২৮ বছরে আমরা-১২

২৮ বছরে আমরা-১২

সাহিত্য কলাম ও ফিচার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

২৮ বছরে আমরা-১২

২৮ বছরে আমরা-১২

নাজনীন সীমন

Hoarder
I’m nothing but a great hoarder,
no materials I collect though,
nothing money can buy is my interest at all–
swear by everything dear to me!
I preserve all the words you utter.
Every action you take
all the conspiracies and abuses,
hypocrisy, shrewdness, contrivance,
your greed, scheming–
everything is scripted in my heart and
I never feel a crunch in spacing them.
Your mockery, jealousy, rigid ego are just
ways to show you’re covetous, I know.
So,
your love and care are carefully engraved there, too.
I hoard them with care and determined secrecy
I never let go off anything
‘cause I’m a passionate hoarder!

আমি প্রায়শই ওয়ার্ল্ডোমিটার খুলে বসে থাকি এবং বিস্মিত হই। প্রতি সেকেণ্ডের জন্ম মৃত্যুর হিসেব সেখানে নিয়মিত ভেসে উঠছে এবং বাংলাদেশ জনসংখ্যার দিক দিয়ে অষ্টম স্থানে অবস্থান করছে। অবশ্য প্রতি সেকেণ্ডে এটি নয়, সে আমি নিশ্চিত; জানি না এটি কি ডেসিসেকেণ্ড, না সেন্টিসেকেণ্ড, না মিলি-মাইক্রো-ন্যানো-পিকো সেকেণ্ড। প্ল্যাঙ্ক টাইম, হিসেব করা যায় সময়ের এমন ক্ষুদ্রতম মানদণ্ড, হলেও কিছু আসে যায় না যদিও, কেননা অতো কিছু আমি বুঝি না। আমি শুধু দেখি জন্মের তুলনায় মৃত্যুর গতি কিঞ্চিৎ ধীর যা আমাকে স্বস্তি দেয়। আবার মৃত্যু সংখ্যা দেখতে দেখতে ভাবি এর মধ্যে আমারও কাছের মানুষ বা প্রিয় মানুষ, পরিচিত মুখ রয়েছে। যেমন এই মুহুর্তে দেখতে দেখতে ভাবছিলাম আজ খানিক আগে আমার যে মামাতো ভাইটি চলে গেলেন সময়ের অতলে হারিয়ে যেতে, তিনিও নিয়ত পরিবর্তিত এই সংখ্যার মাঝে একটি পালক এবং এমনি করে আরও কতো হৃদয়ের মানুষই না এই সংখ্যাটিকে বড়ো করে তুলেছে। ঠিক একই সময়ে আমার রক্তের দু’জন মানুষ লাইফসাপোর্টে; মন প্রাণ এক করে চাইছি ফিরে আসুন তাঁরা, আরও বহু কাল থাকুন পরিবারের অংশ হয়। জানি, একদিন, যে কোনো দিন, আমিও একটি সংখ্যা হয়ে যাবো। আমরা নিজেদের এতোটাই ভালোবাসি, এতোটাই আত্নমগ্ন থাকি যে কখনও টের পাই না একটি সংখ্যা বই কেউই কিছু না। কাজে হোক, ঘরে হোক, বাইরে হোক, কোথাও কোনো শূন্য স্থান চিরকাল খালি পড়ে থাকে না। প্রকৃতির নিয়মটাই এমন নিষ্ঠুর। যেটা থাকে তা হলো কিছু মানুষের ভিতরে নিয়ত ক্ষরণ। আর যদি ভালো কাজ করে যাওয়া যায়, তার মধ্যে দিয়ে বাঁচে মানুষ; খারাপ কাজ করলে হয়তো অন্যদের হাঁফ ছেড়ে বাঁচার মধ্যে বাঁচে–হয়তো; সঠিক বলতে পারবো না।

এই যে বর্তমান, অর্থাৎ যে মুহুর্তে লিখছি সেই সময় আজকের জন্মসংখ্যা ৩৬৮,৮৩৭ আর মৃত্যুসংখ্যা ১৫৪,৮৪৭ জন যোগ বিয়োগ করে পৃথিবীর জনসংখ্যা ৭.৮২৯, ০৭১, ৫৮৪ জন দাঁড়িয়েছে এবং এরা প্রত্যেকেই কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন মানুষ। আমাদের সাধ, স্বাদ, স্বপ্ন, বাস্তবতা, ব্যক্তিত্ব, সামর্থ্য সবই আলাদা। খুব ভালো করে জানি, আমি একাই এই দলে নই, আমার মতো আরো অসংখ্য মানুষ আছে যারা উপরের কবিতাটির মতোই স্মৃতি সঞ্চয় করে। ভালো বা খারাপ, সুখ বা দুঃখের কোনো ঘটনাই তারা ভুলতে পারে না। এ এক যন্ত্রণাময় অভ্যেস যা পোড়ায় খুব। এই জীবনে কতো টাকা যে হারিয়েছি, ইয়ত্তা নেই। কতো টাকা নিজ হাতে খরচ করেছি, তাও হিসেব রাখিনি। বেশীর ভাগ মানুষ বোধ হয় তা রাখেও না। কোনো কিছুই আমাকে পোড়ায় না, যতোটা কষ্ট পাই আমি কারো দেয়া কিছু নষ্ট হলে বা হারিয়ে ফেললে। আজ অবধি আমার কাছে জমা আছে যেখান থেকে যার কাছ থেকে যতো উপহার, কার্ড, এমনকি চিঠি পেয়েছি–সবই কেবল মাত্র জলে ভিজে কিছু জিনিস যা নষ্ট হয়েছে, আর আমার অনুপস্থিতিতে শিক্ষিত হবার জন্য আমার ব্যক্তিগত গ্রন্থশালা উজাড় করতে গিয়ে যে যে যতোগুলো বই ও ক্যাসেট নিয়ে ফেরত দিতে ভুলে গিয়েছে, সে সব ছাড়া। আমি যখন বড়ো হয়ে উঠছি, সে সময়ে উপহার মানে ছিলো জামা কাপড় ছাড়া কয়েকটি জিনিস–বই, কলম, গানের ক্যাসেট, আর কার্ড। আমরা বলতাম ভিউকার্ড। প্রতি ঈদে, জন্মদিনে, নতুন বছরে কার্ডের বিনিময় চলতো। কোনোটা নায়ক নায়িকার ছবি দিয়ে, কোনোটা আবার ফুল লতা পাতা, প্রকৃতি ইত্যাদি দিয়ে, আবার কোনোটা আইফেল টাওয়ার, টুইন টাওয়ারসহ বিভিন্ন দেশের উল্লেখযোগ্য স্থাপনাসহ। মোনালিসার ছবিওয়ালা কার্ডও সেখানে ছিলো। দুই টাকা, তিন টাকা, পাঁচ টাকার কার্ড কিনতাম তখন। এক টাকায় পাওয়া যেতো কি না মনে নেই। দশ টাকার কার্ড ছিলো ভিন্ন মাত্রার। মনে হতো বড়ো যখন হবো, অনেক টাকা হবে আমার, তখন সবাইকে দশ টাকার কার্ড কিনে দেবো। সে এক অন্য রকম আনন্দ। মানুষ ছোটো বেলায় কতো কিছুই না কল্পনা করে!

প্রায়ই দেখি পরিচিত সকলে, বন্ধুবান্ধব আত্নীয়, বাড়িঘর পরিষ্কার করার সময় পুরনো জিনিস ফেলে দিতে। আমি পারিই না!। জিনিস কেবল জিনিস নয়, আমার কাছে ভালোবাসামাখা স্মৃতি; ওসব বস্তু নয়, বরং টকটকে হৃৎপিণ্ড বলে মনে হয়। আবার এমনও উপহার পেয়েছি জীবনে যার অর্থমূল্য হয়তো বেশ, কিন্তু কখনও ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে হয়নি যে মানুষটির হাত দিয়ে এসেছে, তার কারণে। বস্তু নয়, তার পেছনের চিন্তা, অন্তরের স্পর্শই গুরুত্বপূর্ণ। বস্তু নয়, মানুষটাই মুখ্য। আর তাই খুব কানে বাজে নানীর ‘শিলু’ বলে ডাকটা। ‘ইস্টিমার’, ‘সীমা মণি বলে’, ‘শিমুলিয়া বেগম’, ‘কালো মেয়ে’, ‘শিমুল’ ‘শিউলী’, সীমানি’, ‘সীমুমণি’, ‘সীমুনি’, ‘সীমন’–কতো কতো নামে ডাকতো পরিবারের লোকজন।। সেই সময় এই ডাকগুলো যে কতোটা কাছের, বুঝতে পারিনি। আজ বুঝি। পঞ্চম শ্রেণীতে বৃত্তি পাবার পর ডাক্তার চাচা একটি পার্কার কলম উপহার দিয়েছিলেন ভিতরে একটি চিরকুট দিয়ে। মুক্তোর মতো সেই লেখা যেনো খাঁজ কেটে কেটে প্রতিটি অক্ষর বসানো হয়েছে। আজও রেখে দিয়েছি সেই কলম এবং চিরকুটটি। খুব কাছের একজন একটা ছুরি দিয়েছিলো–এক বিঘতের চেয়েও ছোটো, কাঠের শরীর যার মাঝে ছুরিটা ঢুকিয়ে দেয়া যায় আর টেনে বের করতে হয় সেই খাপ থেকে। এখনও ওটি আমার সাথেই আছে। মাঝে মাঝে বের করে দেখি। আটাশ বছর কেটে গেলো এভাবে। আমৃত্যু, যতো দিন সজ্ঞানে থাকি, ওটা সাথেই রাখবো। নানীর মৃত্যুর পর তাঁর ট্রাঙ্ক ভরা শাড়ি থেকে সব মামা খালাদের একটি করে দেয়া হয়েছিলো। মায়ের ভাগের শাড়িটা এখনও যত্ন করে রাখা আছে।

মাও নেই বহু কাল হয়ে গেলো। মায়ের শাড়ির সাথে ওটিও রৌদ্রে দিয়ে ন্যাপথলিন গুঁজে আবার রেখে দেই। দাদীকে কখনও দেখিনি। আমি তো দূরের কথা, আমার সবচেয়ে ছোটো চাচা এবং ফুফুরও তাদের মায়ের মুখ মনে থাকার কথা নয়; জন্ম দেয়ার পর এতোটাই তাড়াহুড়ো করে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছিলেন তিনি। দাদীর একমাত্র স্মৃতি একটি ব্লাউজ আছে আমাদের ঘরে। ভাবতে অবাক লাগে সেই সময়ে গ্রামে বসে দাদী ঐ ধরনের ব্লাউজ পরতেন। যেমন কাপড়ের মান, তেমনি সুন্দর করে বানানো। ওটি নাকে দিয়ে দাদীর শরীরের গন্ধ পাবার নিষ্ফল চেষ্টা করি রোদে দেয়ার সময়। এসব কেবল মাত্র কিছু তন্তুর সমষ্টি নয়, ইতিহাসের অংশ, আমার অস্তিত্বের সাথে ওতোপ্রোত জড়িত। মাথার উপর কারো আশীর্বাদের হাত, ভালোবেসে বুকে জড়িয়ে ধরা, শাসন–সব লালন করি অসম্ভব যত্নে ঠিক যেমনটি অবিশ্বাস, আঘাত, কষ্ট পাওয়ার সমস্ত গল্প আলাদা আলাদা খোপে রাখা আছে অথচ আমার স্মৃতিশক্তি খুবই দুর্বল, আর দুর্বল বলেই ক্লাসের পড়া সেই অর্থে মুখস্ত করতে পারিনি কোনো দিন। অথবা বলা ভালো, মুখস্ত বিদ্যা আমার কখনই ছিলো না। বন্ধুদের দেখি কোন ছোটো বেলায় কোন ক্লাসে কোন গল্প পড়েছিলো, কোন কবিতা ছিলো–সব বলে দিতে পারে। বলতে পারে গড়গড় করে তর্ক বা ঝগড়া করার সময় কে কোন কথাটা কখন কিসের পর কোন প্রসঙ্গে বলেছিলো। আমি কেবল ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। আজকাল তো আর মুখোমুখি ঝগড়া হয় না; ফোনের এ ধার থেকে অন্য ধারে কথা চালাচালি, নয়তো লেখালেখি যদিও বলে নেয়া ভালো যে তেমন মানুষ বা বন্ধু বা স্বজন হয়তো আঙুল গুণে মাত্র কয়েক জন পড়ে আছে জীবনে যাদের কথায় আমি কষ্ট পাই না বলে বলা ভালো, যাদের আমি কষ্ট দেবার অধিকার দিয়েছি কেননা চোখের জল, হৃদয়ের রক্তক্ষরণ খুব মূল্যবান; সহজে তাকে নষ্ট করতে নেই–শিখেছি পোড় খেতে খেতে। বাকী সব আছে বটে, তারা গুরুত্বপূর্ণও বটে কিন্তু কষ্ট আমি পাই না তাদের আচরণে।

স্মৃতিশক্তির কথা বলতে গেলে বলতেই হয়, নিউইয়র্কে পাড়ি জমানোর পর একজন মামা পাই আমরা যাঁর স্মৃতিশক্তি কেবল চমৎকার নয়, অতুলনীয়ও বটে। আব্দুল মালেক, মালেক মামা, ছিলেন দার্শনিক, সাহিত্যিক ও সম্পাদক শিবনারায়ণ রায়ের ভাবশিষ্য এবং শিবনারায়ণ ছিলেন এম এন রায়ের, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা, শিষ্য এবং খুব কাছের মানুষ। মালেক মামা এক হাতে সাঁতরে দূরন্ত পদ্মা পাড়ি দিয়েছিলেন। তিনি পাতার পর পাতা মুখস্ত বলে যেতে পারতেন বাংলা বা ইংরেজী যে কোনো কিছু পড়ে। কোনো কিছু পড়ে ভালো লাগলেই মামা রাতে নিজের মনে আওড়াতেন কয়েক বার এবং পরের দিন ফটোকপির মতো পাতা থেকে মাথায় ছাপা হয়ে যেতো তা আজীবনের জন্য। এমনটি সত্যি আমি অন্তত কখনও দেখিনি। স্মৃতিশক্তি দেখেছি আমার বাবার এবং চাচাদের কারো কারো।

গান, সিনেমা সহ ইতিহাসের নানা ঘটনা ঠোঁটের আগায় থাকতো তাদের; ব্যক্তিগত কথা তো বলাই বাহুল্য। আমাদের সবচেয়ে ছোটো ভাইটি যেনো হেঁটে বেড়ানো গুগল। কোন সালের কতো তারিখে কয়টা বেজে কতো সেকেণ্ডে, আর্দ্র ঠাণ্ডা শুষ্ক গরম ইত্যাদি কোন আবহাওয়ায়, কোন জায়গায় বসে না দাঁড়িয়ে, চোখ বন্ধ করে না আধো খুলে, শাড়ি-জামা-শার্ট-প্যান্ট-লুঙ্গি কোনটা পরে, চা খাওয়ার আগে না পরে, চায়ের সাথে বিস্কুট চানাচুর মিষ্টি সিঙাড়া কি ছিলো, কয়টা ছিলো, কয়টা বাদাম মুখে নিয়েছিলো, কয় চুমুকে চা শেষ করেছিলো ইত্যাদি সহ ঠিক কোন মুহুর্তে কি বলেছিলো বা ঘটেছিলো সব একের পর এক নিজের চোখ খোলা রেখে ভূরু না কুঁচকে বলে যেতে পারে। আমার ছেলেকেও দেখি প্রায় একই অবস্থা। আর আমি মানিকের লেখার চরিত্রের সাথে বিভূতিভূষণের জায়গা মিলিয়ে দেই, জন ডানের সাথে গুলিয়ে ফেলি এন্ড্রু মার্ভেল… পড়ি, মানে পড়ার চেষ্টা করি কম বেশী, কিন্তু কিচ্ছু মনে থাকে না। মানুষের জন্মদিন ভুলে যাই; কেবল দু’জন মানুষের মৃত্যুর সাল তারিখ মনে আছে কিন্তু হারালাম তো কতো! কতো কিছু, কতো মানুষ যে হারালাম, কতো জীবিত মানুষ যে জীবনের খোলা খাতায় পাতার ভিতর চিরকালের মতো মমি হয়ে বেঁচে রইলো, ইয়ত্তা নেই। দিন ক্ষণ মনে না থাকলেও ঘটনাগুলো, মানুষের মুখগুলো ঠিকঠিক মনে থাকে। মনে থাকে বিশ্বাসঘাতকের মুখ, তার শানানো ছুরির ঝলকানি, স্বার্থপর আর সুবিধাবাদীর ঘুরিয়ে রাখা চেহারা, দু’মুখো সাপের ছোবল, প্রতিটি মানুষের করা অন্যায়, বুক থেকে গড়িয়ে পড়া রক্ত। কিচ্ছু ভুলিনি ভোলা সম্ভব নয় বলেই। কি করবো! আমি যে স্মৃতি মজুত করি! আমি… I’m a passionate hoarder!

লেখক – প্রবাসী সাহিত্যিক ও সম্পাদক

ভিজিট করুন

২৮ বছরে আমরা-৮

২৮ বছরে আমরা-৯

২৮ বছরে আমরা-১০