শহীদ চারুবালা কর-এর নামে একটি সড়কের নাম করা হোক

জাতীয় খবর মুক্তিযুদ্ধ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাজেদ রহমান।। যশোরে স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রথম শহীদ চারুবালা কর-এর নামে একটি সড়কের নামকরন করা দাবি উঠেছে।
আজকের দিনটির কথা কেউ মনে রাখেনি। অথচ ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ যশোরবাসীর কাছে ঐতিহাসিক দিন। স্বাধীনতা সংগ্রামে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছিল এই দিনে। পাক হানাদার বাহিনীর নির্বিচার গুলি বর্ষণে এই দিনে যশোরে প্রথম শহীদ হয়েছিলেন চারুবালা কর।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে অনির্দিষ্ট কালের জন্য মুলতবি ঘোষণা করলে সারা দেশের সাথে যশোরের মানুষও ফুঁসে ওঠেন। রাজপথে নেমে আসে প্রতিবাদী মানুষ, মিছিলে-শ্লোগানে প্রকম্পিত হয় রাজপথ, ২ মার্চ রাতের আঁধারে পাক হানাদার বাহিনী যশোর সার্কিট হাউজ, টেলিফোন ভবনসহ সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় অবস্থান নেয় যুদ্ধের পূর্ণ প্রস্তুতিসহ। ৩ মার্চ সকাল সাড়ে ১০টা। স্বতস্ফুর্ত জনতার এক বিশাল মিছিল বের হয়ে ঈদগাহ ময়দান থেকে। দড়াটানা মোড় ঘুরে কাপুড়িয়াপট্টি-চৌরাস্তা হয়ে মিছিলটি প্রবেশ করে রেলরোডে।

জঙ্গী মিছিলটি সরকারি খাদ্য গুদামের সামনে পৌঁছুলে সেখানে পাক হানাদার বাহিনীর সদস্যদের অবস্থান করতে দেখে তাদের দিকে ইট ও জুতা নিক্ষেপ করতে থাকে বিক্ষুব্ধ জনতা। ওই সময় এক পাকসেনা বিক্ষুব্ধ জনতাকে ভীতি প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে ফাঁকা গুলি ছোড়ে, গুলিবিদ্ধ হয় নির্ভয়ে আকাশে ভেসে বেড়ানো একটি চিল। মৃত চিলটিকে নিয়ে মিছিলটি ঢোকে ভোলা ট্যাংক সড়কে। সার্কিট হাউজের সামনে পৌঁছে ভিতরে পাক সেনাদের দেখে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে জনতা। তাঁরা সার্কিট হাউজ আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়। শহরের বিভিন্ন মহল্লা থেকে বিক্ষুব্ধ মানুষ তখনও জড়ো হচ্ছিলের সেখানে।

দুপুর ১২টার দিকে হানাদার বাহিনীর একটি গাড়ি ঈদগাহ’র পাশের রাস্তা অতিক্রম করার সময় জনতা আবারও উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। জনতার দিকে অস্ত্র তাক করে হানাদাররা। নেতৃবৃন্দের হস্তক্ষেপে শান্ত হয় জনতা। ওই সময় হঠাৎ খবর আসে টেলিফোন ভবন দখল করে নিয়েছে হানাদার বাহিনী। চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে উপস্থিত ছাত্র-জনতার মধ্যে, উত্তেজিত ছাত্র-জনতার একটি অংশ ঈদগাহ ময়দান থেকে বেরিয়ে টেলিফোন ভবনের সামনে গিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। এসময় কোন পূর্ব সতর্কিকরণ ছাড়াই টেলিফোন ভবনের ছাদ থেকে জনতার দিকে মেশিনগান দিয়ে গুলি বর্ষন করতে শুরু করে পাক হানাদার বাহিনী। টেলিফোন ভবনের পশ্চিম পাশে (বর্তমান হোটেল হাসান ইন্টারন্যাশনাল) বসবাস করতেন নিঃসন্তান পূর্ণ চন্দ্র কর ও তার স্ত্রী চারুবালা কর। হানাদার বাহিনীর ছোড়া একটি বুলেট ঘরের গোলপাতার ছাউনি ভেদ করে বিদ্ধ হয় চারুবালা করের মাথায়। শহীদ হন তিনি।

হানাদার বাহিনীর নির্বিচার গুলিবর্ষণে আহত হন অনেকে। চারুবালা করের মরদেহ নিয়ে রাখা হয় তৎকালীন যশোর সদর হাসপাতাল মর্গে। মর্গে তালা লাগিয়ে পাক সেনারা অবস্থান নেয় সেখানে। বাইরে হাজার হাজার মানুষ চারুবালা করের মরদেহ নেয়ার অপেক্ষায়। কিন্তু পাক সেনারা মরদেহ দিতে নারাজ। অপেক্ষমান মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গতে শুরু করে। ক্রমেই উত্তেজিত হয়ে উঠতে থাকে অপেক্ষমান মানুষ। মুহুর্তে জনতা মর্গের তালা ভেঙ্গে বাইরে নিয়ে আসেন চারুবালা করের মরদেহ, সূর্য তখন প্রায় অস্তগামী, সৎকারের জন্য শহীদ চারুবালা করের মরদেহ নিয়ে হাজার হাজার মানুষ ছুটছে নীলগঞ্জ মহা শ্মশানের দিকে, শবযাত্রায় পুরুষের সাথে যোগ দেয় বহু নারী। সবার চোখে মুখে প্রতিরোধের প্রতিচ্ছবি। নীলগঞ্জ মহাশ্মশানে সমাধিস্ত করা হয় শহীদ চারুবালা করের মরদেহ।

চারুবালাসহ লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে ৯ মাস মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন হয় দেশ। শহীদ চারুবালার স্মৃতি ধরে রাখতে টেলিফোন ভবনের সামনের সড়কটির নাম পরিবর্তন করে শহীদ সড়ক নামকরণ করা হয়। স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয় নীলগঞ্জ মহাশ্মশানে শহীদ চারুবালার সমাধির ওপর। স্মৃতিস্তম্ভসহ কিছু জমি এখন প্রগতি বালিকা বিদ্যালয়লসহ আশেপাশের মানুষের দখলে। অর্থাৎ ৭১’এর প্রথম শহীদ চারুবালা করে স্মৃতিস্তম্ভ বেদখল হয়ে গেছে। ভেঙ্গে গেছে স্তম্ভের কিছু অংশ। স্মৃতিস্তম্ভে লেখা চারুবালার নামটিও তুলে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে। জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড, শ্মশান কমিটিসহ যশোরের সচেতন নাগরিকরা শহীদ চারুবালার স্মৃতি স্তম্ভটি দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছে বহু বছর ধরে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেয়া হয়েছে কিন্তু দখলমুক্ত হয়নি শহীদ চারুবালার সমাধিস্থল।

আমরা যশোরবাসী চাই, চারুবালা কর-এর নামে একটি সড়কের নাম করা হোক। অথবা শহীদ সড়কের নাম চারুবালা করের নামে হোক। কিংবা শহরের কোন চত্ত্বরের নাম হোক ‘‘চারুবালা কর চত্ত্বর’’।

1 thought on “শহীদ চারুবালা কর-এর নামে একটি সড়কের নাম করা হোক

Leave a Reply

Your email address will not be published.