হারিয়ে যাচ্ছে কেশবপুরের খেজুর রস

হারিয়ে যাচ্ছে কেশবপুরের ঐতিয্যবাহি খেজুরের রস ও গুড়

জাতীয় খবর
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
হারিয়ে যাচ্ছে কেশবপুরে ঐতিয্যবাহি খেজুরের রস ও গুড়
ভোগতি গ্রামে একজন গাছি রস আহরণ করছেন

শুরু হয়েছে রস ও গুড় সংগ্রহ। ভেজালমুক্ত গুড়ের জন্য গাছিদের প্রশিক্ষণ

কবির হোসেন, কেশবপুর।। শীত মৌসুম আসলেই কেশবপুরে গাছিরা খেজুর রসের সন্ধানে গাছ তুলতে বা গাছ কাঁটতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। আগের মতো খেজুর গাছ এখন আর নেই। ইটভাঁটিতে খেজুর গাছ পোড়ানো ও জলাবদ্ধতায়সহ নানা কারনে খেজুর গাছ দিনে দিনে কমে গেছে। ফলে হারিয়ে যাচ্ছে কেশবপুরে ঐতিয্যবাহি খেজুরের রস ও গুড়।

সে কারণে খেজুরের রস ও গুড় এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। পেশাদার গাছির সংখ্যাও কমে গেছে। তারপরও খেজুর রসের গুড় দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হয় বলে গাছিরা জানিয়েছেন। খেজুর রস সংগ্রহের জন্য এখন কেশবপুরের সর্বত্র গাছিরা প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গাছ কাঁটার কাজ নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

এ বছর মৌশুমের শুরুতে খেজুর রস আহরণ এবং নির্ভেজাল গুড় তৈরী এবং সেটা বাজারজাত করার জন্য শেখ হাসিনা সফটওয়ার টেকনোলজি পার্ক যশোরের কেনাকাটা ডট কম কেশবপুরের সাতবাড়িয়া ও ত্রিমোহিনী ইউনিয়নের ৭০জন খেজুর গাছিদের প্রশিক্ষণ ও খেজুর গাছ থেকে রস আহরণের উপকরণ দিয়েছে। কেনাকাটা ডট কম এই চাষীদের কাছ থেকে সরাসরি খেজুর গুড় কিনে তা বাজারজাত করবে।

কেশবপুর উপজেলার ভালুকঘর, মূলগ্রাম, বেলকাটি, সাগড়দাড়ি, ফতেপুর, চিংড়া, হাসানপুর, ধর্মপুর, আওয়ালগাতি, ভান্ডারখোলা, চাঁদড়া, দেউলি, বাগদাহ, সাবদিয়া, মজিদপুর, মধ্যকুল, ব্রহ্মকাটি, রামচন্দ্রপুর, ব্যাসডাঙ্গা, পাঁজিয়া, গড়ভাঙ্গা, কলাগাছি, গৌরিঘোনা, ভেরচি, মাগুরখালি, মঙ্গলকোট, বড়েঙ্গা, কন্দর্পপুর, পাথরা, কেদারপুরসহ অনেক গ্রামে গাছিরা খেজুরের রস সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ যেমন ঠিলে, খুংগি, দড়া, গাছি দাঁ, বালিধরাসহ খেজুর গাছ কাঁটার কাজে ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন গাছিরা।

শ্রমজীবি গাছিরা জানান, প্রতি বছরে খেজুর গাছ কেটে ফেলার কারণে রস ও গুড়ের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক গাছের মালিকরা খেজুর গাছ কেটে ইটভাঁটায় বিক্রয় করে ফেলেছেন।

খেজুর গাছের মালিকরা জানান, আগের মতো পেশাদার গাছি (শ্রমিক) এখন নেই। অনেকে বৃদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। সারা গ্রামে এখন একজন গাছিও পাওয়া যায় না। সেজন্য একজন শ্রমিককে খেজুর গাছ তুলতে প্রায় ৩ থেকে ৫ শত টাকা করে দিতে হয়। গাছের পরিমান ও গাছির সংখ্যা কমে যাওয়া খেজুর রস ও গুড়ের দাম ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া আগে প্রতিটি গাছে এক কাঁটায় এক ভাড় করে রস হতো। কিন্তু এখন এর অর্ধেক রস হচ্ছে। আবহমান বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে শীত এলেই খেজুর রস ও গুড় নিয়ে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদেরও ব্যস্ততা বেড়ে যায় দ্বিগুন।

মৌসুমের শুরুতে আলতো শীতের সোনালী সূর্য্যরে রোদেলা সকালে গাছিরা বাঁশের ডগা দিয়ে নলি তৈরীতে ব্যস্ত সময় পার করে। কেউবা আবার পাটের আশ দিয়ে দড়া তৈরীতে মগ্ন। বেলা বাড়তেই ঠিলে-খুংগি-দড়া- গাছি দাঁ বালিধরা নিয়ে গাছিরা ছুটে চলে খেজুর রস সংগ্রহের জন্য গাছ কাঁটতে। আবার ভোরে উঠে রস নামাতে কুয়াশা ভেদ করে চড়ে বেড়ায় এক গাছ থেকে আরেক গাছে। এরপর ব্যস্ততা বাড়ে মেয়েদের সকাল থেকে দুপুর অবধি সেই রস জ্বালিয়ে গুড় তৈরীতে। এ্যালমুনিয়ামের কড়াইতে রস জালিয়ে গুড় তৈরী করতে সকাল থেকে দুপর পর্যন্ত সময় লাগে। জিরেন রস দিয়ে দানাগুড়, ছিন্নি গুলা, পাটালী তৈরী করা হয়। আর ঘোলা রস (যে রস পরেরদিন হয়) দিয়ে তৈরী হয় ঝুলা (তরল) গুড়। নলেন রসের পাটালী খেতে খুবই সুস্বাদু হয় বলে বাজারে কদর অনেক বেশী এই নলেন গুড়ের।

কেশবপুর তথা যশোরে খেজুরের রসের খ্যাতি বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে। কেশবপুর উপজেলা থেকে তাজা খেজুরের রসের তৈরী গুড় বাংলাদেশের প্রত্যেক অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে থাকে। পাশাপাশি বিদেশেও কেশবপুরের খেজুরের গুড়ের ব্যাপক কদর রয়েছে। যশোর তথা কেশবপুরকে সারা পৃথিবীতে পরিচিত করেছে যে কয়টি বিষয় তার মধ্যে যশোরের কেশবপুরের খেজুরের রস অন্যতম একটি।

শীত আসলেই আবহমান বাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয় উৎসবের আমেজ। প্রতি ঘরে ঘরে শুরু হয় হরেক রকমের পিঠা তৈরীর আয়োজন। পিঠা তৈরীর জন্য ঢেঁকিতে চাউলের গুড়া তৈরীর মহোৎসব পড়ে যায়। বাংলার প্রতি ঘরে ঘরে সন্ধ্যা হলেই একদিকে শুরু হয় কবি গান, অন্য দিকে সন্ধ্যে রস দিয়ে শুরু হয় বিভিন্ন প্রকার পিঠা পুলিসহ পায়েশ তৈরীর ধুম।
কেশবপুর শহরে শীত মৌসুমে গুড় ব্যবস্যা চলে জাকজমকভাবে। গুড় ব্যবসায়ীরা তাদের আড়তে বিভিন্ন এলাকা থেকে গুড় সংগ্রহ করে মজুদ করে রাখেন। কেশবপুর ও তার আশপাশের উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজার থেকে ব্যবসায়ীরা গুড় ক্রয় করে থাকেন। এর মধ্যে কলারোয়া উপজেলার খোর্দ বাজার, মনিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জ বাজার, কেশবপুরের সরসকাটি বাজারসহ প্রতিটি এলাকার হাটবাজারে কৃষকদের কাছ থেকে গুড় কিরে কেশবপুর শহরে আড়তে রাখা হয়। এখান থেকে ট্রাকভরে নিয়ে যায় দেশের বিভিন্ন শহরে।

চট্রগ্রামে বাঁশখালী এলাকার ব্যবসায়ীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে গুড় ব্যবসায়ীরা কেশবপুরে জড়ো হয়। কেশবপুরের গুড় নিয়ে এ সকল ব্যবসায়ীরা দেশে ও বিদেশে পাঠান বলে গুড় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
সচেতন মহল বলেছেন সরকারি সড়কের দু’পাশে যদি পরিকল্পিতভাবে খেজুর গাছ লাগানো হয় তাহলে প্রতিবছর খেজুর গুড় বিক্রি করে সরকার প্রচুর টাকা রাজস্ব আয় করতে পারবে। আর এতে “যশোরের যশ খেজুরের রস” সেই ঐতিয্য ধরে রাখা সম্ভব হবে।

উপজেলা কৃষি অফিসার মহাদেব সানা জানান, কেশবপুরের খেজুর গাছ বৃদ্ধি করার জন্য তারা প্রতি বছর উপজেলার বিভিন্ন সড়ক ও নদীর পাড়ে খেজুরের বীজ বপন করে আসছেন। বর্তমানে কেশবপুরের প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার খেজুর গাছ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ গাছ থেকে রস আহরণ করা হয়। আর গোটা উপজেলায় প্রায় ১৫’শ গাছি খেজুর রস আহরণ করেন।
ঐতিয্যবাহী কেশবপুরের খেজুর গুড় বাজারজাত করতে সোমবার কেশবপুরের ত্রিমোহিনী ও সাতবাড়িয়া ইউনিয়নের ৭০জন খেজুর গাছিকে যশোর শেখ হাসিনা সফটওয়ার টেকনোলজি পার্কের কেনাকাটা ডট কম এক প্রশিক্ষণের আয়োজন করে। এ সকল গাছির কাছ থেকে তারা ভেজালমুক্ত গুড় তৈরী করিয়ে তা বাজারজাত করবে। এজন্য প্রশিক্ষন শেষে তাদের গাছ কাটার উপকরণও দেয়া হয়েছে।

হারিয়ে যাচ্ছে কেশবপুরে ঐতিয্যবাহি খেজুরের রস ও গুড়
গাছিদের প্রশিক্ষন

কৃষি বিভাগের এল জি এস পি থ্রি এর আওতায় ত্রিমোহিনী ইউনিয়নস্থ কৃষি ভবনে অনুষ্ঠিত গাছি প্রশিক্ষণ ও উপকরণ বিতরণ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান।

প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জেলা প্রশাসক মোঃ তমিজুল ইসলাম খান। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, যশোর স্থানীয় সরকারের উপ পরিচালক মোঃ হুসাইন শওকত, যশোর কৃষি অধিদপ্তরের উপ পরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মহাদেব চন্দ্র সানা প্রমুখ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন কেনাহাট ডট কম এর নাহিদুল ইসলাম।

আয়োজকরা জানান, উপজেলার দুটি ইউনিয়নের ৭০ জন গাছিকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভেজালমুক্ত খেজুর গুড় তৈরী করার উপর গুরুত্বারোপ করার পাশাপাশি গাছিরা যাতে ন্যায্য মূল্য পায় তার সুব্যবস্থা করা। গাছি নারায়ন চন্দ্র নাজমুল, আনসার আলী, আব্দুল কাদের জানান, কেনা কাটা ডট কম এ ধরণের আয়োজন করায় তারা খুশি এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা নিরাপদ রস আহরণ ও গুড় তৈরীতে সক্ষম হবেন। ভিজিট করুন

কেশবপুরে খেজুর গাছিদের প্রশিক্ষণ ও উপকরণ বিতরণ