১৯৭২ সালের ১৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে ইন্দিরা গান্ধী ঢাকায় আসেন

১৯৭২ সালের ১৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে ইন্দিরা গান্ধী ঢাকায় আসেন

মতামত কলাম ও ফিচার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

প্রসঙ্গঃ ১৭ই মার্চ

জুলফিকার আলী মানিক।। প্রসঙ্গঃ ১৭ই মার্চ ।।

বাংলাদেশ ও স্বাধীন বাঙালী জাতির জাতীয় জীবনে ১৭ই মার্চ তাৎপর্যপূর্ণ তারিখ, সেটা আমরা সবাই জানি। এই তারিখটি ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবেও অনেকের জন্য তাৎপর্যের। যেমন আমার ও আমার মায়ের পরিবারের কাছে ১৭ই মার্চ বিশেষ স্মৃতিবহ তাৎপর্যের। যা কখনও একান্ত বিষয় বলে লিখি না, বলি না। এবছর ১৭ই মার্চ লিখছি; কারণ, এবছর ঠিক করেছি আমার বাবাকে নিয়ে টুকরো টুকরো চিরকুট লিখবো। বাবাকে নিয়ে কখনও লেখা হয়ে ওঠে না কারণ, শৈশবে তাঁর দেহত্যাগের পর মা-ই আমার পৃথিবী হয়ে ওঠেন। এবছর বাবার কথা লিখবো ঠিক করেছি; কারণ, এবছর আব্বার জন্মশতবার্ষিকী। তাই তাঁর কথা লিখে, তাঁকে স্মরণ করেই এবছর ২০২১ সাল শুরু করেছি। আব্বার জন্ম ১৯২১ সালের নভেম্বরে। সুস্থতার সাথে বেঁচে থাকলে বাবার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করবার খুব ইচ্ছা আছে। তবে আজ ১৭ই মার্চ দিনটি বাবার কারণেই আমাদের পরিবারের কাছে বিশেষ স্মৃতির।

এই লেখার সাথে পোস্ট করা ছবিটি ১৯৭২ সালের ১৭ই মার্চ একটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনার একটিমাত্র মূহুর্তের দৃশ্য। সেদিন স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে প্রথম পদার্পণ করেন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের পরম বন্ধু ভারতের সেসময়ের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিনে ঢাকা শহরের তেজগাঁও বিমান বন্দরে নামেন ইন্দিরা গান্ধী। স্বয়ং বঙ্গবন্ধু, তাঁর স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, তাঁদের সর্বকণিষ্ঠ পুত্র সন্তান শেখ রাসেল বিমানবন্দরে ইন্দিরা গান্ধীকে স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন। আরও ছিলেন তৎকালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ।

বিমান বন্দরে স্বাধীন বাংলাদেশের তিন সশস্ত্র বাহিনীর পক্ষ থেকে যাঁরা ইন্দরা গান্ধীকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন তাঁদের মধ্যে নৌবাহিনীকে প্রতিনিধিত্ব করা ব্যক্তি আমাদের দশ ভাই-বোনের জনক, একাত্তরের একজন মুক্তিযোদ্ধা এ এম আতাউল হক। এই ছবিতে নৌবাহিনীর সাদা পোশাকে দাঁড়ানো যেই ব্যক্তি, তিনিই আমার পিতা। সেখানে সেনাবাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করেন মুক্তিযোদ্ধা এ কে এম শফিউল্লাহ এবং বিমান বাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করেন মুক্তিযোদ্ধা এ কে খন্দকার। ছবিতে তাঁদের তিনজনকে ইন্দিরা গান্ধীর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি এম এ জি ওসমানী।

এই ছবিটি আমাদের পরিবারের সংগ্রহে ছিল না। লেখক, সাংবাদিক ও গবেষক শাহরিয়ার কবির ১৯৯৬-৯৭ সালের দিকে মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ভূমিকা নিয়ে গবেষণা করার সময় দিল্লীতে সামরিক আর্কাইভ থেকে আরও অনেক ছবির সাথে এই ছবিটা সংগ্রহ করেছিলেন। ছবিতে নৌবাহিনীর প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিকে তিনি চিনতে পারেননি। তাই শাহরিয়ার কবির ছবিটি দিয়ে বলেছিলেন আমাদের পরিবারের জেষ্ঠ্য সদস্যরা নৌবাহিনীর লোকটিকে চেনে কিনা জেনে দিতে। আমি ছবি দেখেই চিনেছিলাম। আব্বা দেহত্যাগ করেন ১৯৭৭ সালে, আমি মাত্র প্রথম শ্রণীর ছাত্র তখন, খুব একটা প্রগাঢ় স্মৃতি নেই আমার। তাই নিশ্চিত হতে আম্মাকে ছবিটা দেবার পর বলেছিলেন “এটাই তো তোর বাপ।” শাহরিয়ার কবির ভাইকে তা জানানোর পর তিনি বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, পরিচয়ের এত বছরেও তাঁকে এসব কথা বলিনি কেন?

সত্য হলো, আত্মকথনে দারুণ সংকোচ হয়। সেই সংকোচের দেয়াল সরিয়ে আজ লিখলাম শুধু জন্মশতবার্ষিকীতে বাবাকে খন্ড খন্ড চিত্রে স্মরণ করতে। ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোন কিছু জাহির করা এই পোস্টের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের পরিবারের কেউ স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে আব্বার মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় বলে কোন সুবিধা ও সহানুভূতি কখনও অর্জনের চেষ্টা করেনি, কোনদিন করবেও না, এই বিশ্বাস দৃঢ়ভাবে আছে। আব্বাও মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট নেন নি, নিতে আগ্রহ বোধ করেন নি।

এই ছবিটি শাহরিয়ার কবির ভাই না আনলে হয়তো আমাদের সংগ্রহে কোনদিন থাকতো না, কোনদিন ১৯৭২ সালের ১৭ই মার্চের এই দৃশ্য দেখতাম না। তাই আমি যাঁকে আমার সাংবাদিকতার একজন গুরু মানি, সেই সুপ্রিয় শাহরিয়ার কবির ভাইয়ের কাছে চিরকৃতজ্ঞ ও ঋণ স্বীকার করে রাখছি বাবার জন্মশতবার্ষিকীর বছরের ১৭ই মার্চে।