স্বাধীনতা মানে হচ্ছে বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা : পলক

জাতীয় খবর
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

‘আমার কাছে স্বাধীনতা মানে কি’ – এই থিমটা যখন আমি শুনেছি তখন আমার ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয়েছে আমি যখন একটি দেশের নাগরিক তখন আমার কাছে স্বাধীনতা মানে হচ্ছে বৈষম্যমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা।
ভারতের হাইকমিশনার বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী খুবই অল্প সময়ের মধ্যে কঠিন সময়ে বাংলাদেশে এসেছেন। এই প্রথম বাংলাদেশে ভারতের কোনো হাই কমিশনার সড়ক পথে বাংলাদেশে এসেছেন। উনার বাংলাদেশে আসার যে সিদ্ধান্ত, যে পদ্ধতিতে উনি উনার কর্মকান্ড সম্পর্কে একটি ধারণা দিয়েছেন, বাংলাদেশের ব্যাপারে কিভাবে কাজ করতে চান এবং আমাদের সবচেয়ে কাছের অকৃত্রিম বন্ধু ভারতের হাই-কমিশনার হিসেবে উনি যে কঠিন করোনাকালীন সময়ে এসে যেভাবে উনার শ্রম, মেধা ও সাহসিকতা দিয়ে আমাদের বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষের সেবার জন্য, সহযোগিতার জন্য ভারতের প্রতিনিধিত্ব করছেন তার জন্য আমি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি আমাদের প্রিয় সুযোগ্য হাই কমিশনার বিক্রম কুমার দোরাইস্বামী কাছে।
কোনো বাধা আমাদের তরুণদেরকে থামিয়ে রাখতে পারে না। তারুণ্যের উদ্যম, স্পৃহাই হচ্ছে আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। বাংলাদেশে এখন ৭০ শতাংশ তরুণ যাদের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। এই তরুণ নেতৃত্বেই বঙ্গবন্ধু আমাদের এই মায়ের ভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষা করেছেন। আজ আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলছি, মনের ভাব প্রকাশ করছি সারা বিশ্বের কাছে। যদি আমাদের বাধ্য করা হতো যে তুমি স্বপ্ন দেখো উর্দুতে, কবিতা লিখো আরবিতে, ব্যবসা- বাণিজ্য করো ইংরেজিতে তবে কেমন লাগতো? কষ্ট হতো না? আমরা কি স্বপ্ন দেখতে পারতাম? আমরা কি সাহস করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারতাম?
আমাদের সেই সময়ে জনগোষ্ঠীর সংখ্যা উর্দু ভাষার থেকে বাংলা ভাষার অনেক বেশি ছিলো। কিন্তু রাষ্ট্রভাষা শুধু উর্দুকে করতে হবে এটা চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত নয়। পাকিস্তান সরকার যখন সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তখন বঙ্গবন্ধু ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিল। গ্রেফতার হলেন, নির্যাতনের স্বীকার হলেন, তারপরও কিন্তু উনি পিছু হাঁটলেন না। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করলেন কারণ বঙ্গবন্ধুর দুরদর্শীতা দিয়ে বুঝেছিলেন এদেশের তরুণ ছাত্র জনতাকে যদি এদেশের বৈষম্যের বিরুদ্ধে, শোষণের বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধ করতে না পারি তবে আমরা দেশের মানুষকে বৈষম্যের ও নির্যাতনের হাত থেকে মুক্ত করতে পারবো না। তাই ধাপে ধাপে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা, ১৯৪৯ আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬২ সালে শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ৬ দফা আন্দোলন, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার আন্দোলন, ২৪ বছরে যে আন্দোলন বঙ্গবন্ধু তাঁর তরুণ বয়স থেকেই শুরু করেছিলেন। তাঁর যে আন্দোলন সংগ্রাম ২৪ বছরের, আমার কাছে মনে হয় একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুধু নয় মাসের একটি যুদ্ধ ছিলো না, এই যুদ্ধ ছিলো বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ২৪ বছরের দীর্ঘ আন্দোলন ও ত্যাগের ফসল এই ৯ মাসের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি।
আর সেই স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের পাশে এসে সবার আগে দাঁড়িয়েছিল আমাদের প্রতিবেশী বন্ধু ভারত। ভারতের সরকার, ভারতের জনগণ সার্বিকভাবে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাশে দাঁড়িয়েছিল। একজন উপকারীর উপকার স্বীকার করা একজন আদর্শ মানুষের কর্তব্য। আর যারা উপকারীর উপকার স্বীকার করে না তাদের বলা হয় অকৃতজ্ঞ। আমরা কি অকৃতজ্ঞ জাতি হতে চাই?
এখনো দেখি সরকারের বিরোধিতা করার নামে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধিতা করার নামে একাত্তরের পরাজিত সেই শক্তিরা ভারতের বিরুদ্ধে অপপ্রচারে লিপ্ত হয়। আমরা যারা ১৯৭৫ সালের পর জন্মগ্রহণ করেছি, আমরা কি পরিমাণ দুর্ভাগা জাতি যে পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর ২১ টি বছর বঙ্গবন্ধুর নাম আমরা কোনো টেলিভিশনে শুনেনি। জয় বাংলা স্লোগান কোথাও দিতে দেওয়া হয়নি। যে জয় বাংলা স্লোগান নিয়ে ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছেন আমাদেরকে স্বাধীনতা দেওয়ার জন্য। যে জয় বাংলা স্লোগান নিয়ে ২ লক্ষ মা-বোন তাঁদের সর্বোচ্চ ত্যাগ করেছেন আমাদের একটি স্বাধীন বাংলাদেশ উপহার দেওয়ার জন্য। সেই স্লোগানকে নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছিল, এটা কি ঠিক? মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাসকে তরুণ প্রজম্নের কাছে আড়াল করে রাখা হয়েছিল, কারণ তারা জানতো যদি তরুণ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে আদর্শিত হয়, জয় বাংলা স্লোগান নিয়ে মাঠে নামে তবে তাদের শোষণ বেশিদিন টিকিয়ে রাখতে পারবে না।
পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ছিলো না, আমরা ২১ বছর সেই অবস্থায় প্রাথমিক, মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করে বড় হয়েছি। আমরা আমাদের দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারিনি কেন? কারণ, যে জাতিকে দেশ প্রেমের শিক্ষা দেওয়া হয় না, যে দেশে জাতির পিতাকে হত্যা করার পর সেই হত্যাকাণ্ডের বিচার না হবার নির্দেশ জারি করা হয় সে দেশের নাগরিক দেশকে ভালোবাসবে কিভাবে? ভালোবাসতে শিখবে কিভাবে? আর সেই দেশ প্রতিবেশী দেশের উপকারের উপকার স্বীকার করবে কিভাবে? এভাবে ষড়যন্ত্র করে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করেছে পাকিস্তানের দোসররা। যারা আমাদের মা-বোনদের পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর কাছে তুলে দিয়েছিল, যে রাজাকাররা আমাদের সন্তানদের হত্যা করেছিল তারাই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে সাথে সাথে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকেও হত্যা করতে চেয়েছিলো।
আজকে আমাদের সৌভাগ্য বঙ্গবন্ধুর কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর ছোট বোন শ্রদ্ধেয় শেখ রেহানা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট দেশের বাইরে ছিলেন। তাই আজকে আবার বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাগ্রত হয়েছে, তাই আজকে আবার ইয়ুথ অপরচুনিটিস এর এই আয়োজনকে সফল করতে ১০৫৪ জন তরুণ-তরুণী দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে স্বাধীনতার মানে তাদের কাছে কি সেটা নিয়ে তারা রচনা লিখেছে এবং এই স্বাধীনতাকে সার্থক করার জন্য বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য আমাদের তরুণ প্রজন্ম এক একজন সোনার মানুষে পরিণত হচ্ছে।
বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন তখনই সার্থক হবে যখন আমাদের দেশের প্রতিটি নাগরিককে আমরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সোনার মানুষে পরিণত করতে পারবো। সেক্ষেত্রে আমাদের গণ মাধ্যম, আজকের এই আয়োজনে যারা পার্টনার, বিশেষ করে আমাদের শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক প্রণব সাহা সহ যারা উপস্থিত আছেন তাদের কাছে অনুরোধ যেন রাজনৈতিক বিরোধের কারণে তারা যেনো দেশের বিরুদ্ধে কোনো অপপ্রচারকে আশ্রয় না দেন।
রাজনৈতিক মতবিরোধ থাকতে পারে, কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে, স্বাধীনতাকে নিয়ে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোনো বিরোধ বাংলাদেশের কোনো নাগরিকের থাকা উচিৎ নয়। আমাদের তরুণ প্রজন্ম তারা এখন ডিজিটাল বাংলাদেশের নাগরিক। তারা গ্লোবাল ভিলেজের এক একজন মেধাবী সৈনিক হিসেবে বাংলাদেশে গড়ে তুলবে।
পাশাপাশি আমি আরও ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি, যে শুধুমাত্র একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধেই নয়, যখন আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছি, বাংলাদেশের রূপকল্প ২০২১ আমরা এই বছর পূরণ করছি ঠিক সেই সময় আমরা একটি বৈশ্বিক মহামারি মোকাবেলাও করছি। যখন আমাদের খুব প্রয়োজন ছিলো আমাদের বন্ধুদের আমাদের পাশে থাকার, ভারত আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে আবারও বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য যেভাবে একাত্তরে ভারত বাংলাদেশের এক কোটি মানুষকে ১ বছর শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় দিয়েছে, নিরাপত্তা দিয়েছে এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে ভারতের ১৮ হাজারেরও বেশি সৈন্য বাংলাদেশের জন্য জীবন দিয়েছে ঠিক একইভাবে এই করোনাকালীন সময়ে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে আমাদের যে মোকাবেলা সেখানেও ভারত আমাদের বন্ধু হিসেবে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুরোধে ৭০ লক্ষ ভ্যাকসিন দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জনাব নরেন্দ্র মোদি। আমাদের দেশে ইতিমধ্যে ১৭ লক্ষ অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন হয়েছে সুরক্ষা প্ল্যাটফর্মে।
আমরা ভিশন ২০২১ পূরণ করতে পেরেছি, প্রযুক্তি নির্ভর মধ্যম আয়ের ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি। এখন ২০৪১ সাল নাগাদ একটি উন্নত জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে ভিশন সেটি পূরণের জন্যও কিন্তু ভারত আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে আমাদের পাশে আছে। ইতিমধ্যে আমরা ৬১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬ টি জায়গায় ভাতর-বাংলাদেশ আইটি ট্রেনিং ইনকিউবিশন সেন্টার প্রতিষ্ঠা করছি। যেখানে প্রায় ৩ হাজার ফ্রন্টিয়ার টেকনোলজি, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব নিয়ে যে টেকনোলজি গুলো কাজ করা হবে সেগুলো নিয়ে ৬ মাসের ট্রেনিং ভারতের বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশের ট্রেইনার একসাথে মিলে দেবে।
২০৪১ সাল নাগাদ যে বাংলাদেশ আমরা তৈরি করতে চাই সেটি হবে একটি অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল বাংলাদেশ। সেখানে কোনো ধর্মীয় ভেদাভেদ থাকবে না, একটি আলোকিত বাংলাদেশ হবে।
যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আমরা অর্জন করেছি জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সেটি কিন্তু ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে যদি আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি প্রগতিশীল মানসিকতা নিয়ে বড় করতে না পারি।
১০-১৫ বছর আগে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া খুবই উন্নত জীবন যাপন করতো। কিন্তু বর্তমানে এই দেশগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কারণ সেই জঙ্গি, সন্ত্রাসী গোষ্ঠী চক্রান্ত করে এই দেশগুলোকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে।
এখন এদেশের তরুণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নেতারা আপনারাই সিদ্ধান্ত নিন বাংলাদেশকে আপনারা এমন ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে চান? যদি না চান, তবে অবশ্যই আমাদের যেমন বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে পাশাপাশি সন্ত্রাসী, জঙ্গি এইসব অপশক্তিকেও আমাদের মোকাবেলা করতে হবে। তবেই আমরা বাংলাদেশকে একটি জ্ঞানভিত্তিক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সেই অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ে তোলতে পারবো। তবেই আমাদের সেই ৩০ লক্ষ শহীদের আত্নার শান্তি পাবে।
সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ।
প্রতিযোগিতায় পুরষ্কার প্রাপ্ত যারা তাদের রচনা নিয়ে একটি সংকলন করে প্রকাশ করার জন্য অনুরোধ করবো, যা দেশের তরুণরা পড়বে। আর সেটি যদি আমাদের সুযোগ দেওয়া হয় তবে আমরা আইসিটি মন্ত্রণালয় থেকে একটি ডিজিটাল বুক বা একটি অ্যাপ তৈরি করে দিতে পারি যাতে লক্ষ লক্ষ তরুণরা আপনাদের লিখাগুলো অনলাইনে পড়তে পারে। আমরা এইভাবে সবাই একসাথে কাজ করবো।
যারা অংশগ্রহণ করেছেন তাদের সকলের জন্য শুভ কামনা রইলো। ‘মুজিববর্ষে আমাদের অঙ্গীকার, প্রযুক্তি এগিয়ে যাওয়ার হাতিয়ার’।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।