২৮ বছরে আমরা ১৪ (১)

২৮ বছরে আমরা ১৪ (১) :নাজনীন সীমন

কলাম ও ফিচার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

২৮ বছরে আমরা ১৪ (১)

নাজনীন সীমন।।  ২৮ বছরে আমরা ১৪ (১)
দোয়াত কলমের আরো যে কতো গল্প আছে আমার জীবনের সাথে জড়িয়ে! পরীক্ষা দিতে যাবার আগে সব কলমে মানে অন্তত দু’ তিনটেতে কালি ভরার পরও মনে হতো যদি লিখতে লিখতে শেষ হয়ে যায়। অতঃপর দোয়াত বয়ে নিয়ে যেতাম স্কুলে। একবার, তখন অষ্টম শ্রেণীতে পড়ি; পরীক্ষা চলছে; ‘৮৮ সাল। খুব মনে আছে দোতলায় আমাদের সিট পড়েছিলো। পরীক্ষা শেষ।

আমাদের এক বন্ধু বললো আমার কালির দোয়াত খুলে তার জামার উপর ফেলে দিতে। কি আজব ব্যাপার! কয়েক বার করে জিজ্ঞেস করে জানলাম আকস্মিক ঋতুস্রাবের কারণে তার জামায় দাগ লেগে গিয়েছে। এ অবস্থায় বাড়ি ফেরা অত্যন্ত লজ্জাকর। কি আর করা! সদ্য সদ্য নীল কালি কিনে এনেছিলেন বাবা; সাধারণত কালো আনেন; এবার বদলে নীল। সেটাই পুরোটা ঢেলে দিলাম ওর জামায় আর বেঞ্চের উপরে। তারপর মাথার স্কার্ফ কোমরে পেঁচিয়ে ওকে রিক্সায় তুলে দিয়ে নিজে হেঁটে ফিরেছিলাম বাসায় অন্য এক বন্ধুর সাথে। এবং যথারীতি বাড়ি ঢোকার সময় নিজের হৃৎপিণ্ডের শব্দ নিজেই শুনতে পাচ্ছিলাম। মনে আছে সে রাতে পরের দিনের পরীক্ষার জন্য কাকার দোয়াত থেকে কলমে কালি ভরেছিলাম।

স্কুলে এতো জন নারী শিক্ষক ছিলেন, অথচ কারো কাছে আমরা যেতে পারিনি কেননা আমাদের শেখানো হয়েছে এসব খুবই লজ্জার ব্যাপার, গোপন রাখতে হয়। সেটিও ঠিক আছে কারণ ব্যক্তিগত ব্যাপার গোপন থাকাই সমীচীন। কিন্তু এই যে একটি দুর্ঘটনা যা যখন তখন যে কোনো মেয়ের ক্ষেত্রেই হতে পারে, তার জন্য তাকে হাসিঠাট্রার পাত্রী হতে হবে, ছেলেরা দেখে ইঙ্গিতপূর্ণ নোংরা কথা বলবে বা অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করবে এবং সে সব সম্ভাবনার ভয়ে একটি মেয়েকে কাঁচুমাচু হয়ে থাকতে হবে, এর থেকে বাঁচার উপায় খুঁজতে হবে–এসব অগ্রহণীয় এবং এসব ঘটে অশিক্ষা থেকে। আজ সে সব কথা মনে হতেই শিউরে উঠছি।

কতো ঝামেলার মধ্য দিয়ে মেয়েদের দিন কাটাতে হয়েছে একটা সময় এবং এখনও এই একবিংশ শতাব্দীতেও স্যানিটারী ন্যাপকিনের মতো একটি প্রয়োজনীয় জিনিস না আছে সবার হাতে, না ঋতুস্রাব সম্পর্কে এখনও সঠিক শিক্ষা দেয়া হয় বা লজ্জা সঙ্কোচ সরিয়ে সরাসরি মেয়েরা বলতে পারে তাদের সমস্যার কথা! ঋতুস্রাব একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং বংশ বৃদ্ধি অব্যাহত রাখতে অনিবার্য। অথচ এ সম্পর্কে ছেলে সন্তানদের এ শিক্ষা দেয়া হয় না যে এটা নিয়ে হাস্য তামাশার কোনো কারণ নেই।

অবশ্য নানা ধর্মগ্রন্থে দেখা যায় এটিকে নারীর গভীর ক্ষত, রোগ, পাপের ফল ইত্যাদি হিসেবে উল্লেখ করে এ সময় অতিক্রান্ত কালকে অশূচি বলে গণ্য করা হয়। পরিস্থিতি বদলেছে ব্যাপক, সন্দেহ নেই। কিন্তু এখনও ততোটা নয় যতোটা দরকার। অফিস আদালতে শৌচাগারের যে অবস্থা তা অবর্ণনীয়। পথে ঘাটে তো দূরের কথা দূর যাত্রাপথেও বেশীর ভাগ সময় তেমন সুযোগ নেই। আর ফেরীতে গেলে তো কথাই নেই। সে যে করুণ অবস্থা এবং তার যে লাইন এবং সাবান ছাড়া শৌচাগার–নিজের চোখকেও বিশ্বাস করা যায় না। ফলে মেয়েদের অনেকেই বাইরে থাকাকালীন শৌচাগার ব্যবহার থেকে বিরত থাকার বা সেটা সীমিত করার চেষ্টা করে মূত্র নালীর প্রদাহজনিত নানা রোগে প্রায়শই ভোগে।

আজকাল শপিং মল সহ বিভিন্ন জায়গায় এই পরিষেবা চালু হয়েছে; তবে মানুষ হিসেবে আমরাও তো খুব একটা সুবিধার না বরং বেশ স্বার্থপর এবং নোংরা প্রকৃতির–ভিতরে এবং বাইরে–সঠিক ব্যবহার করতে জানি না অনেক কিছুরই বা জানলেও করি না নিজেদের ঘরের জিনিস নয় বলে হয়তো। ফলত সে সব জায়গাও খুব একটা যে ব্যবহারযোগ্য থাকে সারা দিন ধরে, তাও বলা যাবে না। ভোঁটকা গন্ধ, চারপাশে প্রস্রাব-পানি মিলেমিশে একাকার মেঝেতে পাড়া দিয়েই এখনও বেশীর ভাগ জায়গায় মূত্র ত্যাগ করতে হয়।

কলমের কথায় কতো কথাই না চলে এলো ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়ার মতো। আসলে আমাদের জীবনে ঘটনাগুলো একই তারে বাঁধা থাকে তো, একটাতে টান পড়লে অন্যগুলো আপনিতেই টুংটাং বেজে ওঠে। অষ্টম শ্রেণীতে পড়াকালীন, যদি কোনো ভুল না করে থাকি, জীবনে প্রথম বলপয়েন্ট পেন বা বলপেন দেখেছিলালাম। সে আর এব মাত্রার বিস্ময়। ভাবা যায়! কালি ভরতে হবে না, কলম ধুতে হবে না, কলমে কালি ভরাই থাকবে। আর লেখাও হবে দ্রুত। কিন্তু অতো সুখ কি কপালে সহ্য হয় সবার! বাবার কড়া নির্দেশ শিশ কলমে, কে বাংলাটা করেছিলো জানা নেই, লেখা চলবে না কারণ তাতে হাতের লেখা নষ্ট হয়ে যায়।

ভাবি, কোত্থেকে যে বাবা মায়েরা এতো তত্ত্ব বের করে সমস্ত ‘খারাপ’ থেকে সন্তানদের রক্ষা করার জন্য! এটা কেবল বাবা মায়েরই অভ্যেস, সেটা বলা যাবে না কেননা নতুন কিছু, তা যা-ই হোক না কেনো সাধারণত মানুষ প্রথমে অস্বস্তি বোধ করে অজানা বলেই; তারপর কৌতূহল দমন করতে চেষ্টা করে দেখে। অতএব বলাই বাহুল্য, দশম শ্রেণী পার হয়ে কলেজে ঢোকার আগ পর্যন্ত আমাকে ঝর্ণা কলমেই লিখতে হয়েছিলো। খুব দুঃখ ছিলো মনে; মনে হতো বন্ধুরা কতো স্বাধীন! কি সুন্দর করে শিশ কলমে লিখছে। চাইলে দোকান থেকে কেনাই যেতো কেননা তখন কলোনীর সাথের লাগোয়া দোকানে এই কলম বিক্রি শুরু করেছিলো।

সম্ভবত তিন টাকা করেই দাম ছিলো। ইকোনো বল পেন। কিছুদিনের মধ্যে বের হলো হাত সমান বা তারও চেয়ে লম্বা শিশ কলম। বাবা দুটো কিনে এনেছিলেন দুই ভাইবোনের জন্য। যেহেতু লিখতে পারবো না, ওটা দিয়ে আমরা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলতাম। এই কলমের অবশ্য ঝামেলা ছিলো ব্যাপক। কালি হঠাৎই বন্ধ হয়ে যেতো লিখতে লিখতে, তারপর থার্মোমিটার ঝাঁকানোর মতো ক্রমাগত ঝাঁকুনিতে কাজ হলো তো ভালো, নইলে মুখে দিয়ে ফুঁ দিয়ে, নিঃশ্বাস টেনে–কতো ভাবে চেষ্টা করতাম সেটাকে সচল করতে। বহুবার নিঃশ্বাস টানার সাথে খাবলা করে কালি ঢুকে গিয়েছে মুখে।

সে যে কি বিদকুটে তেতো স্বাদ। আর এমন আঠালো যে একবার কোথাও লাগলে সহজে উঠতো না। যাদেরকে শত্রু শ্রেণীর মনে করতাম আমরা, মানে দুই ভাই বোন যাদের অপছন্দ করতাম, তাদের কাপড়ে এই কালি লাগিয়ে দিতাম যৌথ উদ্যোগে এবং কখনও ধরা না পড়েই। এমনকি চায়ের কাপে চুমুক দেবার জায়গায়ও লাগিয়ে দিয়েছি অনেকবার যাতে করে ঠোঁটে ঠেসে যেতো চিটচিটে আঠালো ঐ কালি। তারপর মুখ দেখে খুব অবাক হয়ে নিরপরাধ ভঙ্গিতে বলতাম, আপনার ঠোঁটে যেনো কি লেগেছে! বাকীটুকু মহাকাব্য। ভিজিট করুন

২৮ বছরে আমরা-১৩

1 thought on “২৮ বছরে আমরা ১৪ (১) :নাজনীন সীমন

Comments are closed.