২৮ বছরে আমরা

২৮ বছরে আমরা-১০

কলাম ও ফিচার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

২৮ বছরে আমরা

নাজনীন সীমন।। ২৮ বছরে আমরা-১০
আমার বাবার মতো নির্বিবাদী মানুষ আমি কম দেখেছি। কথায় বলে বড়ো সন্তানেরা বোকা ও নরম প্রকৃতির হয় একটু; যে কেউ তাকে ঠকিয়ে যায় সহজেই। বহুবার বহু জায়গায় গুরুজনদের মুখে শুনেছি মেজো সন্তানরা ভীষণ চঞ্চল প্রকৃতির হয়, খানিকটা বেয়াড়া গোছের। আবার ছোটো সন্তানরা হয় আহ্লাদখেকো। সবার আদরে আদরে কাটে এবং এদের কপালে শাসন ও ভালোবাসা দুটোই জোটে সমান তালে; আবার শুনেছি বড়ো সন্তান যে পরিমাণ যত্ন পায়, অনেক ভাইবোন থাকলে ছোটো সন্তান পর্যন্ত যেতে যেতে তার পরিমাণ কমে যায়। অতো সময় কারই বা থাকে ডজন খানেক কিংবা তারও বেশী বাচ্চার দেখভাল করার! তার উপর তো থাকে সংসারের আরও আরও সদস্যদের বিভিন্ন দাবী দাওয়া। অন্তত সে কালে থাকতো। তার উপর বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে শ্বশুর বাড়ির লোকদের তীর্যক মনোভাবের শিকার হয় পুত্রবধূরা এবং সময় পরিক্রমায় এরা সংসারের খানিক কর্তৃত্ব এদের হাতে গেলে, এরা শাশুড়ি হয়ে উঠলে, পুনরাবৃত্তি ঘটে তাদের নিজস্ব জীবনের, অন্য কারো জীবনে। বাবার সংসারে চলে মেয়েদের ভালো মেয়ে থেকে সুগৃহিণী হয়ে ওঠার শিক্ষা। আর স্বামীর সংসারে চলে হাতে কলমে প্রতি পদে ভালো বউ তার প্রমাণ দেয়ার আমৃত্যু পরীক্ষা যেখানে অন্য কিছু ঠিক ততোটা গণ্য হয় না যতোটা হয় তার সহনক্ষমতা এবং মুখ বুজে থাকার যোগ্যতার–অনেকটা “মাইর হবে কিন্তু শব্দ হবে না”–এমন যে করতে পারে, তার টিকে থাকার সম্ভাবনা বেশী। এরপর কারো কারো জায়গা হয় ছেলের সংসারে, কেউ বা শ্বশুর অথবা স্বামীর ভিটেতেই কাটিয়ে দেয় বাকী জীবন। তার নিজের সংসার আর কখনও হয়ে ওঠে না। নিজ গৃহে পরবাসী হয়ে নারী কাটিয়ে দেয় সারাটি জীবন; অবশ্য তাও বোধ হয় সঠিক নয়। তার তো নিজের বলে থাকে না কোনো কালে কিছুই; একটা পিংপং বলের মতো এ বাড়ি থেকে ও বাড়ি ঘুরে বেড়ায় সে খেলোয়াড়ের ইচ্ছে মতো।

যাই হোক, আমার বাবা ছিলেন এক বিশাল পরিবারের বড়ো সন্তান। বোকা কি না বলতে পারবো না কয়েকটি কারণে যার একটি হলো আমার ব্যক্তিগত ধারণা তিনি খুব বুদ্ধিমান ছিলেন কিন্তু এতোটাই সাত চড়ে রা না করা মানুষ ছিলেন যে ওনার বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ সেভাবে ঘটতো না। একদিকে যেমন প্রচণ্ড গুরুগম্ভীর অন্যদিকে ঠিক ততোধিক শিশুসুলভ ছিলেন তিনি সহসা বাইরে থেকে দেখে যা বোঝার কোনো উপায় ছিলো না; ঠিক নারকেলের মতো– যতোটা শক্ত ও রুক্ষ বাইরে ততোটাই নরম, কোমল, মিষ্টভাব ভিতরে। আমরা তো ভয়ই পেতাম তাঁকে। সারা বাড়ি দৌড়াদৌড়ি, হুড়োহুড়ি কিন্তু যেই বাবার বাড়ি ফেরার শব্দ শুনতাম, পড়ি কি মরি করে পড়তে বসে যেতাম। বাবা যে এসেছেন সেটা বুঝতে কোনো কষ্ট হতো না; রিক্সা থেকে নেমেই উনি একটা কাশি দিতেন যা দোতলায় থেকেও শোনা যেতো স্পষ্ট। আপাত দৃষ্টিতে ওটা কাশির শব্দ হলেও আমাদের কাছে ছিলো জাহাজ ঘাটে ভেড়ার ভেঁপু যে কি না আমাদের ভাসিয়ে রাখতে বন্দরে বন্দরে ভিড়তো, প্রচণ্ড ঝড়ে নিজে দুলতে দুলতে, উল্টে পড়তে পড়তে আবার নাক সোজা করে চলতো কিন্তু আমাদের কোনো ঝঞ্ঝার আঁচটুকুও পেতে দিতো না। বন্ধু-আত্নীয় সম্পর্কের এক বড়ো ভাই, বাবার থেকেও বয়সে বড়ো, বলেছিলেন তাঁর নিজের বাবার গল্প যিনি তাঁর ছেলে সন্তানদের শিখিয়েছিলেন বাড়িতে ঢোকার আগে শব্দ করে কাশতে যাতে বাড়ির নারী সমাজ বিশেষত স্ত্রী মর্যাদার সকলে তটস্থ হয়ে উঠতে পারে, ‘স্বামী’ নামক প্রভুটিকে অসন্তুষ্ট হতে হয় এমন কোনো কাজ যেনো তারা না করে যাতে করে শাসন করতে তাদের হাত ওঠাতে হয়। যোগ করেছিলেন তিনি স্ত্রীরা সারাক্ষণ ভয়ে থাকবে এবং রান্নাঘরই হলো তাদের একমাত্র জায়গা যেখানে তারা স্বাধীন কাজ করতে পারে। বলা বাহুল্য, এই ব্যক্তিকে তাঁর নিজের স্ত্রী, পুত্রবধূর সাথে ঠিক নিজের বাবার শেখানো পদ্ধতিতে আচরণ করতে দেখেছি। তিনি মনে করতেন খুন্তি হচ্ছে মেয়েদের একমাত্র সম্বল এবং তাদের বুদ্ধি থাকে হাঁটুর নীচে। অথচ বাড়ির বাইরে সেই তিনি অন্য নারীদের ভাবতেন রাধা এবং নিজকে কলির কৃষ্ণ। বাবা যে কেনো কাশতেন, আমি এই বন্ধু-আত্নীয় ব্যক্তিটির গল্প শোনার পর বহুবার ভাবতে চেষ্টা করেছি, কিন্তু না, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছি তেমন কোনো আচরণ বা উদ্দেশ্য খুঁজে না পেয়ে। তবে তাঁর কাশির শব্দ আমার কানে “হায় আকাশ” হয়ে ভেসে আসতো। ভাইদের কেউ বা মা বা চাচা বা অন্য কেউ তেমনটি শুনতো কি না, কখনও জানতে চাওয়া হয়নি। আমি তাই শুনতাম এবং এখনও অবচেতনে মাঝে মাঝে শুনি এবং আঁতকে উঠি, খাঁ খাঁ শূন্যতা অনুভব করি চারপাশে।

উন্নয়নে বদলে গেছে কেশবপুর শহরের চিত্র, বেড়েছে নাগরিক সুবিধা

বাবা কিন্তু আমাদের বকা দিতেন না কখনও; গায়ে হাত তোলা তো অকল্পনীয়। মনে আছে একবার মা প্রচণ্ড মারছিলেন আমাকে ও ভাইকে; ছোটো ভাই তখনও জন্মায়নি। দুপুর বেলা অফিস থেকে রোজ দিনের মতো খেতে এসে বোধ হয় সহ্য করতে পারেননি; কিচ্ছু না বলে আমাদের দুই ভাইবোনের হাত ধরে বাসার সামনের মাঠের এক পাশে রেখে এলেন। “চলো তোমাদের কোনো এতিমখানায় দিয়ে আসি। এখানে থাকলে তোমরা মরে যাবা…” সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বলছিলেন জোরে জোরে–পরে বুঝেছি সেটা মাকে শোনানোর জন্য ছিলো। কোন অপরাধে মার খেয়েছিলাম, আজ সেটা মনে নেই কিন্তু এতিমখানা একটা ভয়াবহ শব্দ ছিলো আমার কাছে তখন। বাবা মা ছেড়ে কেমন করে মানুষ থাকতে পারে, মাথায়ই আসতো না। ঘরে তখন দুপুরের খাবার সময়, খেয়ে বাবা আবার অফিস যাবেন, কিন্তু তিনি টেবিলে বসেননি। আমাদের সংসারে কিছু ধরাবাঁধা নিয়ম ছিলো– দুপুর একটা থেকে দেড়টার মধ্যে অর্থাৎ বাবা এলে দুপুরের খাবার, সন্ধ্যা হবার পর পর বিকেলের নাস্তা খেতাম আমরা। ঠিক রাত দশটায় “সব ক’টা জানালা খুলে দাও না” শুরু হবে তো প্রত্যেককে রাতের খাবারের জন্য টেবিলে আসতে হতো–মা বাবা যতো দিন সুস্থ ছিলেন, এর ব্যত্যয় হয়নি। কিন্তু বাবা সেদিন খেতে বসলেন না ততোক্ষণ না যতোক্ষণ মা ছোটো কাকাকে দিয়ে আমাদের মাঠ থেকে নিয়ে আসালেন। অথচ সেই মানুষটাকে আমরা যমের মতো ভয় পেতাম। হয়তো তাঁর মিতবাক্যাভাসের কারণে একটু বেশী ভয় পেতো সবাই। সবার মনের খবর তো আমরা পাই না–তাতে যে কার ক্ষতি–যার মন তার, না যে খুঁজে পেলো না তার, জানি না। শুধু বুঝতে পারি সেই মানুষটির অতলে অনেক গল্প ছিলো, ছোট্ট ছোট্ট আশা ছিলো, ভালোবাসার প্রচণ্ড আকুতি ছিলো। আরও বুঝতে পারি খুব দেরীতে বুঝতে পেরেছি সে সব, যতোটা দেরীতে বুঝলে বোঝার আর কোনো দাম থাকে না, কিচ্ছু ফিরিয়ে আনা যায় না আর।

২৮ বছরে আমরা-৮

ঘরে আত্নীয় স্বজন ছাড়াও ছোটো কাকা, মা এবং আমার সূত্রে নানা বয়সের মানুষের অবাধ যাওয়া আসা ছিলো। কিন্তু বাবার অফিসের সহকর্মী বা উপরস্থ কর্মকর্তা ছাড়া আর কাউকে তেমন আসতে দেখিনি। অতো বড়ো কলোনীতে কতো মানুষ ছিলো; বিকেলে বাবার বয়সী অনেককেই একসাথে আড্ডা দিতে দেখেছি, কিন্তু বাবাকে না। একটু বড়ো হলে কখনও কখনও প্রচণ্ড রাগ হতো কাউকে কিছু বলেন না বলে। এমনকি ওনার ভাইদের কেউ কেউ যখন অসম্মানজনক আচরণ করছে, এক ভাইকে দেবতা বানাতে গিয়ে অন্য ভাইকে ছোটো করছে, তখনও কিছু বলেননি। আমার মনে হয়েছে বারবার, বড়ো ভাই হিসেবে কিছু বললে নিশ্চয়ই সবাই শুনতো, অনেক কিছু সোজা হয়ে যেতো সবার কাছে। কিন্তু না, তিনি সব সময় নির্ঝঞ্চাট থাকতে চেয়েছেন এবং আমৃত্যু তাই থেকেছেন। এমনকি ওনাকে অনেকটা মানসিক ভাবে দুর্বল করে, আগেই বলেছি একটু ভালোবাসাতেই বাবা গলে যেতেন, যখন বারো ভাইবোনের পৈতৃক বাড়ি এক ভাইকে ‘উপহার’ দেয়ার কথা বলা হলো, উনি রাজীও হয়ে গেলেন। খবরটা শুনে মনে হলো আমার শিকড় যেনো নড়ে গেলো। না, মাসে ছয় মাসে যে আমরা গ্রামে যাই, তা নয়। এমনকি এখন বছরেও একবার যাই না। কোনো দিন, কখনও গ্রাম থেকে আমাদের বাড়িতে কিছু এসেছে, মনে পড়ে না। খুব স্মৃতি আছে গ্রামের বাড়ি নিয়ে, তাও নয়। কিন্তু আমার পূর্ব পুরুষের বাড়ি তো! ভেবে দেখলাম মামা বাড়িতে যখন নতুন বিল্ডিং করেছেন বড়ো মামা আর সব মামার কম বেশী সাহায্য নিয়ে, কেউ অর্থ দিয়েছে, কেউ দেখাশোনা করছে, তখন আমার পিতৃকুলের অনেকে যাদের আমি জীবনে অতি উচ্চ আসনে বসিয়েছিলাম তারা উঠে পড়ে লেগেছেন তাদের পিতার বাড়ি বিক্রি করে দিতে কেবল একজন সদস্যকে খুশী করতে। অথচ ঐ বাড়িতে গা ঘেঁঘাঘেঁষি করে তারা বড়ো হয়েছেন, তাদের মা বাবা অর্থাৎ আমার দাদী এবং দাদা ঐ বাড়িতেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন, ঐ বাড়ি থেকে এতোজন মুক্তিযোদ্ধা দেশ স্বাধীনে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন, পাকিস্তানীরা ঐ বাড়িটি লুটপাট করেছে। ঐ ইটের দোতলা বাড়িটির সাথে তাদের একাত্নতা আমার থেকে ঢের বেশী কোনো সন্দেহ নেই। তবু সেই তারাই যখন এহেন উদ্যোগ নেন, আমি শুধু তাদের মনস্তত্ত্ব নিয়ে ভাবি। আবারও মনে হয় শিক্ষা তাহলে কি শেখায় মানুষকে কারণ একজন ছাড়া বাকী এদের সবার উচ্চতর ডিগ্রী রয়েছে: খুব উঁচু উঁচু পদে আসীন সকলেই, সমাজে দশজনের সাথে ওঠাবসা করছেন নিয়মিত। তারও চেয়ে বড়ো প্রশ্ন হলো কেনো এরা একজনকে সব দিতে চাইছেন আর সবাইকে বঞ্চিত করে? কে যে কার স্বার্থ দেখছে বোঝা মুশকিল। কেনোই বা দেখছে, সেটাও আর এক বিশাল জিজ্ঞাসা চিহ্ন।

২৮ বছরে আমরা-৯

একটি বাড়ি কি শুধুই বাড়ি? তাতে কি অসংখ্য স্মৃতির রেণু লেগে থাকে না? অগণিত চাওয়া পাওয়া, না পাওয়া, টুকরো টুকরো মান অভিমান খুনসুটি রাগ দুঃখ ভালোবাসা কি এর ইটের খাঁজে খাঁজে চাপা পড়ে থাকে না? এর দেয়ালে দেয়ালে কি প্রত্যেকের হাসি প্রতিধ্বনিত হয় না, কড়িবর্গায় কি তাদের কান্নাফোঁটা ঝুলে থাকে না, চিলেকোঠায় কি তাদের ভালোবাসা পা দুলিয়ে বসতে চায় না, আকাশ ছুঁতে চাওয়া নারকেল, সুপারী গাছগুলো তাদের মন ভোলায় না? এমনকি নিজেদের বাবা মায়ের কবরও তাদের একবারও ডাকে না! ভাবি আর ভাবি‍! কিন্তু তল খুঁজে পাই না।

সত্যি, না বুঝতে পারি মানুষকে, না ধরতে পারি তাদের চিন্তা জগতকে। খুব কাছের মানুষগুলো যখন অচেনা হয়ে যায়, তার চেয়ে নিঃস্ব ভাব, হতাশা, কষ্ট আর কিছুতেই হয় না পৃথিবীতে। ভিজিট করুন

লেখক প্রবাসী সাহিত্যিক ও সম্পাদক