মিষ্টিার নাম সীতাভোগ

মিষ্টিার নাম সীতাভোগ এবং মিহিদানা

কলাম ও ফিচার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
মিষ্টিার নাম সীতাভোগ
মিষ্টিার নাম সীতাভোগ

 

মিষ্টিার নাম সীতাভোগ। গিয়েছিলাম ২০১৬ সালের মে মাসে। প্রচন্ড গরম। বর্ধমান তখন গরম। যাচ্ছি রস্তার পাশ দিয়ে। গাড়ির চালক বললেন-এখানে সীতাভোগ পাওয়া যায়।

 

আমি বললাম সেটা কি ? চালক বলল-মিষ্টি। বললাম সেটা খাব এবং নেব। সে নিয়ে গেল সীতাভোগ মিষ্টির দোকানে। মিষ্টির নাম সাথে স্বাদও অপূর্ব। এই মিষ্টির একটি ইতিহাস আছে।

 

১৯০৪ সালে বর্ধমানের রাজা বিজয়চন্দ মহাতাবকে রাজাধিরাজ উপাধি দেয় ইংরেজ সরকার। এই উপলক্ষ্যে বর্ধমান রাজপ্রাসাদে এক বিরাট অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে বাংলার তৎকালীন বড়লাট লর্ড কার্জন বর্ধমান সফরে আসেন। সঙ্গে ছিলেন হাইকোর্টের বিচারপতি-সহ তাবড় তাবড় সব অতিথিরা।

 

বড়লাটকে খুশি করার জন্য এবং অনুষ্ঠানকে আরও স্পেশাল করার জন্য বর্ধমানের রাজা বিজয়চন্দের নির্দেশে দুটি একদম নতুন মিষ্টি তৈরি করা হল। নাম দেয়া হল সীতাভোগ আর মিহিদানা। আর নতুন দুই মিষ্টির স্বাদ পেয়ে বড়লাটসহ বাকি অতিথিরা খুব খুশি হয়ে ছিলেন বলে জানা যায়।

 

বিজয়চাঁদ মহতাব বর্ধমানের জনপ্রিয় মিষ্টি প্রস্তুতকারক ভৈরবচন্দ্র নাগকে একটি বিশেষ মিষ্টি প্রস্তুত করতে বলেন। ভৈরবচন্দ্র নাগ মিহিদানা ও বর্ধমানের অপর বিখ্যাত মিষ্টান্ন সীতাভোগ তৈরী করেন। এই ভৈরব নাগের আদিবাড়ি ছিল খণ্ডঘোষের সাঙঘাটগোলা গ্রাম। নাগেরা ছিলেন রাজাদের খাস মিষ্টান্ন প্রস্তুতকারক।

 

রাজাদের আমন্ত্রণে ভৈরবের দাদু শ্রীনাথ নাগ পরিবারের লোকদের নিয়ে সেখান থেকে বর্ধমানে চলে আসেন। শ্রীনাথের ছেলে ক্ষেত্রনাথ নাগ। বর্ধমানের রাজা মহতাব চন্দের আমলে এই ক্ষেত্রনাথ নাগই সীতাভোগ আর মিহিদানা প্রস্তুতির আদিপর্ব সেরেছিলেন। কিন্তু তাঁর সীতাভোগ, মিহিদানা ছিল পান্তুয়া ও বোঁদের আকারে।

 

ভৈরববাবু বানিয়েছিলেন এই দু’টির সূক্ষ্ম রূপ। আজ যে আকারে আমরা সীতাভোগ আর মিহিদানাকে দেখি, তা তাঁরই সৃষ্টি। কথিত আছে যে কার্জন সীতাভোগ খেয়ে এতটাই প্রীত হয়েছিলেন যে সমস্ত সরকারি অনুষ্ঠানে তিনি সীতাভোগ পরিবেশন করা বাধ্যতামূলক করেন।

 

তার অনেক বছর পর দুর্গাপুরে কংগ্রেসের এক অধিবেশনে এসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী এবং পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু মিহিদানা খেয়ে বিরাট প্রশংসা করেন।

 

মিহিদানা কীভাবে তৈরি হয় জানেন ? মিহিদানার প্রধান উপাদান কিন্তু চাল। প্রস্তুতিতে সাধারণত গোবিন্দভোগ, কামিনীভোগ অথবা বাসমতী চাল ব্যবহার করা হয়। চাল গুঁড়ো করে তার সঙ্গে বেসন এবং জাফরান মেশানো হয় ভালো করে। তারপর তাতে জল মিশিয়ে একটি থকথকে মিশ্রণ তৈরি করা হয়। একটি ছিদ্রযুক্ত পেতলের পাত্র থেকে সেই মিশ্রণ কড়াইতে ফুটন্ত গাওয়া ঘিতে ফেলা হয়। তারপর দানাগুলি কড়া করে ভেজে ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে তুলে চিনির রসে রাখা হয়। ব্যাস, তৈরি হয়ে যাবে মিহিদানা।

 

তবে এই ধরনের মিষ্টি বাড়িতে তৈরির চেষ্টা না করাই ভালো। কারণ একটাই। আস্‌লি বর্ধমানের হলুদ রঙা মিহিদানা যদি আপনি একবারও চেখে না দেখেন, তাহলে হায় এ বাঙালি জন্ম। অন্যদিকে, সীতাভোগের প্রধান উপাদান সীতাসের প্রজাতির গোবিন্দভোগ চাল। কথিত আছে যে সীতাসের প্রজাতির গোবিন্দভোগ চাল থেকে প্রস্তুত হওয়ার কারণেই সীতাভোগের একটি নিজস্ব স্বাদ ও সুগন্ধ হয়।

 

সীতাসের বর্ধমান জেলার এক বিশেষ অঞ্চলেই উৎপাদিত হয়। এই চাল গুঁড়ো করে তাতে ১:৪ অনুপাতে ছানা মিশিয়ে পরিমাণমত দুধ দিয়ে মাখা হয়। তারপর একটি বাসমতী চালের আকৃতির মত ছিদ্রযুক্ত পিতলের পাত্র থেকে উক্ত মিশ্রণকে গরম চিনির রসে ফেলা হয়। এর ফলে সীতাভোগ বাসমতীর চালের ভাতের মত দেখতে লম্বা সরু সরু দানাযুক্ত হয়। এর সাথে ছোট ছোট গোলাপজাম এবং কখনো কখনো কাজুবাদাম ও কিশমিশ মিশিয়ে পরিবেশন করা হয়।

 

তবে ‘সীতাভোগ’ নামটি নিয়ে বেশ দ্বন্দ্ব আছে পণ্ডিতমহলে। সুকুমার সেনের মতে, বানানটি হওয়া উচিত ‘সিতাভোগ’, ‘সিতা’ অর্থে সাদা। আবার ‘সিতা’-র মানে মিছরিও হয়, তাই সাদা রঙের মিছরির মতন যে মিষ্টি বর্ধমান রাজবাড়ির হালুইকররা বানালেন, তার নাম হয়ে গেল ‘সিতাভোগ’।

লেখক – সাজেদ রহমান, সিনিয়র সাংবাদিক ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.