লক্ষণ সেনের রাজধানী শেখহাটি

কলাম ও ফিচার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাজেদ রহমান।।

ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মাদ বিন বখতিয়ার খলজী ১১৯৯ সালে সদলবলে নদীয়া নগরী দখল করে নিলে, লক্ষণ সেন শঙ্খনট(Sankanat) ও বঙ্গাভিমুখে পলায়ন করে। এই শঙ্খনট বা শাঁখনাটিকে ঐতিহাসিকরা শাঁখহাটি বা বর্তমান সেখহাটির সাথে অভিন্ন মনে করেন। শেখহাটি এক সময় যশোর জেলার মধ্যে ছিল। এখন পড়েছে নড়াইল জেলার মধ্যে। সেখহাটি এখন একটি ইউনিয়ন। বেশ বড় বাজার। বাজারের পশ্চিম পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ভৈরব নদ। সেখহাটি বাজারে দেখা স্থানীয় বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবুল কাসেমের সাথে। তিনি আমাদের নিয়ে গেলেন লক্ষণ সেনের ভগ্ন রাজপ্রাসাদে। বাঁশবাগান, বিভিন্ন গুল্মলতা, আতা, আতছটি, ভাটুই গাছ পেরিয়ে দাড়ালাম প্রাসাদের সামনে। এখন কিছু নেই। শুধু ধ্বংস স্তুপ। অথচ একদিন কত সমৃদ্ধ নগরী ছিল এই প্রাসাদকে ঘিরে।
এখন শুধু ইতিহাসের পাতায় লেখা আছে এই সেখহাটির নাম। ইতিহাস বলে, নদীয়া থেকে চুর্ণি নদী হয়ে মাথাভাঙ্গা নদী দিয়ে পরে ভৈরব নদ দিয়ে লক্ষণ সেন সেখহাটিতে পৌঁছান।
নদীয়ার নবদ্বীপ থেকে পালিয়ে লক্ষণ সেন কোথায় গেলেন? নবদ্বীপ ছেড়ে বৃদ্ধ রাজা কোথায় যাবেন, তা সম্ভবত পুর্বেই ঠিক করে রেখেছিলেন। নবদ্বীপে মাত্র তিনি ছিলেন। তাঁর পরিবারবর্গ, সামন্ত ও প্রধান ব্যক্তিগণকে, তাঁর ধন-সম্পদ সমেত নির্বিঘেœ পুর্ববঙ্গে পাঠানোর ব্যবস্থা করে ছিলেন মুসলমান অভিযানের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করার জন্য। সে বয়সে আর তাঁর রাজত্ব করার প্রবৃত্তি থাকার কথা নয়। মাধব সেন, কেশব সেন ও বিশ^রুপ সেন এই তিনজনের কিছু কিছু ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া গেছে। তাঁরা পুর্ববঙ্গে রাজত্ব করতেন। …. সম্ভবতঃ লক্ষণ সেন সেনহাটি নামক যশোর খুলনার একটা জায়গায় শেষ জীবন কাটিয়েছিলেন। কবিরাম নামক জনৈক পন্ডিত লিখেছেন, লক্ষণ সেন সেনহাটি নামক পল্লী স্থাপন করেন। যশোরের বসুন্দিয়ার পাশে সেখহাটীতে(এটা এখন নড়াইল জেলার মধ্যে পড়েছে। এক সময় যশোর জেলার মধ্যে ছিল। ভৈরব নদের পাশে।) তিনি এসেছিলেন। সেখানে বসবাস করতেন। ইতিহাসে বলা হচ্ছে শেখহাটীর সেনহাটির নিকটবর্তী, সেখানে বহু শাঁখারির বাস ছিল। পুর্বে শেখহাটীর নাম সম্ভবত শাঁখহাট ছিল( যশোর-খুলনার ইতিহাস)।
শেখহাটী গ্রামটি এখন একটি ইউনিয়ন। ইউনিয়নটি এখন নড়াইল জেলার মধ্যে পড়েছে। নড়াইল শহর থেকে ২০ কিলোমিটার পশ্চিম-দক্ষিণে এবং যশোরের বসুন্দিয়া সড়কের পূর্ব পাশে অবস্থিত। এর পশ্চিমে- বসুন্দিয়া ইউনিয়ন যশোর সদর ও উত্তরে- যশোরের বাঘারপাড়ার জামদিয়া ইউনিয়ন। উত্তরে নড়াইলের তুলারামপুর ইউনিয়ন পূর্বে – মুলিয়া ইউনিয়ন ও কলোড়া ইউনিয়ন। এছাড়া দক্ষিণে অভয়নগরের শ্রীধরপুর ইউনিয়ন।
শেখহাটীর পশ্চিমে ভৈরবের পাড়ে জগন্নাথ নামের একটি গ্রাম আছে। মুসলমান ঐতিহাসিক লিখেছেন, লক্ষণ সেন পালিয়ে জগন্নাথে গিয়েছেন। একটা জগন্নাথই হোক বা শাঁখহাটই হোক এর কোন একটি স্থানে লক্ষণ সেন বাস করেছিলেন। কোন কোন ঐতিহাসিক মনে করেন, রাজা ঢাকা নগরীর নিকট কোন স্থানে বাকি জীবন কাটিয়েছিলেন। আমরা যেকারণে শেখহাটীর পক্ষপাতি হয়েছি। সেনহাটি গ্রামটি লক্ষণ সেনের স্থাপিত। ওই গ্রামটি রাজা তার জামাতা হরি সেনকে দিয়েছিলেন। লক্ষণ সেন বহু দেবালয়ের প্রতিষ্ঠাতা। শেষ বয়সে তিনি যেখানে গিয়েছেন, সেখানে অনেক মন্দির ও বিগ্রহের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন-তাতে কোন সন্দেহ নেই। শেখহাটীতে ভুবনেশ^রী মুর্তি পাওয়া গিয়েছে এবং প্রতাপাদিত্যের সেনাপতি কালী তা পেয়েছিলেন। তিনি তা পুনরায় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মুর্তিটি ৫ ফুট উচ্চ এবং এতো সুন্দর যে যশোর-খুলনার ইতিহাসের লেখক সতীশ বাবু লিখেছেন এতো মনোহরী মুর্তি তিনি দেখেনি। এই মুর্তির চেয়ে ছোট একটি মুর্তি ঢাকায় পাওয়া গিয়েছিল। তা দেখতে এই রকম। এই দুইয়ের সাদৃশ্য দেখে মনে করা হয় তা তৈরি করেছিলেন একই কারিকর। ঢাকার মুর্তির নিচে লেখা ‘লক্ষণ সেনের রাজত্বের তৃতীয়াঙ্কে নির্মিত’। শেখহাটীর মুর্তিটিও ওই সময়ের তাতে কোন সন্দেহ নেই। ওই পল্লীর নিকটে খুব বড় কৃষ্ণ পাথরের বড় গণেশ মুর্তি পাওয়া গেছে। এছাড়া এর আশেপাশে দেববিগ্রহ বা দেবালয়ের চিহৃ পাওয়া গেছে তাতে অনেকটা সেন রাজাদের সময় নির্দেশ করে। শেখহাটী গ্রামের কামারপাড়ায় দুধকন্ঠ নামক পুকুরটিতে একটি বড় গণেশ মুর্তি পাওয়া যায়। তার নিকট বারুইপাড়ার পুকুরে একটি বাসুদেব ও একটি গণেশ মুর্তি পাওয়া যায়। দুধকন্ঠ পুকুরের নিটক একটি স্থানকে মঠবাড়ি বলে, সেখানে অনেক ইটের স্তুপ আছে। গ্রামের মধ্যে কয়েক স্থানে গভীর খাল বর্তমান আছে। খালের একটি অংশকে কেটে আরও বড় করা হয়েছিল। সেখহাটী ও তার নিকটবর্তী স্থানে আরও কয়েকটি বিগ্রহ পাওয়া গিয়েছিল। এ সকল নির্দশনই নির্দেশ করে এখানে কোন রাজচক্রবর্তীর লোক জনের আবাসস্থল ছিল।
সুত্র: বৃহৎ বঙ্গ, দীনেশচন্দ্র সেন। যশোর খুলনার ইতিহাস, সতীশচন্দ্র মিত্র।
ভৈরব নদের তীরে এই সেখহাটি এক সময় সমৃদ্ধ নগরী ছিল। বহু ভবন ছিল নদের পাড়ে। এখানে বসে তিনি দীর্ঘদিন শাসন কাজ পারিচালনা করেন। এখন তার অস্তিত্ব নেই। একটি মাত্র ভাঙ্গা চুরা ভবনের অংশ অবশিষ্ট রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.