সুপ্রাচীন জনপদ বরানগর ‘সতীদাহ ঘাট’

সুপ্রাচীন জনপদ বরানগর ‘সতীদাহ ঘাট’

কলাম ও ফিচার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
সাজেদ রহমান।।  কলকাতার উত্তরে সুপ্রাচীন জনপদ বরানগর। সমাজ সংস্কার, ধর্ম, সাহিত্য বহু বিষয়ে এই স্থানের মাহাত্ম্য উঠে এসেছে। পশ্চিমে গঙ্গা বয়ে চলেছে। সেই আমলে এই গঙ্গা পথেই গিয়েছিলেন ডাচ ও ইংরেজদের নৌবহর। ২০১৫ সালের জুলাই মাসের শেষে গিয়েছিলাম বরানগরে। সেখানকার মথুরানাথ স্ট্রিটে চোখে পড়বে একটি ঘাট। যার নাম ‘সতীদাহ ঘাট’। এর সাথে জড়িত অতীতের বহু কাহিনি।
একসময় গঙ্গার পাড় ধরে এখানে অনেক বাগান বাড়ি ছিল। আগে এই জায়গাটির বিস্তীর্ণ অংশে বেশ গাছ-গাছড়ায় ঘেরা থাকত। বরানগরের এই গঙ্গার ঘাটেই সেকালের গোঁড়া ব্রাহ্মণেরা হিন্দু বিধবাদের জীবন্ত দাহ করতেন। ঢাক, ঢোল, কাঁসর বাজিয়ে সতীকে দাহ করা হত, যাতে তাঁর আর্তনাদের শব্দ চাপা পড়ে যায়।
দূর থেকে ভেসে আসত সেই বাদ্যের আওয়াজ। তখন মানুষ বুঝতে পারত সতীদাহ হচ্ছে। ধর্মীয় কারণ দেখিয়ে জোর করে শুধু অল্পবয়স্ক বিধবা স্ত্রীদের নয়, বয়স্ক বিধবাদেরও সতী করা হত এই সতীদাহ ঘাটে। মূলত সম্পত্তির লোভ ও বয়স্ক মায়ের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার জন্যই মায়েদেরকেও সতী করা হয়েছিল।
সেই আমলে ক্যাপ্টেন হ্যামিলটন এসব অঞ্চলে ভ্রমণ করতে গিয়ে দেখেছিলেন, ইংরেজরা সাধারণ দেশীয়দের সাথে কঠোর আচরণ করলেও সকলের প্রতি এমনটা ছিলেন না। ক্যাপ্টেনের ভ্রমণ বেত্তান্তে সে কথাই উঠে এসেছে। বিশেষত যেসকল বিধবা স্ত্রীকে সতী করা হত, তাদের প্রতি কিছু ইংরেজের যুক্তিবাদী মন তথা ব্যক্তিত্বের দৃঢ় অবস্থান নজরে এসেছিল। কামারহাটির সমৃদ্ধ পরিবারের এক মানুষ কৃষ্ণদেব মুখোপাধ্যায়ের স্ত্রীকে বরানগরের এই সতীদাহ ঘাটে সহমরণে চিতায় জীবন্ত দাহ করা হয়।
বরানগরে আগের সতীদাহ ঘাটটি গঙ্গার ভাঙনে সম্পূর্ণই ভেঙে যায়। কিছুটা অবশিষ্ট থাকলেও এখন সেখানে রেলিং দেওয়া বাধানো নতুন ঘাট হয়েছে। রাজা রামমোহন রায়ের একটি আবক্ষ মূর্তি ঘাটে বসানো আছে। সেই আমলে রামমোহনের সতীদাহ প্রথা বন্ধের বিরুদ্ধে গোঁড়া হিন্দু সমাজ পার্লামেন্টে গেলেও তাঁর যুক্তিকে টলাতে পারেনি। রাজা রামমোহনের উদ্যোগে এই প্রথা বন্ধ হয়।
বর্তমানে বরানগর পৌরসভার আয়োজনে প্রতিবছর বাইশে মে রামমোহনের জন্মদিবসে এই ঘাটে ছোট্ট একটি অনুষ্ঠান হয়। স্বাধীনতা দিবসের দিনটিতেও এখানে অনুষ্ঠান হয়। সবমিলিয়ে গঙ্গার ধারে শান্ত পরিবেশে অতীতের ঘাটটিকে ফিরে দেখার এটি এক প্রয়াস। সূত্র: সতী এ হিস্ট্রি অ্যানথ্রোলজি – অ্যান্ড্রিয়া মেজর। ভিজিট করুন