মুক্তিযোদ্ধা সালেহা আপার পতাকা তৈরির ইতিহাস

মুক্তিযোদ্ধা সালেহা আপার পতাকা তৈরির ইতিহাস

জাতীয় খবর
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
সাজেদ রহমান, সিনিয়র সাংবাদিক।।  সালেহা বেগমের শিক্ষা জীবন শুরু হয়েছিল যশোর শহরের খ্রিষ্টান মিশনারিদের পরিচালিত সেক্রেট হার্ট স্কুলে। এরপর তিনি সরকারি বালিকা বিদ্যালয় এবং সেবা সংঘ বালিকা বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। এসএসসি পাস করেন সেবা সংঘ থেকে। যশোরের মহিলা কলেজ এবং সর্বশেষ মাইকেল মধুসূদন(এমএম) কলেজে লেখাপড়া করেন তিনি। গার্লস গাইডের গুণাবলী বিকশিত হয়। ১৯৬৮ সালে এসএসসি পাস করার পর তাঁর ছাত্র রাজনীতিতে ছাত্র ইউনিয়নের মেনন গ্রুপের অবস্থান শক্তিশালী।

সালেহা বেগম বলেন, আমি তাঁদের সাথে কথা বলি। তাঁরা একটি নতুন সমাজ গঠনের অঙ্গীকারের কথা বলতেন। শহীদ আসাদ(১৯৭১-এ শহীদ এমএম কলেজের ভিপি ও ছাত্র ইউনিয়ন(মেনন গ্রুপ) নেতা ছিলেন এবং নার্গিস বেগম(সাবেক মন্ত্রী বিএনপি’র তরিকুল ইসলামের স্ত্রী) আমাকে সমাজতন্ত্রের বিষয়ে নানা ধারণা দিতেন। এরপর যোগাযোগ হয় ছাত্রলীগরে আলী হোসেন মনি(একাত্তরে মুজিব বাহিনীর বৃহত্তর যশোর জেলা প্রধান) ও রবিউল আলম( মুজিব বাহিনীর যশোর জেলা উপপ্রধান এবং বর্তমান জাসদের কেন্দ্রীয় নেতা)সহ অন্যান্যদের সাথে। তাঁরা আমাকে এমন কথা বলেন যা কখনই শুনিনি। তাঁদের বক্তব্য ছিল, আমরাও নতুন সমাজ চাই, তবে তার আগে প্রয়োজন দেশের স্বাধীনতা অর্জন। আমার মনে হয়, তাঁদের বক্তব্যই সঠিক। আগে দেশের স্বাধীনতা প্রয়োজন। কিন্তু কিভাবে?…তারাঁ স্পষ্ট কিছু সেদিন না বললেও এমন ইঙ্গিত দেন যে, তাঁরা গোপনে গোপনে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমার নিজের মধ্যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। মনে হয় আমি নিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতিতে সামান্যতম ভূমিকা রাখতে পারি, তাহলে আমার জীবন ধন্য হবে। পরে বুঝতে পারি যে, তারা নিউক্লিয়াস গ্রুপের কথাটিই আমাকে আকারে ইঙ্গিতে জানিয়েছিলেন।

যশোরে একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রস্তুতিলগ্নে গ্রুপ বা স্বাধীন বিপ্লবী পরিষদের প্রসঙ্গটি বিশেষ করে তার ইতিহাস এসে পড়ে। ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্ব ১৯৬২ সালে নিউক্লিয়াস গ্রুপের জন্ম হয় ঢাকাতে। ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে স্বাধীনতার জন্য গঠিত এই গ্রুপটি সমমনাদের সারা দেশে সংগঠিত করার উদ্যোগ নেয়। যদিও পরিষদের অন্যতম নেতা বর্তমান মন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, নিউক্লিয়াসের গঠনকাল ১৯৬৪ সালে। কেন্দ্রীয় থেকে যশোর অঞ্চলে সংগঠন বা সেল গঠনের দায়িত্ব দেয়া হয় প্রধান তিন কেন্ত্রীয় নেতার একজন কাজী আরেফ আহমেদকে। তাঁর সাথে পরে যুক্ত হন শরীফ নুরুল আম্বিয়া। কাজী আরেফের গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ার মিরপুর। অন্যদিকে নুরুল আম্বিয়ার বাড়ি নড়াইলে। যশোর তাঁদের কাছে পরিচিত বিধায় দায়িত্বটি তাঁরাই পান। সীমান্ত শহর এবং সেনানিবাস থাকায় যশোরে সংগঠন বিস্তার করাটা ছিল নিউক্লিয়াস গ্রুপের কাছে একটি চ্যালেঞ্জেরও।

১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে যশোর জেলার সমস্ত মহকুমা এবং থানাতে নেতৃত্ব পর্যায়ে এই গ্রুপ তারা শাখা গঠনে সক্ষম হয়। ১৯৬৮ সালে যশোরে নিউক্লিয়াস গ্রুপ গঠিত হবার পরের বছর সালেহা বেগম তাতে যোগ দেন। যশোরে সে সময় গ্রুপটির সার্বিক দায়িত্ব পালন করতেন ছাত্রলীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সহসভাপতি আলী হোসেন মনি। ছাত্রলীগের যশোর জেলা কমিটি উনসত্তরের গণঅভ্যূখানের ভেতর দিয়ে তাদের ভিত যথেষ্ট শক্তিশালী করে। নতুন যে কমিটি গঠিত হয়, তার সভাপতি নির্বাচিত হন টিপু সুলতান, আর সম্পাদক রবিউল আলম। এর সাহিত্য সম্পাদিকা হন সালেহা বেগম। এই কমিটিই বহাল থাকে স্বাধীনতা যুদ্ধের পর পর্যন্ত। যে কারণে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে থাকা নিউক্লিয়াস গ্রুপের ভূমিকাটি অসহযোগ আন্দোলনের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থপিদ ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে সারা পূর্ববঙ্গ গর্জে ওঠে। সাধারণ মানুষও বুঝে যান আলাপ-আলোচনার সময় শেষ হয়ে গেছে, এখন সশস্ত্র যুদ্ধ ছাড়া সামনে এগোবার আর কোন পথ খোলা নেই।

যশোরেও ১ মার্চ মিছিলে সয়লাব হয়ে যায়। নিউক্লিয়াস গ্রুপের ছাত্রলীগ সদস্যরা সিদ্ধান্ত নেন এ সময় তাঁদের সামনে দু’টি প্রধান কর্তব্য। এক. বাছাই সদস্যদের নিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ ও মানুষকে যুদ্ধের উপযোগী করে তৈরি করা অন্তত মানসিকভাবে যাতে তাঁরা প্রস্তুত থাকেন এবং দুই. স্বাধীনতার পতাকা বানিয়ে তা উত্তোলন করা, নিউক্লিয়াস গ্রুপ নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য গোপন বৈঠকের স্থান হিসাবে বেঁচে নিয়েছিলেন সাপ্তাহিক ‘নতুন দেশ’ কার্যালয়টি। এর সম্পাদক মাহমুদুল হক ভাসানী ন্যাপের একজন নেতা হলেও এক দফা অর্থাৎ স্বাধীনতার পক্ষপাতি ছিলেন। তাঁর অফিসে বসেই স্বাধীনতার পতাকা বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নিউক্লিয়াস গ্রুপের সদস্যরা। পতাকাটির ডিজাইন কোন ধরনের হবে তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার পর সিদ্ধান্ত পতাকাটি তৈরির দায়িত্ব পালন করবেন সালেহা বেগম।

যশোর শহরের কাজীপাড়ায় সালেহা বেগমদের বাসায় পতাকা তৈরির কাজ চলে রাতভর। তাঁর মা মমতাজ বেগম এবং বোন সাহিদা বেগম এ ব্যাপারে সাহায্য করেন। সাহিদা নিজেও একাত্তরের অসহযোগ আন্দোলনে রাজপথে সভা-সমাবেশ ও মিছিলে থেকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন সেদিন। বিশ থেকে পঁচিশটি পতাকা বানানো হয়েছিল ওই রাতে। শেষ রাতে তা নিউক্লিয়াস গ্রুপের সদস্যরা যশোর ঈদগাহ ময়দানে উত্তোলন করেন। শহরবাসী পরিদন স্বাধীনতার ওই পতাকা দেখে আন্দোলন-সংগ্রামে আরও উদ্বেলিত হন। সালেহা বেগম জানান, পতাকা তৈরির জন্য নতুন দেশ কার্যালয়ে সভাটি বসেছিল ১ মার্চ সন্ধ্যার পর। আর এর ডিজাইন করা হয় নিউক্লিয়াস গ্রুপের ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি ইশতেহার বা বুলেটিন থেকে। তবে তারিখ এবং পতাকার ডিজাইন নিয়ে নিউক্লিয়াস গ্রুপের অন্য সদস্যদের কিছুটা দ্বিমত আছে। তাঁদের মতে, ৩ মার্চ রাতে নতুন দেশ অফিসে বসে পতাকা তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। ভোরে(৪ মার্চ) তা উত্তোলিত হয় ঈদগাহ ময়দানে। আর পতাকার ডিজাইনটি ছিল নিউক্লিয়াস গ্রুপের কেন্দ্রীয়ভাবে তৈরি একটি পতাকার আদলে।

১৯৭০ সালের ৭ জুন ‘জয়বাংলা বাহিনী’ পল্টন ময়দানে মিছিল করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অভিবাদন জানায়।। ১ মার্চ একাত্তরের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখা হলে ২ মার্চ ছাত্রলীগ ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে যে মিছিল বের করে তাতে ওই একই পতাকাটি’র প্রদর্শত হয়। ৩মার্চ পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের কথা ঘোষণা দেয় এবং আলোচ্য পতাকাটিকেই তারা স্বাধীনত বাংলার পতাকা হিসাবে তুলে ধরে। এটি সারা দেশে স্বাধীনতাকামী মানুষের মধ্যে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। যশোরে তা এসে পৌঁছায় ৬ মার্চ। যাঁরা যশোর নিউক্লিয়াস গ্রুপের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাঁদের আরও বক্তব্য: ৩ মার্চ যশোরে চারুবালা ধর পাক বাহিনীর গুলিতে শহীদ হবার পর অসহযোগ আন্দোলনে নতুন মাত্রা যুক্ত হয়। তাঁর লাশ নিয়ে বিশাল মিছিল বের হয় সেদিন, কিন্তু মিছিলে স্বাধীন বাংলার পতাকা বহন করা হয়নি। ফলে পতাকাটি তৈরি হয়েছিল ৩ মার্চ রাতে। নতুন দেশ অফিসে পতাকা তৈরি এবং ডিজাইনের ব্যাপারে আলোচনায় ঠিক কতজন উপস্থিত ছিলেন, তাতে কয়েকটি নাম এসেছে সর্বসম্মতভাবে। এঁরা হলেন-আলী হোসেন মনি, রবিউল আলম, মাহমুদুল হক, সৈয়দ মহব্বত আলী, আব্দুল হাই, আব্দুস সালাম(মাতৃভূমি পত্রিকার সম্পাদক) প্রমুখ।

তবে সবাই স্বীকার করেন, যশোরের পতাকাটি সবার আলোচনার ভিত্তিতে ডিজাইন করা এবং স্বাভাবিকভাবেই তা ১৯৭০ সালের ৬ জুন তৈরি পতাকার ডিজাইন প্রভাবিত। সাপ্তাহিক নতুন দেশ কার্যালয়ে উপস্থিত নিউক্লিয়াস গ্রুপের লোকজন ছাড়া পাতাকা উত্তোলনের সময় যশোর ঈদগাহ ময়দানে ভোরে উপস্থিত থাকা ব্যক্তিদের নাম নিয়েও কিছুটা বিভ্রান্তি আছে। কিন্তু ওই পতাকা তৈরির পর আন্দোলনে যে নতুন গতিবেগ সঞ্চার হয়েছিল, তা সহজেই অনুমান করা যায়। যশোরে স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকা তৈরির গৌরবে গৌরবাম্বিত সালেহা বেগমের নাম সে সময় খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে জেলার সর্বত্র। পরিস্থিতি দিনকে দিন উত্তপ্ত হতে থাকে। এক দফার প্রতি সর্বত্র সাধারণ মানুষের জনসমর্থণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। কিন্তু এরপর করণীয় কী? এ নিয়ে সবার মধ্যে এমনকি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মধ্যেও সে সময় নানা দ্বিধাদ্বন্ধ¦ কাজ করছিল। তবে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর মোটামুটিভাবে সবাই আঁচ করে নেন যে, সশ্রস্ত্র সংগ্রাম ছাড়া আর কোন পথ খোলা নেই। আওয়ামী লীগের প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এ্যাডভোকেট মোশাররফ হোসেন(জাসদের প্রতিষ্ঠাতা কেন্দ্রীয় সহসভাপতি, ঘাতকের গুলিতে ১৯৭৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি নিহত) আগে থেকেই নিউক্লিয়াস গ্রুপকে সহযোগিতা করতেন। (বাকী অংশ আগামী কাল।)

ধর্মব্যবসায়ীদের মুখোশ খুলে গেছে : ওবায়দুল কাদের