শামছুর রহমান কেবল ভাইকে গুলি করে হত্যা করে ঘাতকদল

মতামত কলাম ও ফিচার জাতীয় খবর
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফজলুল বারী, বিশিষ্ট সাংবাদিক।।

গোপন চরমপন্থী দল পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির নেতা শিমুল ধরা পড়ার পর পুলিশের কাছে ১৬১ ধারার জবানবন্দীতে বলেছিল, খুলনার যুবলীগ নেতা লিটুর কাছেও তাদের অস্ত্র জমা রাখা আছে। সেই ১৬১ এর কপি হাতে আসার পর বক্তব্য নেবার জন্যে লিটুকে আমি ফোন করেছিলাম। লিটু তখন আমতা আমতা করে বলেন এসব ঠিক নয় বারী ভাই। এখন থেকে আপনি যেভাবে বলবেন সেভাবে আমি চলবো। এই লিটু কে, কিভাবে ছিলেন তা সবাই জানতেন। তাকে আমি বললাম, এটা কি বলেন আপনি, আমার কথামতো চলবেন। আমিতো একজন সাধারন ছাপোষা সাংবাদিক মাত্র।

এরপর একটা ঘটনা ঘটলো। খুলনায় থাকতেন জনকন্ঠ সাংবাদিকের এক বোন। লিটু তাকে তার বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেলো। এরপর তাকে দিয়ে ফোন করালো জনকন্ঠ সম্পাদককে। তিনি তার ভাই সম্পাদককে ফোনে বলেন, লিটু সাহেব আমাদের দেখে রাখেন। তার বিরুদ্ধে যাতে কোন রিপোর্ট ছাপা না হয়।

এরপর রাতের বেলা জনকন্ঠ সম্পাদক আমাকে আমার বাসায় ফোন করেন। আমাকে তিনি বলেন, রিপোর্ট যদি ছাপা হয় তাহলে লিটু আমাদের কি ক্ষতি করতে পারে? আমি তাকে বলি, লিটুর এলাকায় জনকন্ঠের খুলনা অফিস। সে চাইলে কিন্তু আমাদের খুলনা অফিস উড়িয়ে দিতে পারে।

এ কথাটি যেন জনকন্ঠে মুক্তিযোদ্ধা সম্পাদকের ব্যক্তিত্বে আঘাত করে! আমাকে তিনি বলেন, লিটু এত বড় গুন্ডা? তোমার রিপোর্ট যাবে। এটাই ফাইনাল। জনকন্ঠে ছাপা হতে থাকে আমার ‘আতংকিত খুলনা’ নামের সাড়া জাগানো সিরিজ। খুলনার লিটুগং এর বিরুদ্ধে এ ধরনের রিপোর্ট এই প্রথম ছাপা হচ্ছিল।

এর প্রতিক্রিয়া এগোতে থাকে। হিরকের নেতৃত্বে একটি ঘাতকদলকে ঢাকায় পাঠায় লিটু। তাদের দুটি কাজ দেয়া হয়। এক, আমাকে মেরে ফেলে অথবা টাকায় ম্যানেজ করে সিরিজ ছাপা বন্ধ করতে হবে।

আমি জনকন্ঠ অফিসের সামনের গলিতে আমি থাকতাম। যুবলীগের লিয়াকতের গলি নামে গলিটি পরিচিত ছিল। বলা হতো ইস্কাটন এলাকায় কোন খুনোখুনি করতে লিয়াকতের অনুমতি লাগতো। হিরকের নেতৃত্বাধীন কিলার দলটি অনুমতির জন্যে লিয়াকতের কাছে যায়। লিয়াকত তাদের সতর্ক করে বলেন ইস্কাটন আমার এলাকা। জনকন্ঠ আমার পত্রিকা। এখানে কোন খুনোখুনি করা চলবেনা। লিয়াকত এ খবরটি আমার কাছে পাঠান।

এরপর কিলার দলটি টাকায় জনকন্ঠের একজনকে ম্যানেজ করে ফেলে। তিনি আমাকে ডেকে বলেন, এ রিপোর্ট আর যাবেনা। অফিস এটা চায় না। আমি তখন কথা বলি যশোরে জনকন্ঠের বিশেষ প্রতিনিধি শামছুর রহমান কেবল ভাইর সঙ্গে। এসব রিপোর্টে তিনিই ছিলেন আমার মেন্টর। তাঁর পরামর্শ গাইডেন্সে আমি দেশের দক্ষিন পশ্চিমাঞ্চলের এসব রিপোর্ট করছিলাম। তিনি কথা বলেন জনকন্ঠ অফিসে। অফিসকে বলেন এখন এ রিপোর্ট বন্ধ হলে জনকন্ঠের সর্বনাশ হয়ে যাবে। লোকজন মনে করবে, জনকন্ঠ ম্যানেজ হয়ে গেছে। অফিস থেকে আমাকে আশ্বস্ত করে বলা হয়, রিপোর্ট যাবে।

সেদিন যশোরে অনেক বৃষ্টি হচ্ছিল। শামছুর রহমান কেবল ভাই আমাকে ফোন করে বলেন সর্বনাশ হয়ে গেছে ভাই। ‘ওরা’ জেনে গেছে জনকন্ঠ অফিসের অমুক রিপোর্টটি বন্ধ করেছিল। আর আমি রিপোর্টটি আবার চালু করেছি।’

সেই দিনটি ছিল ১৬ জুলাই। সে রাতে জনকন্ঠের যশোর অফিসে ঢুকে শামছুর রহমান কেবল ভাইকে গুলি করে হত্যা করে ঘাতকদল। এরপর জনকন্ঠ আমাকে তাঁর জানাজায়ও যেতে দেয়নি। আমি যতদিন দেশে ছিলাম, রাতের বেলা বাসায় যেতে অফিস থেকে একজনকে আমার সঙ্গে দেয়া হতো।

২০০০ সালে শামছুর রহমান কেবল হত্যাকান্ডের সময় আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল। তখন চার্জশীটভূক্ত গ্রেফতারকৃতদের ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এসে ছেড়ে দেয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে গত ১২ বছর ধরে লাগাতার ক্ষমতায় থাকলেও সেই হত্যাকান্ডের বিচার শেষের উদ্যোগ নেয়নি। চেষ্টাও নেই। শামছুর রহমান কেবলের স্ত্রী-সন্তানেরা এই বিচারের আশা হারিয়ে ফেলেছেন। জনকন্ঠ সম্পাদক আতিক উল্লাহ খান মাসুদও এই বিচার দেখে যেতে পারলেননা।