২৮ বছরে আমরা-১৩

২৮ বছরে আমরা-১৩

সাহিত্য কলাম ও ফিচার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

২৮ বছরে আমরা-১৩

নাজনীন সীমন।।  এই যে ধরে রাখার প্রবণতা বা প্রবৃত্তি, এটা খুব কষ্টদায়ক এক অভিজ্ঞতা–একটু বিচ্যূতিতেই কষ্ট হয়। তখন সম্ভবত তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ি। আমি বোধ হয় সবে কালির কলম দিয়ে লিখতে শুরু করেছি। এর আগে তো লিখতে হতো পেন্সিল দিয়ে। সাধারণ পেন্সিল। এইচ বি১, এইচ বি ২ নামের সেই হলুদ কালো ডোরাকাটা পেন্সিল তখনও দেখিনি যা মোমের মতো যেনো গলে গলে পড়তো খাতার উপর আর লিখলেই মেঘের মতো কালো হয়ে ফুটে উঠতো অক্ষরগুলো।
হাত ব্যথা হয়ে যেতো বাড়ির কাজে একই শব্দ পাতা ভরে লিখতে লিখতে কেননা সাধারণ পেন্সিলে বেশ একটু চাপ দিয়ে লিখতে হতো। তবু প্রতিদিন ঐ কষিটানা খাতায় বাংলা ইংরেজী গণিত আর আরবীর বাড়ির কাজ করতে হতো; লিখতে হতো একই শব্দ অথবা একই বাক্য পাতা ভরে। অঙ্ক অবশ্য ভিন্ন ছিলো–যোগ বিয়োগ ভাগ অথবা নামতা মুখস্ত লিখতে হতো। দিস্তা কাগজ নিয়ে আসতেন বাবা ছোটো চাচা আর আমার জন্য; ভোমর, এক ধরনের হাতলওয়ালা লম্বা সুঁই আর লাল-সাদার মিশ্রণে মোটা সুতো দিয়ে মা সেলাই করে দিতেন। শুধু তাই নয়, রুলার আর পেন্সিল দিয়ে দাগ টেনে টেনে কষিটানা খাতা বানিয়ে দিতেন অঙ্ক আর আঁকার খাতা বাদে।
মা কষি টানার সময় বারবার বলতাম একটু বড়ো বড়ো জায়গা রেখে দাগ দিতে এবং যতোই বলতাম, মা যেনো ততোই ছোট করে দিতেন। তাই এক এক সময় নিজেই চেষ্টা করতাম; সেটা করার কারণ ছিলো প্রতিটি খোপে যদি বেশী জায়গা থাকে, তাহলে খোপের সংখ্যা কমে যায়; আর সেটা হলে আমাকে লিখতে হয় কম। পরে জেনেছি উচ্চ শিক্ষার্থীদের পেপারের চারপাশে না কি মাপা হতো কারণ তারা চারপাশে নিয়মের বেশী জায়গা রেখে লেখা কম করার আয়োজন করতেন যদিও এখন আধুনিক প্রযুক্তির যুগে সে সব আর কেউ করে না বা করতে পারে না; পাতায় কতো শব্দ আছে, লাইনে কতো আছে, এক সেকেণ্ডে বের করে ফেলা যায়।
মা-ও এক পলকেই ধরে ফেলতেন আমার ফাঁকিবাজির চেষ্টা কেননা লাইনগুলো বাঁকতে বাঁকতে আর রেল লাইনের মতো সমান্তরাল থাকতো না; বরং দিগন্ত রেখায় আকাশ আর ভূমির মতোই মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতো যদিও কোনো শিক্ষক এটা ধরতে পারেননি কখনও। ফলে মা ধরে ফেলার আগ পর্যন্ত দুই চার দিন এটা করা যেতো এবং ধরা খাওয়ার পর সাজা স্বরূপ দ্বিগুণ লিখতে হতো। সেটাও অসহনীয় হতো না যদি না তার আগে আঁকা লাইনগুলো ঘষে ঘষে মুছতে হতো রাবার দিয়ে।
শাস্তির এই ধরনে অসহ্য হয়ে কিছু দিন চালানোর পরই এটা বন্ধ করেছিলাম। খাতা বানানোর উপর বহুবার পম্পিকে দিয়েছি ছবি এঁকে দেয়ার জন্য। এতো চমৎকার আঁকার হাত ছিলো ওর! ক্লাসে বসেই নিজ মনে হাত ঘোরাতো আর সুন্দর হয়ে ফুটে উঠতো গোলাপের থোক, ফুলদানী ভরা ফুল, উড়ে যাওয়া ঝাঁক ঝাঁক পাখি, প্রকৃতির নানা দিক। এটা সম্ভবত ওর সহজাত প্রতিভা ছিলো নতুবা না শিখে কেমন করে সম্ভব এমন চমৎকার আঁকা! অসম্ভব ভালো ছাত্রীটি খুব বড়ো একজন শিল্পী হয়ে উঠতে পারতো যদি আমাদের সমাজে সফলতা মানেই ডাক্তার, ইন্জিনিয়ার নতুবা সরকারী চাকরী না বোঝাতো। আমি জানি না কখনও ওকে আঁকতে কেউ উৎসাহিত করেছে কি না কিংবা কেউ বাধা দিয়েছে কি না যদিও ছোট্ট বেলা থেকে ও আমার খুব কাছের মানুষ।
স্কুলের বাড়ির কাজের কথা বলতে গেলে এখন মনে হয় বাবা যদি অন্তত হাতের লেখাটা নিজে করাতেন, তাহলে তাঁর মতোই সুন্দর হস্তাক্ষর হতো আমার। কি বাংলা, কি ইংরেজী–একেবারে যেনো খোদাই করা প্রতিটি অক্ষর এবং শুধু তাই নয়, পেঁচিয়ে লিখতেন তিনি। সাদা কাগজে লিখতেন, অথচ লাইনগুলো যেনো রেল লাইনের মতো সমান্তরাল চলছে, এতোটুকু এদিও ওদিক ছাড়া। আমাদের কোনো ভাইবোনের পড়াশোনাই বাবা দেখেননি যদিও তাঁর আশা ছিলো অনেক আর ভরসা ছিলো মায়ের উপর, এখন বুঝতে পারি।
আর মা ছিলেন বাজ পাখির মতো–সব করার অনুমতি ছিলো লেখাপড়া ঠিক থাকলে, কিন্তু পড়ালেখায় এদিক ওদিক হলে তাঁর হাতও আমাদের ছোটোখাটো লিকলিকে শরীরে দিগ্বিদিক পড়তো হাতের কাছে যা থাকতো, তাই নিয়ে তা হোক সে ডালঘুটনি, খুন্তি, স্কেল বা অন্য যে কোনো কিছু যদিও ঝাড়ু ব্যবহার করার কথা আমার মনে পড়ে না।
আর সুন্দর লেখা দেখেছি আমার নোয়া কাকার। এ যাবৎ বহু বহু চিকিৎসাপত্র দেখার দুর্ভাগ্য হয়েছে, দেশী বিদেশী সুন্দর লেখাও দেখেছি যা থেকে প্রতিটি শব্দ পড়া সম্ভব কেননা অনেক লেখাই দেখেছি যা রোগী বা রোগীর আত্নীয় স্বজন তো দূরের কথা অন্য ডাক্তার এমনকি ‘সর্বধরনেরহাতেরলেখাবিশেষজ্ঞ’ কম্পাউন্ডাররাও অর্থ উদ্ধারে সমর্থ হননি; কিন্তু সত্যি বলছি বাংলা বা ইংরেজী কোনোটাতেই ওনার মতো এতো চমৎকার করে কাউকে অসুধের নামসহ অন্যান্য নির্দেশনা লিখতে দেখিনি।
ওনার মতো এতো যত্ন করে রোগীর কথা শুনতে এবং তাকে বুঝতেও আমি আর কোনো ডাক্তারকে দেখিনি–ওনাকে যৎসামান্যই দেখেছি রোগীদের সাথে; সেই স্বল্প অভিজ্ঞতা থেকেই বলা, বাংলার ঐ প্রবাদ বাক্যটির কথা মনে রেখেই, ভাত হয়েছে কি না তা বুঝতে হাঁড়ির সব ভাত টেপা লাগে না; একটি দেখলেই বোঝা যায়। আমার কয়েকজন বন্ধুর হাতের লেখা ছিলো তেমনই সুন্দর, গোটাগোটা। বহু বহু দিন তাদের চিঠি পাই না; কিন্তু আমি জানি কোনো দিন কখনও যদি ডাকবাক্সে তাদের কারো কাছ থেকে দুটো লাইনও আসে, নামধাম লেখা না থাকলেও আমি ঠিক চিনে নিতে পারবো কারণ মগজে নয় শুধু, বুকেও ধারণ করি তাদের এবং করে যাবো যতো কাল আমার মস্তিষ্ক সচল থাকে।
আমার কোনো কোনো শিক্ষকের হাতের লেখাও ছিলো অতি নান্দনিক। শহীদুল্লাহ স্যার, নির্মল স্যার এর কথা তার মধ্যে বিশেষ ভাবে প্রণিধানযোগ্য, বিশেষত নির্মল স্যার যখন লাল কালির ঝর্ণা কলম দিয়ে সাদা কাগজে লিখে চলতেন, আমি তাকিয়ে কেবল ভাবতাম এতো সুন্দরও হয় মানুষের হাতের লেখা। কালির কলম দিয়ে প্রথম লেখা, সে ছিলো চরম বিস্ময়ের এবং অতীব আনন্দের এক ঘটনা। হঠাৎ মনে হতে লাগলো আমি তবে বড়ো হয়েছি বোধ হয়।
সে যে কেমন আনন্দ তা ঠিক লিখে বোঝানোর মতো না। দোয়াত থেকে কালি ভরা কলমে, চুঁইয়ে পড়া কালিটুকু এক টুকরো কাপড় দিয়ে মুছে ফেলা, সপ্তাহে একদিন অন্তত জল ভরে ভরে কলমকে পরিষ্কার করে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে পুরো শুকনো করে আবার নতুন করে কালি ভরা–ভাষায় ধারণ করা সম্ভব নয় সে অপার্থিব অনুভূতি। কলম হাতে তোলার পর কিছু দিন আমার যেনো লেখা বেড়ে গেলো–খুব যে পড়ালেখায় যে খুব মনোযোগী সেটা বোঝানোর কি এক তাড়না ভিতর থেকে উথলে উঠতো, আমাকে যেনো থিতু হতে দিতো না।
কালি শেষ হবার উপক্রম হলে একটু ঝেঁকে নিলে আরো খানিক লেখা যেতো, তারপর তো সেই মহানন্দের সময়–কালি ভরা আবার। তবে কলম ব্যবহারের ভয়াবহ বিপদ ছিলো। কোনো ক্রমে কলম মাটিতে পড়লে প্লাস্টিকের শরীরখানা ফেটে যেতো। আর মুখ খোলা অবস্থায় হলে তো কথাই নেই–মুখটা ভোঁতা হয়ে যেতো, লেখা হয়তো যেতো মুখটি দাঁতে ছুরিতে চামচে পুতোয় খানিকটা ঠিক করার পর, কিন্তু লেখায় দুটো করে দাগ উঠে আসতো, যান্ত্রিক ত্রুটিযুক্ত গাড়ি যেমন থেমে থেমে চলে, ঠিক তেমনি। আর পাতার উপর তার চলার সে কি কর্কশ শব্দ যেনো আর্তনাদ উঠে আসছে।
তিনটি কলম হাত থেকে পড়ে এমনি নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো–একটি কালো, একটি মেরুন, আর অন্যটি জলপাই সবুজ। এখনও কলম তিনটি রয়ে গেছে। একটি ‘লিলি পেন’ উপহার পেয়েছিলাম জন্মদিনে। ওটা দিয়ে না লিখলে আর স্কুলে না নিয়ে গেলে কি হয়! প্রতিদিন ওটা নিয়ে যাই, লিখি এবং বন্ধুদের কেউ কেউ ধার নিয়ে লেখে। কয়েক দিন বাদেই কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরতে হলো, দুই বন্ধু সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে এলো। ভয়ে এবং রাগে এবং দুঃখে চোখে বন্যা বয়ে গেলো। জিজ্ঞেস করতেই মাকে বললাম হড়বড় করে সব ঘটনা। নিশ্চিত করে বললাম কে আমার কলম চুরি করেছে। মা জিজ্ঞেস করলেন আমি দেখেছি কি না।
দেখেই যদি থাকবো তো চুরি করতে পারতো না কি! কিন্তু ঐ বয়সের সবচেয়ে বড়ো শিক্ষাটা বোধ হয় সেদিন দিয়েছিলেন মা যদিও সেই সময়ে তার মর্মার্থ বুঝিনি বলেই আমার দৃঢ় বিশ্বাস, বরং যথাসম্ভব এক কান দিয়ে ঢুকে অন্য কান দিয়ে বেরিয়েছিলো তা কারণ আমি লেগে পড়েছিলাম কলম উদ্ধারের কাজে। ছোটো কাকাকে বললাম বকাঝকা দিয়ে কলমটা ফিরিয়ে আনতে। অন্যের মেয়েকে এভাবে বকা দেয়া যায় না তিনি বোঝালেন। আমার দুই বন্ধু নিয়ে এদের বাসার সামনে বিকেলের খেলা বাদ দিয়ে হাঁটাচলা করতে লাগলাম যদি বাইরের জানালা দিয়ে দেখা যায় কারণ মা বলেছিলেন আমি যখন নিতে দেখিনি তখন কাউকে দায়ী করতে পারি না।
ওরা থাকতো আমাদের সামনের বিল্ডিংয়ের পাশেরটার এক তলায়। মাঠের সাথেই যেহেতু বাসা ছিলো চারপাশ ঘিরে ওরা মুরগী আর হাঁস পালতো। বেড়া পার হয়ে ওদের ঘর দেখা সম্ভব হলো না বিধায় ভগ্ন মনোরথে কয়েক দিন বাদে ক্ষান্ত দিলাম যদিও ওকে দেখলেই আমার চোখ বোধ হয় বের হয়ে আসতে চাইতো রাগে। তারও কয়েক দিন বাদে খুব চমৎকার করে আমারই সামনে আমারই কলম দিয়ে লিখতে লাগলো সে। সোজা চেয়ে বসলাম এবং সেও সোজা অস্বীকার করে বসলো। পারলে আমি তার চুল ছিঁড়ে দেই তখন। পরের ক’দিন আর কলমটি আনলো না সে।
এরপর যেদিনই এনেছিলো, সুযোগ বুঝে আমিও তার ব্যাগ থেকে কলমটি নিয়ে নিয়েছিলাম কিন্তু কপাল খারাপ হলে যা হয়–কলম চলে এলো আমার কাছে আর তার মুখটা ওর কাছে রয়ে গেলো। আমার মেরুন রঙের লিলি কলমটি আজীবনের জন্য খুঁতো হয়ে গেলো। বাসায় কোনো দিন বলতে পারিনি ওটা আমি ফিরিয়ে এনেছি। তবে দুটো গুরুত্বপূর্ণ জিনিস শিখেছি আমি এর থেকে চেষ্টা করি যার চর্চা করতে; প্রথমটি হলো চোখ কান দিয়ে দেখা ও শোনার পরও পরিবেশটা জানতে হয় কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবার জন্য। আর দ্বিতীয় বিষয়টি হলো অন্যায়ের বিরুদ্ধে চুপ করে না থাকা।
জানি মানুষ দ্বিতীয়টি পছন্দ করে না সচরাচর, বিশেষত ‘মেয়ে মানুষের তো অতো চোপা থাকা ভালো না”। আমি আরও শিখেছি সবাইকে খুশী করা সম্ভব নয়; চেষ্টা করতে করতে আমরা ক্লিষ্ট হয়ে যাবো, কিন্তু মন জয় করা সম্ভব নয় সবার। তাই নিজের মতো করে নিজেকে ভালো থাকতে হয়। আজকের আমি হলে কলমটি চুরি করে নিতাম না ওর কাছ থেকে বা ফিরিয়ে আনারও চেষ্টা করতাম না; এখন বুঝি চুরি করাই অন্যায় সে নিজের জিনিসই হোক বা অন্য কারো, এবং লজ্জিত হই নিজের কাছে এই কাজের জন্য।
এই ঘটনার বহু বছর পর আমার খুব পছন্দের একজনের দেয়া একটি আঙটি খোয়া গেলো। ওটি আরও প্রিয় ছিলো এ কারণে যে যিনি দিয়েছিলেন, তাঁর আর্থিক সঙ্গতি অতোটা ছিলো না বললেই চলে। ফলত এর গুরুত্ব ছিলো আমার কাছে অমূল্য। ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দেখিয়েও দিলো কার কাছে আছে ওটি। সুযোগ বুঝে আমি পরীক্ষাও করেছিলাম এবং নিশ্চিত হয়ে যেখানকার জিনিস সেখানে রেখেই সন্তর্পণে বেরিয়ে এসেছিলাম আর পরিবর্তে চিনেছিলাম অবিশ্বাসীর মুখ। ভিজিট করুন

1 thought on “২৮ বছরে আমরা-১৩

Comments are closed.