের আমলের জনপ্রিয় হওয়া এই মুরাব্বার ব্যবসা নতুন করে শুরু করেছিলেন সজনীকান্ত দে। সিউড়ির মালিপাড়া জোনাকি ক্লাবের কাছেই ছিল সেই কুঞ্জলাল বিহারের মিষ্টান্ন ভান্ডার। তার ছেলে দিগম্বর প্রসাদ দে হাজার ১৯৫০ সালের পরের দিকে সিউড়ির টিন বাজারে তৈরি করেন মোরাব্বা মন্দির মন্দির। ১৯৭৪ সালে তাদের বংশধর নন্দদুলাল সিউড়ি বাস স্ট্যান্ড দোকানের নাম রাখেন ‘মোরাব্বা’।
রাজনগর নবাবের প্রিয় ঐতিহ্য বহন করে চলেছে এই দোকান। দাবি নন্দদুলাল বাবুর ছেলে গৌরাঙ্গের। বাব ঠাকুরদার তৈরি করা মোরাব্বার ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে অতিমাত্রায় আগ্রহী তিনি। তাই উচ্চ শিক্ষিত হয়েও চাকরির মায়া ছেড়ে দিয়ে মন দিয়েছেন ব্যবসায়াতেই।
কলকাতায় ব্রিটিশদের গড়ে তোলা স্থাপত্য আমাদের মুগ্ধ করে। ব্রিটিশদের আগে পর্তুগিজদের থেকেও আমার পেয়েছি অনেক কিছু। বিশেষ করে মিষ্টির কথা বলাই যায়। বাঙালি ছানার ব্যবহার শিখেছে পর্তুগিজদের কাছে। প্রাচীন ভারতে ছানাকে অপবিত্র মনে করা হত, তাই খাওয়া নিষিদ্ধ ছিল। রসগোল্লা জন্য তাই পর্তুগিজদের কাছে ঋণ স্বীকার করতেই হয়। তাদের দৌলতে আরও বেশ কিছু মিষ্টির প্রচলন। এমনকি পর্তুগিজরা আমাদের মোরব্বা বানানোও শিখিয়েছে।
‘মোরব্বা’ ফল, চিনি আর মশলা দিয়ে তৈরি হয়। বাঙালি যেমন পর্তুগিজদের থেকে ছানা খাওয়া শিখেছে, সুস্বাদু মোরব্বা তৈরির পদ্ধতি জেনেছে তাদের থেকেই। সিউড়ির মোরব্বার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। লোকে বলে, এখানকার জিভে জল আনা মোরব্বা প্রথম বানানো হয়েছিল রাজনগরে। কাঁচা ফলমূল গাঢ় চিনির রসে ডুবিয়ে মোরব্বা তৈরি হয় এই সিউড়িতে। পটলের মোরব্বা, বেলের মোরব্বা, চাল কুমড়োর মোরব্বা, আমলকির মোরব্বা ইতিমধ্যেই বেশ জনপ্রিয়।
দূর-দূরান্ত থেকে যে সমস্ত পর্যটকেরা সিউড়ি যান, মিষ্টির দোকান থেকে পছন্দমতো মোরব্বা খেয়ে পঞ্চমুখ হন প্রশংসায়। আমিও হয়েছিলাম।
বিশিষ্ট লেখক অবিনাশচন্দ্র ঘোষ লিখেছেন, পর্তুগিজ বণিকদের থেকেই ভারতে মোরব্বার প্রচলন ঘটে। সিউড়ির বিখ্যাত মোরব্বা নিয়ে আরেকটি গল্প প্রচলিত আছে। স্থানীয় লোকেরা বলে থাকেন, ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে মিষ্টি ব্যবসায়ী হরিপ্রসাদ দে গিয়েছিলেন দিল্লি। সেখানে পেঠা নামের মিষ্টি খেয়ে মোহিত হন। উত্তর ভারতে, বিশেষ করে আগ্রায় এই মিষ্টি তখন প্রচলিত ছিল। হরিপ্রসাদ মিষ্টি তৈরির কৌশল শিখে বাংলায় ফিরলেন আর মোরব্বা বানানোর পরিকল্পনা করলেন। এই ঘটনা সত্যিই ঘটেছিল বলে জানান তাঁর বংশধর নন্দদুলাল দে।
হরিপ্রসাদের নতুন মিষ্টি সবার মন জয় করে নেয়। বাংলার মিষ্টি ব্যবসায়ীরা মোরব্বা নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা শুরু করলেন। পরবর্তীকালে নতুন নতুন সবজি এবং ফল ব্যবহার করে বানালেন নানা রকমের উপাদেয় মোরব্বা। এরপর কেউ যখন বীরভূম যাবেন, সিউড়ির মোরব্বা চেখে দেখতে ভুলবেন না।