মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে ক্যাপ্টেন হুদাকে কেউ কোন দিন চোখের পানি ফেলতে দেখেননি।

মুক্তিযুদ্ধ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাজেদ রহমান।। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে ক্যাপ্টেন হুদাকে কেউ কোন দিন চোখের পানি ফেলতে দেখেননি। যুদ্ধ ক্ষেত্রে কোন আবেগই স্পর্শ করত না তাঁকে। কিন্তু তিনি চোখের পানি ফেলেছিলেন মাত্র দু’দিন, ১৯৭১ সালের ২৭ জুন যেদিন সুবেদার মনিরুজ্জামান শহীদ হন, আর ৫ সেপ্টেম্বর আত্বত্যাগের মহিমা স্থাপন করেন সহকর্মীদের জীবন বাঁচান নুর মোহাম্মদ সেদিন।
যুবক নূর মোহাম্মদ শেখ ১৯৫৯-এর ১৪ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস বা ইপিআর-এ যোগদান করেন। দীর্ঘদিন দিনাজপুর সীমান্তে চাকরি করে ১৯৭০ সালের ১০ জুলাই নূর মোহাম্মদকে দিনাজপুর থেকে যশোর সেক্টরে বদলি করা হয়। এরপর তিনি ল্যান্স নায়েক পদে পদোন্নতি পান। ১৯৭১ সালে যশোর অঞ্চল নিয়ে গঠিত ৮নং সেক্টরে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদান করেন। যুদ্ধ চলাকালীন যশোরের শার্শা থানার কাশিপুর সীমান্তের বয়রা অঞ্চলে ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদা’র নেতৃত্বে পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন।
একাত্তরের ৩০ মার্চ যখন ইপিআর-এর যশোর সেক্টরের সদস্যরা বিদ্রোহ করেন, তখন তিনি ছিলেন তাঁদের অন্যতম। বয়রা সাব সেক্টরের অধীন নুর মোহাম্মদকে তাঁর সাহসিকতা এবং নেতৃত্বে সুলভ গুনাবলীর জন্য একটি কোম্পানি প্রধানের দায়িত্ব দেয়া হয়। ঝিকরগাছার গঙ্গানন্দপুর পাকবাহিনীর ঘাঁটি থেকে কাশীপুর হয়ে বয়রা পর্যন্ত আসার কাঁচা রাস্তা ছিল দু’টি। একটি হলো, গঙ্গানন্দপুর-গোয়ালহাটি-আটুলিয়া-গুলবাগপুর-বেংদহ-কাশীপুর-বয়রা। অন্যটি গঙ্গানন্দপুর-বিষহরি-মৌতা-বেলতা-কাশীপুর-বয়রা। তাদের আসার দুটি পথেই মুক্তিবাহিনীর তরফে কড়া প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। চালু রাখা হয় সার্বক্ষণিক টহল ব্যবস্থাও। ৫ সেপ্টেম্বর এমন ধরনের একটি টহল দলের দায়িত্ব দিয়ে গোয়ালহাটিতে ছিলেন নুর মোহাম্মদ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন সহযোদ্ধা নান্নু মিয়া এবং মোস্তফা। আর মুল দল ছিল আরও পিছনে আটুলিয়ার দিকে। তখন পড়ন্ত বেলা। ১৫০ জনের মত পাক সেনা ও রেঞ্জারের একটি দল গঙ্গানন্দপুর থেকে গোয়ালহাটির দিকে এগোতে থাকে ত্রিমুখী কলাম ধরে। ওদের অগ্রবর্তী দলটির ওপর গুলি ছোড়া ছাড়া সেই মুহুর্তে তিন জনের সামনে আর কোন বিকল্প ছিল না। গুলি ছুড়তে ছুড়তে নুর মোহাম্মদ ও তাঁর দুই সঙ্গী নিরাপদ অবস্থানে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এলএমজি ছিল নান্নু মিয়ার হাতে, শত্রুুর একটি গুলি এসে লাগে তাঁর শরীরে। তিনি গুরুতর আহত হন। নুর মোহাম্মদ নিজ কাঁধে আহত সহযোদ্ধাকে তুলে নিয়ে পিছাতে থাকেন, গুলিও ছুড়তে থাকেন মাঝেমধ্যে শত্রুুকে ঠেকাতে। এ সময় মোস্তফা কাছাকাছি এসে পড়ায় নুর মোহাম্মদ তাঁকে নির্দেশ দেন নান্নু মিয়াকে নিয়ে আরও পিছনে মুল অবস্থানে চলে যেতে। এরপর নুর মোহাম্মদ বার বার অবস্থান বদল করে শত্রুুকে বিভ্রান্ত করার জন্য গুলি ছুড়তে থাকেন। শত্রুু মনে করে মুক্তিবাহিনীর অসংখ্য সৈনিক তাদের প্রতিরোধ করছে। এ সময় একটি মর্টারের গোলা এসে নুর মোহাম্মদের ডান পা গুড়িয়ে যায়। জীবন-মৃত্যুর সেই সন্ধিক্ষনে তবুও সহযোদ্ধাদের নিরাপদ স্থানে পৌঁছানোর সুযোগ দিতে নুর মোহাম্মদ তার শেষ বুলেটটি পর্যন্ত খরচ করেন। নান্নু মিয়াকে নিরাপদে মুল ঘাঁটিতে ফিরে আসা মোস্তফা আরও মুক্তিযোদ্ধা সঙ্গীসহ শত্রুুর মুখোমুখি হলো। আধ ঘন্টার তুমুল যুদ্ধ শেষে ২৩টি লাশ পিছু ফেলে পালিয়ে যায় হানাদার বাহিনী। মুক্তিযোদ্ধারা গোয়ালহাটিতে এক জঙ্গলের ভেতর খুঁজে পায় ল্যান্স নায়েক নুর মোহাম্মদের দেহটি। নরপশু হানাদাররা গুলি বিহীন এক কথায় নিরস্ত্র নুর মোহাম্মদকে বেয়নেট দিয়ে হত্যা করেছে। তুলে নিয়েছে তাঁর দুইটি চোখও।
নুর মোহাম্মদের লাশ কাশীপুর আনা হলে ক্যাপ্টেন হুদা বয়রা থেকে সেখানে চলে আসেন। মাথার টুপি খুলে অভিবাদন জানান তাঁর প্রিয়সহকর্মীকে। বয়রা সাব সেক্টরের সাহসী অধিনায়ক ক্যাপ্টেন হুদা শিশুর মতো সেদিন দু’চোখের পানিতে বুক ভাসান। নুর মোহাম্মদের লাশ ছুঁয়ে শপথ নেন-যে ভাবেই হোক গঙ্গানন্দপুর থেকে শত্রুুকে হটিয়ে দেবেন। পুর্ণ সামরিক মর্যাদায় কাশীপুর-বয়রা সড়কের ধারে নুর মোহাম্মদকে সমাহিত করা হয়। নুর মোহাম্মদ জানতেন-মৃত্যু অনিবার্য, তবুও টহল দলের অধিনায়ক হিসাবে নিজের জীবন দিয়ে, তিনি সহকর্মীদের বাঁচিয়ে ছিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.