সাংবাদিকতা মানে বস্তুনিষ্ঠতা, বাস্তবধর্মিতা, ব্যক্তিনিরপেক্ষতা

সাংবাদিকতা মানে বস্তুনিষ্ঠতা, বাস্তবধর্মিতা, ব্যক্তিনিরপেক্ষতা

কলাম ও ফিচার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সাংবাদিকতা মানে বস্তুনিষ্ঠতা, বাস্তবধর্মিতা, ব্যক্তিনিরপেক্ষতা। কিন্তু সত্য ও মিথ্যার মিশ্রণে নিরপেক্ষতার গায়ে হলুদ নয়। যা সত্য, যা কঠিন, যা মানুষের জানা দরকার; তা বস্তুনিষ্ঠভাবে তীর্যকভাবে তুলে ধরা— যে কোনো মূল্যে।

“থামো, শান্ত হও, জেনে-বুঝে খবর ছড়াও”— ঢাকার পাঠকপ্রিয় অনলাইন পত্রিকা সারাবাংলা.নেট প্রতিষ্ঠার তৃতীয় বার্ষিকীতে স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট আসাদ জামানের শুভেচ্ছা বয়ানের শিরোনামেই সত্য ও একনিষ্ঠতার স্বরূপ উন্মোচিত হয়েছে। সংবাদ সারমর্মই বলে দিচ্ছে, নিউজ পোর্টালটি “সবার আগে সব খবর” চাণক্যে বাহবা কুড়াতে পাঠকের হাতের তালুতে বসতে চায় না। আসন গাড়তে চায় পাঠকের আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গাটিতে। সম্পাদকীয় নীতিতে সত্যের সঙ্গে নিষ্ঠার সন্ধিই প্রতিফলিত হয়েছে।

প্রসঙ্গত প্রাচীন সওগাদ পত্রিকার সম্পাদক প্রখ্যাত সাংবাদিক নাসির উদ্দিনের স্মৃতিচারণ না করলেই নয়। তিনি গ্রামের বাড়িতে পথ চলতে অনেক লোকের জটলা দেখে কৌতূহলী মনে ভিড় ঠেলে ভিতরে ঢুকে মাটিতে পড়ে থাকা এক লোকের বীভৎস দৃশ্য দেখে হতভম্ব হয়ে পড়েন। জানতে পারেন, দোহাই-দোস্তর, নিষেধ-বাধা ও বহু বিচার-আচার করার পরও চুরি না ছাড়ায় সংক্ষুব্ধ জনতার গণপিটুনিতে মারা যায়। এ কথা শোনার পর মৃত চোরকে কদমবুসি করায় সমালোচনার ঝড় কেবল নয়, ধিক্কার উঠলে তিনি বলেন, আমি তার কর্মনিষ্ঠাকে সম্মান ও অভিবাদন জানিয়েছি, অবশ্যই ব্যক্তি চোর সত্তাকে নয়।

এক্ষেত্রে সারাবাংলা.নেটের সম্পাদকীয় নীতির সত্যের সাথে নিষ্ঠার সন্ধিই প্রতিষ্ঠিত করে না অন্যদিকে মত-দ্বিমত, সংবাদ সম্প্রসারণ, মুক্তমত ও সাক্ষাৎকার বিভাগ সত্যিই অনন্য এবং আর্ট অব ব্লিঙ্কিং— পরিচর্যায় ন্যায় ও বস্তুনিষ্ঠ সাহসী পথচলার সারথি।

বিভাগগুলোতে মা মাটি ও মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা ও ভক্তির উন্মুখে আলোচনা-সমালোচনায় গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সম্যক দৃশ্যপট উন্মোচনের প্রয়াস পরিলক্ষিত হয়। একজন স্টেটসম্যান যেমন জাতীয় দুর্দিনে জাতিকে দিশা ও সঠিক পরামর্শ দেন এবং জাতি তা নিঃসঙ্কোচে পালন করে, তেমনি সারাবাংলা.নেট-এর আহ্বান বা পরামর্শ জাতি তা আস্থায় নিয়ে বুঝিবা ঠিক সেভাবেই গ্রহণ করছে এবং করবেও। সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী, সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী এবং ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে পরিমিত অথচ চৌকস ভাষায় ক্ষয়িষ্ণু সমাজ ও রাষ্ট্রের অনিয়ম-অসঙ্গতির বিষয়গুলো কর্মনিষ্ঠা ও বিচক্ষণতার সাথে তুলে ধরার মেধাবী বিশ্লেষণই অনলাইন পত্রিকাটির শক্তির উৎস বলে প্রতীয়মান হয়।

সাংবাদিকতা কখনই আর দশটি পেশার মতো নয়। এর দায়িত্ব ও চরিত্র খুবই প্রকাশ্য, স্পষ্ট। পাঠকদের তথ্য বিভ্রান্তিতে ফেলা নয় কিংবা মরা সাপ পেটানোও নয়। অন্যদিকে দূর আকাশের মাহাত্ম্যে ভূপৃষ্টে না আসা আলোর স্বপ্নিল তারকার ফেরিওয়ালাও নয়, নাগালের প্রাণচঞ্চল জোনাকির সম্মিলিত আলোয় আলোকিত হোক মিডিয়া জগৎ তথা একবিংশ শতাব্দী তথ্যের শতাব্দী।

জ্ঞানই শক্তি-র পরিবর্তে তথ্যই শক্তি— এই সত্য আজ বিশ্বস্বীকৃত। বর্তমান বিশ্ব ইন্টারনেট তথ্যবিপ্লবের চারণভূমিতে প্রবেশ করায়— পরিণত হয়েছে গ্লোবাল ভিলেজে। ফলে গৃহবাসী মানুষকে প্রতিদিন নিয়ে যায় বিশ্বসভার উন্মুক্ত মাঠে। এতে দূরকে করেছে কাছে, পরকে করেছে আপন। গ্রামের নিরক্ষর মানুষও হয়ে উঠছে তথ্য সচেতন, যা নতুন করে ভাবতে শেখাচ্ছে। জনগণ যা ভাবে সরকার কি তাই করে? কিংবা সরকার যা করে জনগণ কি তাতে সন্তুষ্ট? সরকার ও জনগণের এই ভাবনার সেতুবন্ধন হলো গণমাধ্যম। দেশ-বিদেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক বিষয়ে ধারণা দেওয়া তথা তথ্য অবহিত করার সাথে সাথে গণমাধ্যম দিয়ে থাকে দিক নির্দেশনা। জাতীয় থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেতা ও নেতৃবৃন্দের ভুল সিদ্ধান্ত এবং কর্মকাণ্ড চিহ্নিত করে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে এর প্রতিক্রিয়া, সুদূরপ্রসারী প্রভাব উপস্থাপনা করে। পেশার দায়িত্বশীলতায় জাদুর এই চেরাগবাতি স্বভাবতই সারাবাংলা.নেটেরও হাতে।

যে কোনো দেশের শীর্ষপদে যারা আছেন— রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ, বিচারপতি প্রমুখ— তাদের দায়িত্বভার গ্রহণের প্রাক্কালে যথারীতি শপথ বাক্য পাঠ করেন। কিন্তু কেউ যখন সাংবাদিকতা পেশা গ্রহণ করেন, তখন আনুষ্ঠানিক শপথ বাক্য পাঠ করেন না, যদিও— তথাপি নিজের বিবেকের কাছেই মনে মনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন যে— তিনি অবিকৃত, সত্য ঘটনা ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশন করবেন। কেননা, লিখিত বিবরণের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা চিরকালের। প্রতিদিন প্রকাশিত খবরের বস্তুনিষ্ঠতার বিষয়ে জবাবদিহিতা করতে হয় লাখো পাঠকের কাঠগড়ায়। গণমাধ্যম যা বলছে তা সঠিক, বস্তুনিষ্ঠ এবং সংবাদটি কোনো অশুভ এজেন্ডা বাস্তবায়নে পরিবেশন করছে না— এমন আস্থা থেকেই পত্রিকা পড়ে থাকেন পাঠকেরা। আস্থার অভাব ঘটলে পাঠকের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে পতন অনিবার্য।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ঢাকার সংবাদপত্রে নতুন বৈচিত্র্য আসে দু’পৃষ্ঠাব্যাপী উপসম্পাদকীয় প্রকাশের ক্ষেত্রে। এই দিকটি আগে এদেশের পত্রিকায় যে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল তা নয়, তবে এর ব্যাপকতা ছিল সীমাবদ্ধ। পূর্বকালীন দৈনিক পত্রিকায় সম্পাদক ও পত্রিকায় কর্মরত দু’একজন সাংবাদিক স্বনামে বা বেনামে (অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেনামে) উপসম্পাদকীয় লিখতেন। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর উপসম্পাদকীয় লেখার পরিধি বিস্তৃত হয় এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উপসম্পাদকীয় কাজে এগিয়ে আসেন প্রাক্তন সাংবাদিক, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিক ও সাধারণ পেশাজীবী মানুষ। উপসম্পাদকীয়ের বিষয় বৈচিত্র্য ও মতবাদের ভিন্নতার কারণে বিভিন্ন পাঠক এই শ্রেণির রচনার প্রতি আকৃষ্ট হন। পত্রিকার সম্পাদক ও লেখকদের মধ্যে মত প্রকাশগত স্বাধীনতার দিকটি স্বীকৃতি লাভ করলেও কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের আদর্শে বিশ্বাসী জনসাধারণ অনেকের উপসম্পাদকীয় নিজেদের রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে মেলাতে না পেরে এক শ্রেণির কলামিস্টের প্রতি বিরাগভাজন হয়ে উঠতে থাকেন। এক্ষেত্রে বিরাগভাজন হয়ে উঠলেও কোনো ক্ষতি বৃদ্ধি হতো না, যদি না তা অন্যের অধিকারের সীমা অতিক্রম করে তার বাক স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করত। একজন লেখক অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কলাম লেখার চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের স্বার্থ বিঘ্নিত হলেই সেই রাজনৈতিক দলের সমর্থকরা কলাম লেখককে আক্রমণ করতে কুণ্ঠিত হন না। কোন কিছুই একশ জন মানুষের সন্তুষ্টি বিধানে সম্ভব নয়। তাছাড়া সমগ্র দেশের মানুষ একাধিক রাজনৈতিক দলের সমর্থক হওয়ায় তাদের মানসিকতাও স্বতন্ত্র।

নিবন্ধে বা প্রবন্ধে কোনো কিছু প্রকাশ করার স্বাধীনতা একজন লেখকের নেই, এই মত গ্রহণযোগ্য নয়। প্রবন্ধের কোনো বক্তব্য ব্যক্তিবিশেষের অপছন্দনীয় হলে তিনি তার প্রতিবাদ করতে পারেন— এটা তার যেমন মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ঠিক একইভাবে একজন লেখকও নিজের মত স্বাধীনভাবে প্রকাশে সক্ষম।

বর্তমানে দৈনিক পত্রিকায় শুধু উপসম্পাদকীয় লেখা নয়, বিভিন্ন বক্তা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিজেদের যে মত প্রকাশ করে থাকেন, সেখানেও বাকস্বাধীনতার বিপক্ষীয় এক শ্রেণির মানুষের উদ্ভব ঘটেছে। তাদের রাজনৈতিক আদর্শের বিরোধী বলে অনেক সময় বিভিন্ন বক্তার বিরুদ্ধে একইভাবে তারা সাবধানবাণী উচ্চারণ করেন, যা কোনো ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বাকস্বাধীনতা স্বাধীন দেশের মানুষের অর্জিত অধিকার। একজন মানুষের স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের যে স্বাধীনতা আছে, তা হরণ করা বা তার ওপর আঘাত করার অর্থ হলো ব্যক্তি স্বাধীনতার পরিধি সঙ্কুচিত করে দেওয়া। একজনের অধিকারের ওপর আঘাত করার অর্থ অন্যকেও প্রতিঘাত সহ্য করা— যার ফলাফল হলো অনিবার্য সংঘাত। নিজের অধিকার সম্পর্কে একজন সচেতন মানুষ কখনও অন্যের অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা গণতন্ত্রের মৌলিক আদর্শ।

তথ্য খুঁজে বের করার দায়িত্ব সাংবাদিকের। যে তথ্যটা সংবাদমাধ্যমে পরিবেশন করে তা থেকে পাঠক প্রকৃত তথ্য পাবে এবং এর ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করবে গোটা পরিস্থিতি— এটাই হলো সংবাদ বা গণমাধ্যমের দায়িত্ব। এ দায়িত্বটা পালন হচ্ছে কি-না সেখানে চলে আসে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়টিও, যা বিশ্বজুড়ে মিডিয়া জগতে নীতিবাক্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়— ‘Facts are Sacred, Commmds are free, News is based on fact, fiction is not news’. অর্থাৎ প্রকৃত সত্য ঘটনা বা অবস্থা পরিবর্তন করা যাবে না, বিদ্বেষের বশবর্তী হওয়াও যাবে না। আর মতামত আসতে পারে এর বিশ্লেষণের সময়। যে কোনো ইস্যু কিংবা অপশক্তির বিরুদ্ধে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা করাও একজন মানবিক বোধসম্পন্ন সাংবাদিকের ওপর অর্পিত পবিত্র দায়িত্ব শুধু নয়, কর্তব্যও। তাই, কর্তব্যের কাছে ভাই— বন্ধু কেউ নেই।

সত্যি বলতে কী, আমারা প্রখ্যাতির পেছনে ছুটছি। সত্যই ব্রত-এর পাশাপাশি “যেখানে দেখিবে ছাই/ উড়াইয়া দেখ তাই/ পাইলেও পাইতে পারো মানিক রতন”— এটি হোক অনলাইন পত্রিকাটির দৃষ্টিভঙ্গি। কেননা, অখ্যাত এক লেখক তার লেখার পাণ্ডুলিপি নিয়ে বই প্রকাশ করতে হেন কোনো প্রকাশনী নেই যার চৌকাঠ মাড়াননি। পাত্তা না পাওয়ায় ওপারের প্রখ্যাত লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা একটি বইয়ের কপি করে নিয়ে গেলে প্রকাশক তা পড়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে এসব বাজে লেখা প্রকাশ করে রাস্তায় বসতে চান না বলে লেখককে আর দেখতে চান না বলে জানান। ওই লেখক আর কেউ নন, এপারের অতি জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ।

“সুজনে সুযশ গায় কুযশ ঢাকিয়া, কুজনে কুরব করে সুরশ নাশিয়া”— গণমাধ্যমে এ ধারা পাল্টে যাক। ভয় আর আপস করা নয়, সাহস করে সত্যি বলাই যে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকের কাজ— কথাটি বুঝাতে পেরেছে সারাবাংলাডটনেট। প্রতিষ্ঠার তৃতীয় বার্ষিকীতে শুভেচ্ছা বার্তায় তারা বলেছে— “থামো, শান্ত হও, জেনে-বুঝে খবর ছড়াও।”

আস্থা ও বিশ্বাসে এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রশ্নে টেন আউট অব টেন বা দশে দশ পাওয়া বুঝি সারাবাংলাডটনেটকেই মানায়। সূত্র-সারাবাংলা

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট
সহযোগী সম্পাদক, আজকের সূর্যোদয়, ঢাকা

খন্দকার মুনীরুজ্জামানের মৃত্যু দেশের সাংবাদিকতার অপূরণীয় ক্ষতি: আইজিপি

2 thoughts on “সাংবাদিকতা মানে বস্তুনিষ্ঠতা, বাস্তবধর্মিতা, ব্যক্তিনিরপেক্ষতা

Comments are closed.