২৮ বছরে আমরা ১৪(২)-শিক্ষক যখন অমানুষ

২৮ বছরে আমরা ১৪(২)-শিক্ষক যখন অমানুষ

কলাম ও ফিচার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
২৮ বছরে আমরা ১৪(২)-শিক্ষক যখন অমানুষ
নাজনীন সীমন
২৮ বছরে আমরা ১৪(২)-শিক্ষক যখন অমানুষ ।
আমার একজন গৃহশিক্ষক ছিলেন; ‘ছিলেন’ না বলে আমি ‘ছিলো’ বলবো কারণ অমানুষদের ‘আপনি’ সম্বোধন করতে আমার তীব্র আপত্তি; তার চেয়ে বরং শুয়োর, কুকুর, বিড়াল, গাধা, হাতিকে আমি ‘আপনি’ বলে ডাকতে রাজী। আজ পর্যন্ত কোনো ভিক্ষুক, রিক্সা শ্রমিক বা মুদি দোকানীকে আমি ‘তুমি’ বলে ডাকিনি যদি না তারা বয়সে কিশোর বা সদ্য কৈশোরত্তীর্ণ হয়ে থাকে।
কিন্তু শিক্ষক হলেও এই লোককে আমি মানুষ হিসেবে গণ্য করি না তার আচরণের জন্য এবং যদিও খুব মারাত্নক কিছু ছিলো না কিন্তু যা আমার ভালো লাগেনি, ভালো লাগেনি। বলা বাহুল্য, সেই সময়ে সুযোগ দিলে কি করতে পারতো, সে সব চিন্তা করার মতো বয়স বা অভিজ্ঞতা কোনোটাই ছিলো না কিন্তু ঐ যে প্রথমেই পছন্দ হয়নি!
পরে বুঝেছি আমি যদি নিজে তাকে তাড়ানোর উদ্যোগ না নিতাম, তাহলে কি কি হতে পারতো এবং আমার কৈশোর পুরোপুরি তিক্ত ও অসহায় করে দিতে পারতো; মাথা শক্ত করে হয়তো কোনো দিনই দাঁড়াতে পারতাম না। না, তখনও আমি তসলিমা নাসরীন পড়িনি। নিজেকেই আমি নিজে ধন্যবাদ দেই অবাধ্য বা গোঁয়াড় হবার জন্য।
মাকে শুরু থেকেই বলেছিলাম এই স্যারের কাছে আমি পড়বো না, কিন্তু মা গ্রাহ্য করেননি। বলেছি পড়াতে পারে না, মা বলেছেন প্রত্যেকের পড়ানোর ধরন আলাদা; আমাকে শিক্ষার্থী হিসেবে সেখান থেকে শিখে নিতে হবে। ফলতঃ ‘ধর্মদণ্ড’ নিজের হাতে তুলে নেয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিলো না এবং প্রকাশ্যে কিছু করারও উপায় ছিলো না। আঙুল বাঁকাতেই হলো।
আমার একটি বিড়াল ছিলো তখন, ভীষণ আদুরে–পায়ে পায়ে ঘুরতো। প্রথম ক’দিনেই বুঝে গিয়েছিলাম স্যারের বিড়াল অপ্রীতি আছে। জীবজন্তুর সংস্পর্শে কারো অ্যালার্জি হতে পারে জানা ছিলো না সেই সময়। শুধু জানতাম গরুর মাংস, চিংড়ি, ইলিশ আর বেগুনে কারো কারো এ ধরনের সমস্যা হয়। স্যারের ঐ অপ্রীতি বা ভয়টাকেই কাজে লাগিয়েছিলাম–বিড়ালটাকে কোলে নিয়ে বসতাম এবং মাঝে মাঝেই “স্যার একটু ধরেন তো” বলে কোলে বসিয়ে দিতাম। আর নৃত্য কাকে বলে! ক’দিন বাদে নিয়ম করে দিলো বিড়াল আনা যাবে না পড়ার সময়; মনোযোগ নষ্ট হয়।
নতুন করে আঙুল আবার বাঁকালাম–বাসায় যে গৃহকর্মীটি ছিলো তাকে শিখিয়ে দিলাম এবং ইশারা পেলেই বিড়ালটি নিয়ে এসে “আপা একটু ধরেন তো” বলে আমার দিকে দেয়ার ভান করে ছুঁড়ে মারতো স্যারের দিকে আর উড়ন্ত সসারের মতো চার হাত পা চার দিকে ছড়িয়ে হাত পা নাচাতে নাচাতে স্যারের গায়ে আছড়ে পাছড়ে পড়তে পড়তে ম্যাঁও ম্যাঁও করে ডাকতো এবং স্যারও হাত পা নাচিয়ে তাণ্ডব নৃত্য করে ‘হেই হেই’ ‘হুস হুস’ ‘ঐ বিলাই, হরি যা’ ইত্যাদি বলতে থাকতো। কয়েক দিন রাগ করে পড়ানো ছেড়ে উঠে গিয়েছিলো।
মা জিজ্ঞেস করলে বলতাম স্যারের পেট খারাপ করেছে। বিড়ালের চুল বা লোম মানুষের পেটে গেলে পেট খারাপ হয় শুনেছি। বহুবার এই খাচ্চরের নাস্তায় সেটা মিশিয়ে দেবারও ব্যবস্থা করেছিলাম; চেটেপুটে সব খেয়েছে কিন্তু নধর শরীরে কিছু হয়নি। তার চায়ে মরিচ গুঁড়ো মিশিয়েছি বহুবার। একটু আহ উহ করতে করতে সেই চা ঠিক ঠিক চুকচুক করতে করতে গলাধঃকরণ করে ফেলতো। তবে যে গুলো বুঝতো তার জন্য আমাদের শাস্তি বরাদ্দ হতো।
সেই শাস্তি ছিলো স্যারের পকেটে থাকা শিশ কলম আমার, আমার ভাই এবং কখনও কখনও গৃহকর্মীটির দু’ আঙুলের মাঝে দিয়ে আঙুল চেপে কলমটিকে ঘোরানো। জানি না তদন্তের সময় পুলিশ কখনও এই কাজ করে কি না, তবে অত্যন্ত কষ্টদায়ক শাস্তি এটি। আর আর এক ধরনের শাস্তি দিতো এই স্যার; কানের পাশে চুলের অংশ বা জুলফি উপরের দিকে টেনে ধরতে। সে যে কি যন্ত্রণা, বলার মতো না। কলমের অত্যাচারে আমারও বুদ্ধি এলো নতুন। সোফার একই অংশে প্রতিদিন স্যার বসতো সেটা ছিলো দুই গদির মাঝখানের অংশ। আমিও তার মাঝে মুখ খুলে কলম রেখে দিতাম নীচে দড়ি দিয়ে কাঠের সাথে শক্ত করে বেঁধে। আর যায় কই! পশ্চাতদেশে ছিদ্র নিয়ে ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে এবং ডলতে ডলতে বেরিয়ে যেতো না পড়িয়েই। কয়েক দিন বাদে বাদে এটা করেছিলাম কয়েক বার। এবং শেষতক জামাল গোটা মানে সাদা ভেরেণ্ডা খাইয়েছিলাম চায়ের সাথে।
এই জিনিসের সাথে পরিচয় অবশ্য আমাকে এক গ্রাম সম্পর্কিত তুতো ভাই দিয়েছিলো এবং সে-ই যোগাড় করে দিয়েছিলো। তারকাদের সম্পর্কে একটি কথা প্রায়ই ব্যবহৃত হয়, “এরপর আর ফিরে তাকাতে হয়নি”। আমাকেও এরপর আর অপেক্ষা করতে হয়নি নতুন কোনো অত্যাচার আবিষ্কার করার জন্য। ওতেই কাজ হয়েছিলো; প্রায় দেড় সপ্তাহ বাথরুম আর বদনা থেকে বেচারা বিযুক্ত করতে পারেনি নিজেকে শুনেছিলাম; বেরোতে না বেরোতেই আবার ডাক দিতো এবং দৌড়ে বসতো। আসলে প্রথম বার তো! বুঝতে পারিনি মাত্রাটা কতোটুকু হওয়া দরকার ছিলো। জীবনে বহু বার এরপর জামাল গোটা ব্যবহার করেছি; তবে সে শুধু কাউকে স্বল্পকালীন পীড়া দিতে। মাত্রাজ্ঞান তখন কিন্ত টনটনে। কারণ এর জন্য মার খেয়েছি বহু। অতএব সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না এই পরিমাণ ব্যবহার করতাম।
সপ্তাহ তিন বাদে স্যার ফিরে এলো বেতন নিতে এবং বলতে আর পড়াবে না লক্ষীপুর চলে যাচ্ছে বলে। চোখ তখন কোটরে, গণ্ডারের মতো শরীরটা বেশ শুকনো। মাত্র ছ’মাসে ‘ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি’ দশা যাকে বলে। কিন্তু এতোটুকু কষ্ট হয়নি; এতো বছর পর আজ লিখতে গিয়েও আমার কোনো অনুশোচনা নেই এই ব্যাপারে, বরং আমি তৃপ্ত। এবং সাথে সাথে শিখেছি সন্তানের সাথে বন্ধুত্বসুলভ আচরণ হওয়া উচিৎ বাবা মায়ের যাতে সম্মানের জায়গাটা ঠিক থাকবে কিন্তু যে কোনো ব্যাপারে বাচ্চা তার মা বা বাবার কাছে নিৎসঙ্কোচে সব বলতে পারবে এবং অভিভাবকও মন দিয়ে শোনার মতো, বোঝার মতো সময় বের করবে।

আমি আমার শিক্ষার্থীদের সব সময় শেখাই পৃথিবীর কাউকে কোনো ভাবে, হোক সে শারীরিক বা মানসিক, সরাসরি বা আকারে ইঙ্গিতে খারাপ আচরণ বা হেনস্থা করার সুযোগ না দিতে, সরাসরি রুখে দাঁড়াতে এবং নির্ভরযোগ্য কাউকে জানাতে অপেক্ষা না করে। ‘একটু দেখি’, ‘যেমন ভাবছি তেমন নাও হতে পারে’, ‘হয়তো ভুল বুঝছি’ ইত্যাদি সব মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে এসব ক্ষেত্রে, বিশেষত সেটা যদি হয় যৌন হয়রানি। না, সরাসরি আমি তাদের শেখাই না। আমি শুধুমাত্র মেয়েদেরই বলি না কেননা আমি খুব ভালো করে জানি যৌন নিপীড়নের শিকার ছেলেরাও হয়–তুলনায় ঢের কম; তবে হয়। মেয়েদের মতো এরাও বলে না, কিন্তু হয়। মানুষের বেশীর ভাগ গালাগালই বোধ হয় শরীরকেন্দ্রিক। ঠাট্টাচ্ছলে আমরা যেসব গথা বলি তাতেও লিঙ্গ নির্বিশেষে অন্যের অবচেতন মনে গভীর আঁচড় পড়তে পারে। আর তা যদি কাউকে বিব্রত করে তবে তার প্রতিবাদ সরাসরিই হওয়া উচিৎ এবং সাথে সাথে।

এই শিশ কলম বা বলপেনের যুগ চলছে বহু কাল ধরে। কতো দিন ঝর্ণা কলমে লিখিনি! এখন লিখতে গেলেও অস্বস্তি হবে হয়তো। বহুকাল ধরে কম্পিউটার এবং শিশ কলমের মিশ্রণে কাজ চালিয়েছি। মহামারী বিশবিশ এসে পুরোপুরি কম্পিউটার নির্ভর করে দিয়েছে সব কিছু। হাতে লেখার খুব একটা অবকাশ নেই এখন।
ভাবি, সময় ঝর্ণা কলম কেড়ে নিয়ে শিশ কলম তুলে দিয়েছে হাতে। এবার হয়তো সেটাও বিগত হবার পথে। করোনা চলে যাবে, কিন্তু যে কাগজবিহীন শিক্ষাপদ্ধতিতে অভ্যস্ত হচ্ছি আমরা বা হয়ে গেছি ইতোমধ্যে, তার থেকে কি আবার বেরিয়ে আসতে পারবো? না কি মাউস সিন্ড্রোম, শোল্ডার সিন্ড্রোম রোগে নতুন প্রজন্ম সহ নিজেরা আক্রান্ত হয়ে কেবল প্রযুক্তি নির্ভর এক পৃথিবীর দিকে এগুচ্ছি আমরা যেখানে বাচ্চাদের আর হাতে লেখার দরকার হবে না, বানান না শিখলেও চলবে তাদের; গুগল ভয়েস করে দেবে সব? আর অটো কারেক্ট বা বানান ঠিক করার উপায় তো আছেই।
জানি না সঠিক। তবে নিজের জীবনকালেই এতো বড়ো পরিবর্তন দেখবো, কল্পনাও করিনি। কেবল বিস্মিত হই আর ফেলে আসা সময়ের জন্য দীর্ঘশ্বাস মিলিয়ে দেই বাতাসে।
নাজনীন সীমন, প্রবাসী লেখক। 

1 thought on “২৮ বছরে আমরা ১৪(২)-শিক্ষক যখন অমানুষ

Comments are closed.