“সাংবাদিকতার নামে ফটকাবাজি”

“সাংবাদিকতার নামে ফটকাবাজি”

গণমাধ্যম কলাম ও ফিচার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

“সাংবাদিকতার নামে ফটকাবাজি”

আনিসুর রহমান:  ঘটনাটা অনেকটা গল্পের মতই। ইতিহাসের শেষ কোথায় তার সম্পর্কে গবেষণা নির্ভর অগ্রিম ধারণা দেয়া সম্ভব। যেমন ১৯৭১এ আমরা ধ্বংসযজ্ঞের স্তূপের মুখে দাঁড়িয়ে জেনে গিয়েছিলাম, ধরে নিয়েছিলাম বাঙালি জিতবেই। তেমনি বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী কারাগারে তার জন্যে কবর খোড়ার আয়োজনেও ঘাবড়ে যাননি, ভড়কে যাননি। তিনি তার আত্মবিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হননি। তার আত্মবিশ্বাস ছিল পশ্চিম পাকিস্তানী দখলদার, হানাদার গোষ্ঠী বাঙালির উপর যে অত্যাচার জুলুম, খুনখারাপি আর ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে তার একটা শেষ আছেই। যেমন শেষ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নাৎসি বাহিনীর। শেষ আছে শয়তান শক্তি ইসলামির স্ট্যাট বা আইএস বাহিনীর। তেমনটা আল কায়দা বা তালেবান দানবদের, আগে বা পরে।

বিষয়টা যখন গল্প, তার কিন্তু শেষ নাই। তা শেষ হয়েও হবে না শেষ। আর সেই গল্প যদি শয়তানি শক্তির হয়, তার প্রেতাত্মা তো থেকে যাবেই। সেরকম প্রেতাত্মা হচ্ছে বাংলাদেশের বাস্তবতায় ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী এবং ১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পক্ষের দানবীয় কণ্ঠস্বরগুলো। এসব কণ্ঠস্বর, এসব প্রেতাত্মা নানা বেশে আর ছদ্মবেশে দেশে এবং বিদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং লেখালেখি বা সাংবাদিকতার নামে নানা উদ্দেশ্যমূলক প্রচার প্রকাশ আর শত শত ডলারের নানা ষড়য়ন্ত্রতত্ত্ব এবং ষড়যন্ত্র প্রকল্পের মহড়া এবং ক্ষেত্রবিশেষে বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। এ বিষয়ে বিশদ বলার আগে গল্পগুলো বলে নিই।

গল্প এক: প্রায় ২৫ লাখ লোকের একটি দেশ। দীর্ঘদিন অটোমান সাম্রাজ্য থেকে হাতবদল হয়ে ব্রিটিশদের উপনিবেশ থেকে মুক্ত হয়ে রাজতন্ত্রের হুকুমাতে ১৯৭১ সালে দেশটি স্বাধীন হয়। নির্বাচন, গণতন্ত্র, নাগরিক মূল্যবোধের বিষয়গুলোর বালাই থাকার কোন ফুরসৎ দেশটির ভূভাগে নাই। দেশটি তেল বিক্রির টাকায় একেবারে চকচকে। বাবার পরে পোলায় বা রাজার পরে রাজপুত্র এরকম পৌত্রিক সম্পত্তির মতই দেশটির শাসনক্ষমতা। ইংরেজিতে একটি শব্দ আছে ‘Oxymoron’ যার বাংলা করলে দাঁড়ায় আপাত স্ববিরোধী হয়ে বাস্তবে বিদ্যমান। এরকম শব্দের উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সাধু শয়তান, ভদ্র মাস্তান, ন¤্র জুলুমবাজ, ঘোমটাপড়া ছায়াছন্দ, ফটকাবাজি সাংবাদিকতা।

সে যাকগে অই দেশে আদতে গণতন্ত্রের ছিটাফোটা না থাকলেও দেশের রাজদরবার এক ফরমানে ১৯৯০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে আন্তর্জাতিক একটি টেলিভিশন চালু করে আরবী ভাষায়। এর এক দশক পরে এর ইংরেজি বিভাগ চালু হয়। ইরাক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিবিসি সিএনএন এর খবর যখন একপেশে মনে হতে শুরু করে, তখন ঐ চ্যানেলের খবর অনেকটা ভারসাম্য মনে হতে থাকে। আর এই সুযোগকে কাজে লাগেিয় এই চ্যানেলটি বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে নানা ফটকাবাজি সাংবাদিকতা শুরু করে। যে কারণে মিশরসহ বেশ কয়েকটি দেশে চ্যানেলটি নিষিদ্ধ করা হয়। আপনারা ইতিমধ্যে সম্ভবত ধারণা পেয়ে গেছেন আমি কোন দেশ এবং কোন চ্যানেল নিয়ে কথা বলছি।

দেশের নাম কাতার। চ্যানেলের নাম আল জাজিরা। ঙীুসড়ৎড়হ এর উদাহরণ হিসেবে ‘ফটকাবাজি’ সাংবাদিকতা শব্দটি উল্লেখ করেছি। ঙীুসড়ৎড়হ এর মানে দুটো বিপরীত ধর্মীয় বিশেষণ এবং বিশেষ্য পদ মিলে শব্দপদবাচ্য তৈরি করা যেমন ‘ফটকাবাজ’ বা ‘ফটকাবাজি’ শব্দের সঙ্গে সাংবাদিকতা জুড়ে দিলে যা দাঁড়ায় তাতে ফটকাবাজ একটু জাতে উঠে। আবার সাংবাদিক হলে পুরোটাই ফটকাবাজির তলে চাপা পড়ে। এখন আল জাজিরা চ্যানেলটির হয়েছে এমন দশা।
এই চ্যানেলটি ইতোমধ্যে আল কায়দা, তালেবান, ওসামা বিন লাদেন, মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড, বাংলাদেশের জামাত-শিবির-হেফাজত, বঙ্গবন্ধুর খুনির প্রেতাত্মাচক্র এবং যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষের ফটকাগোষ্ঠীর স্বার্থ উদ্ধার করতে গিয়ে প্রকাশ্য ফটকাবাজি সাংবাদিকতা শুরু করেছে। সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য বিরাগের বশবর্তী না হয়ে ন্যায় ও মানবকল্যাণের স্বার্থে সত্যের প্রকাশ। এখানে অর্ধসত্য, গোঁজামিল বা ফটকাবাজির কোন সুযোগ নাই। কিন্তু আল জাজিরা চ্যানেলটি তাই করেছে।

সর্বশেষ আল জাজিরা সাংবাদিকতা বা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বা প্রামাণ্যচিত্রের নামে বাংলাদেশকে জড়িয়ে ফটকাবাজ নাটক দেখালো। তা ১৯৭৪ সালে বাসন্তীকে আয়োজন করে জাল পরিয়ে ছবি উঠানোকেও হার মানায়। অথচ বাসন্তীকে জাল পড়িয়ে যেসব প্রযোজক কুশীলব দুনিয়ার মানুষের কাছে বাংলাদেশকে হেয় করেছে; দেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে বিব্রত করেছে, সেই বাসন্তীর খোঁজ কুশীলবরা নেয়নি। বাসন্তীর জন্যে মৌলিক মানবিক সাহায্য এবং জবীনমান রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা। তার প্রায় পাঁচ দশক পরে এসে শয়তানি প্রেতাতœা ভর করেছে আল জাজিরার উপর। নিশানা এবার বাংলাদেশ এবং শেখ হাসিনা। এই নব বাসন্তী সিরিজের ধারাবাহিক এখন আল জাজিরার বাংলাদেশ বিষয়ক খবরাখবর।

এরকম একটি খবরে ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার ম্যান’ এর পেছনের কারিগরদের সম্পর্কে একটু বলে নিতে চাই। এদের কারো নাম আমি উল্লেখ করতে চাই না। কেননা মহল্লার ফটকাবাজের নাম মহল্লার আমআদমিরা বার বার নিতে নিতে ফটকাবাজের বড়ই বাড় বাড়ে। শেষে সে কি না মহল্লার মাথায় চড়ে বসে। আমি বরং এভাবেই বলতে চাই ।

কুশীলব নম্বর এক: ইনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের পক্ষে ভূমিকার কারণে আদালত কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। সাংবাদিকতার নামে নানা সময়ে ফঠকাবাজি করতে গিয়ে বিরাগভাজন হয়েছেন। ঢাকার ডেইলি স্টার, নফহবংি২৪.পড়স এবং নিউ এজসহ কয়েকটি কাগজে চাকরি করলেও পেশাদারিত্ব প্রমাণ করতে পারেননি। আদতে সাংবাদিকতার আড়ালে বাংলাদেশ বিরোধী কর্মকাপ-ের একজন ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে তৎপরতা চালিয়েছেন। বৈবাহিক সূত্রে একজন ব্যারিস্টারের গৃহপালিত স্বামী এবং একজন সংবিধান প্রণেতার মেয়ের জামাই হবার সুবাদে তাদের পারিবারিক যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে বাড়তি মনোযোগ এবং অনুকম্পা পেয়েছেন, পাবার চেষ্টা করেছেন। তবে আগাগোড়া তার ভূমিকা দেশের মানুষের বিরক্তির কারণ হয়েছে। তার বড় কারণ দেশ বিরোধীচক্রের ফরমায়েশখাটা ব্লগবাজ। তিনি জন্মসূত্রে ব্রিটিশ নাগরিক। আদতে ইহুদি, কিন্তু গাঁটছাড়া বেঁধেছেন ইসলামি জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর স্বার্থের সঙ্গে।

কুশীলব নম্বর দুই: ইনি বড় রকমের আঁতেল। একবার সাংবাদিকতার নামে অপেশাদার কার্যক্রমের সূত্রে একটি সংস্থা তাকে পাকড়াও করেছিল।

তার কপালে কিছু থেরাপি জুটেছিল। দেশে বিদেশে কিছু সহানুভূতি মিলেছিল। এক সময় স্বল্প সময়ের জন্যে আমার সহকর্মী ছিল। কিন্তু কি থেকে কি হয়ে গেল ইনি একে একে বেলাইনে যেতে থাকলেন। দেশান্তরি হলেন। ভালই ছিলেন। কার পাল্লায় পড়লেন – খোদ রবার্ট ক্লাইভের দেশের কুশীলব নম্বর এক এর খাস সাগরেদ হয়ে গেলেন। আমেরিকার টাকায় ইউরোপের একটি দেশে বসে বাংলা ভাষায় পত্রিকার নাম করে আদতে একটি ব্লগ চালান। যার কাজই হল বেছে বেছে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক আঁতলামি ছাপানো। এটাকেও কি সাংবাদিকতা বলতে হবে? ভাবখানা এরকম ইনারা যেন সাংবাদিকতার পয়গম্বর হিসেবে আবির্ভুত হয়েছেন।

কুশীলব নম্বর তিন: ইনি এক সময় বনানীর হাওয়া ভবনে ফুট ফরমায়েশ খেটেছেন, গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের সঙ্গে ব্যবসা করেছেন, বিএনপি নেতা, সাজাপ্রাপ্ত অপরাধী তারেক রহমানের ঘেঁটুকর্মী; ইউরোপে বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, হাঙ্গেরিতে বসবস করেন।
এই তিন মহারথী কুশীলব মিলে বাংলাদেশকে নিশানা করে এমন এক জিনিস বানাইছে তা যেমন নাটক হিসেবে ‘টিকটক’ মানের আর সাংবাদিকতা হিসাবে ফটকামানের। ‘অল দ্য প্রাইম মিনিস্টার ম্যান’ শিরোনামের এই জিনিসে নানা অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়েছে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে অথচ এদের কারো পক্ষেই কোন বক্তব্য বা সূত্র উল্লেখ করা হয়নি। জিনিসটা কি ফটোশপ না এ্যানিমেশন প্রযোজনা তাও পরিস্কার করা হয়নি। নানা অসামর্থিত সূত্রে প্রশ্ন উঠেছে, এহেন আনাড়ি ফটকাবাজি প্রযোজনার পেছনে কাড়ি কাড়ি টাকা কে ঢালতেছে?
আল জাজিরা?
বঙ্গবন্ধুর খুনিচক্র?
বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা?
তারেক রহমান?
১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজাকারচক্র?
না অন্য কেউ?

এই প্রশ্নের উত্তর দেশ ও দশের স্বার্থে খোলাসা হওয়া দরকার। এই কাজটি করতে হবে খোদ বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষকেই। এরকম একটি দেশবিরোধী ফটকাবাজির বিরুদ্ধে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ যথাযথ প্রতিক্রিয়া এবং প্রতিবাদ বা আইনগত ব্যবস্থা নিবে এটা স্বাভাবিক। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় থেকে সুনির্দিষ্টভাবে আল জাজিবার এই ফটকাবাজিকে প্রত্যাখান করার পরে সেনা এবং পুলিশের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ প্রকাশের দরকার কেন পড়ল? সরকারের উপর কয়টা মাথা? আরো একটি প্রশ্ন। আল জাজিরার অপেশাদার ভূমিকার বিরুদ্ধে সরকারের পক্ষে সংগত এবং প্রাসঙ্গিক অঙ্গ হিসেবে তথ্য মন্ত্রণালয়কে কাজে লাগানো হল না কেন? এরকম অসঙ্গতি বিভ্রান্তি বাড়ায়। সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি উপলব্ধি করলে সবকিছু ভালো দেখায়।

লেখাটি শেষ করবার আগে একটি কথা বলে নিতে চাই, দেশে বা বিদেশে বাংলাদেশ বিরোধী ফটকাবাজি সাংবাদিকতা প্রতিরোধ করতে হলে ডিজিটাল নিরাপত্তার নামে সাংবাদিকতাকে ঘিরে আইনের অসংগতিমূলক ধারাগুলো বাতিল বা সংস্কার করে সাংবাদিকতাকে সুষ্ঠু নীতিমালার মধ্যে নিয়ে আসা দরকার। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পর্যালোচনা করলে দেশ ও দশের যেমন লাভ হবে, তেমনি সরকারেরও। সূত্র-খবর ডটকম।