শেখ হাসিনার উপলব্ধি ও জীবনের অভিমুখ

জাতীয় খবর
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

একমুঠো ত্রাণ দিয়ে এ সমাজে আত্মপ্রচারে অনেকেই মরিয়া। ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে ছবি তুলে তারা আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তোলেন। এমনকি  কেউ কেউ ত্রাণের চেয়ে প্রচার-প্রসারে বেশি মগ্ন হন। অথচ যাকে বা যাদের ত্রাণ দেয়া হচ্ছে, তাদেরও আত্মসম্মান রয়েছে, তা কখনও স্বীয় বিবেকে নাড়া দেয় না। ওই ত্রাণে রয়েছে নিরন্নদের অধিকার, তাও বিবেচনায় আসে না। আজ থেকে ৩২ বছর আগে আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নেতা থাকাকালীন এ বিষয়গুলো উপলব্ধি করেছিলেন। সে সময়ে তাঁর লেখা একটি চিঠিতেও বিষয়টি উঠে আসে। 

বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অন্যতম কবি নির্মলেন্দু গুণ এর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সহপাঠি ছিলেন। ১৯৮৮ সালে কবি নির্মলেন্দু গুণ একটি জাতীয় দৈনিকে কাজ করতেন। ঐবছরে দেশজুড়ে বন্যাজনিত দুর্যোগ চলছিলো। এইসময়ে তাঁকে লেখা শেখ হাসিনার একটি অসাধারণ চিঠি হুবহু তুলে ধরা হলো। এ চিঠিতেই উঠে এসেছে শেখ হাসিনার মানবিক মূল্যবোধ ও জীবনদর্শন। চিঠিতে প্রকাশ পেয়েছে জীবন চলার অভিমুখ।
……………………………….

“বন্ধুবরেষু গুণ, 
আপনার অনুরোধে কিছু ছবি পাঠালাম। তবে আমার একটা অনুরোধ রাখবেন। ‘ত্রাণ বিতরণ করছি’ এ ধরনের কোনো ছবি ছাপাবেন না। মানুষের দুর্দশার ছবি যত পারেন ছাপান। আমার ধারণা এ ধরনের অর্থাৎ ত্রাণ বিতরণের ছবি টেলিভিশন ও খবরের কাগজে দেখে দেখে মানুষ বীতশ্রদ্ধ হয়ে গেছে। 
ওরা গরিব, কিন্তু সেটা কি ওদের অপরাধ? একশ্রেণি যদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ না করত তাহলে এরা কি গরিব হতো? কার ধন কাকে বিলাচ্ছে? যা কিছু আছে সকলে মিলে ভাগ করে ভোগ করলে একের কাছে অপরের হাত পাতার প্রয়োজন হতো না।
ওদেরই সম্পদ লুট করে সম্পদশালী হয়ে আবার ওদেরই দুর্দশার সুযোগ নিয়ে সাহায্য দানের নামে হাতে তুলে দিয়ে ছবি ছাপিয়ে ব্যক্তিগত ইমেজ অথবা প্রতিষ্ঠা লাভের প্রয়াস আমি মানসিকভাবে কিছুতেই মেনে নিতে পারি না। আমার বিবেকে বাধে। তবুও অনেক সময় পারিপার্শ্বিক চাপে পড়ে অনেক কিছুই করতে হয়। আমিও করি। বিবেকের টুঁটি চেপে ধরে অনেক সময় সমাজ রক্ষার তাগিদে, সঙ্গীদের অনুরোধ বা অপরের মান রক্ষার জন্য এ ধরনের কাজ বা ছবি তুলতে হয় বৈকি। তবে যে যাই দান করুক না কেন, বিলি করুক না কেন, এটা তো ওই গরিব মানুষগুলোর অধিকার, তাদেরই প্রাপ্য।
ক্ষমতার দাপটে কেড়ে নেওয়া ওদেরই সম্পদ অথবা ওদের পেটের ক্ষুধা দেখিয়ে দেশ-বিদেশ থেকে ভিক্ষে এনে এদের দান করা। এখানে ‘ক্রেডিট’ নেওয়ার সুযোগ কোথায়? এই ‘ক্রেডিট’ নিতে যাওয়াটা কি দুর্বলতা নয়? আত্মপ্রবঞ্চনা নয়? কতকাল আর বিবেককে ফাঁকি দিবে? এই গরিব মানুষগুলোর মুখের গ্রাস কেড়ে খেয়ে আবার এদেরই হাতে ভিক্ষে তুলে দিয়ে ছবি ছাপিয়ে ইমেজ তৈরির পদ্ধতি আমি পছন্দ করি না।

আমি মনে করি, যা দান করব তা নীরবে করব, গোপনে করব। কারণ এটা লজ্জার ব্যাপার, গর্ব করার ব্যাপার মোটেই নয়। গর্ব করার মতো কাজ হতো যদি এই সমাজটাকে ভেঙে নতুন সমাজ গড়া যেত। গর্ব করার মতো হতো যদি একখানা কাঙালের হাতও সাহায্যের জন্য বাড়িয়ে না দিত। ফুটপাথে কঙ্কালসার দেহ নিয়ে ভিক্ষের হাত না বাড়াতে সেটাই গর্ব করার মতো হতো। 
যে স্বপ্ন আমার বাবা দেখেছিলেন, সেদিন কবে আসবে? আমার অনুরোধ আপনার কাছে, সেই ছবি ছাপাবেন না যে ছবি হাত বাড়িয়েছে সাহায্য চেয়ে, আর সেই হাতে কিছু তুলে দিচ্ছি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে। অনেকেই তুলে থাকেন। আমার বড় অপরাধী মনে হয় নিজেকে। লজ্জা হয় গরিব মানুষদের কাছে মুখ দেখাতে। আমরা সমাজে বাস করি। দুবেলা পেট পুরে খেতে পারি। ভালোভাবে বাঁচতে পারি। কিন্তু ওরা কি পাচ্ছে? ওদের নিয়ে এ ধরনের উপহাস করা কেন? ওরা বরদাশত করবে না, একদিন জেগে উঠবেই সেদিন কেউ রেহাই পাবে না। আমার অনুরোধ আশা করি রাখবেন।
শুভেচ্ছান্তে
শেখ হাসিনা
৯.১০.৮৮’”
তথ্য সহায়তাঃ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী রেজিস্ট্রার ও ৭১’ এর চেতনা কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি বাহাউদ্দিন গোলাপ Bahauddin Golap এর ওয়াল থেকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.