২৮ বছরে আমরা-১৫(২)

২৮ বছরে আমরা-১৫(২)

কলাম ও ফিচার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
২৮ বছরে আমরা-১৫(২)
নাজনীন সীমন।।  ২৮ বছরে আমরা-১৫(২)
বলতেই হয়, এই বাড়ির মাত্র চারটি ঘটনা আমার মনে দাগ কেটে আছে, আমি চোখ বুজলেই স্পষ্ট দেখতে পাই সব, কানে শুনতে পাই কথাগুলো। আর সব খুব আবছা, কণ্ঠস্বর যেনো ভেসে আসে বহুদূর থেকে একসাথে অনেকের। তারপর কেমন যেনো ঘূর্ণির মধ্যে সব মিলেমিশে অন্য একটা শব্দ আসে–একটার উপর অন্যটা আবার তার উপর ভিন্ন একটা হুটোপাটি খায় যেখানে আর কারো কণ্ঠই আমি আলাদা করে চিনতে পারি না। এই যে কাঁঠাল গাছ ও আমার ‘প্রখর বুদ্ধিমতি হয়ে উঠবার সম্ভাবনার গল্প–এর এক কণাও আমার কিন্তু মনে নেই। সবই বারবার শুনে শুনে বলা। কিন্তু মার খাওয়ার ঘটনাটি এখনও জ্বলজ্বল করছে।
তেমনি আর একটি ঘটনার কথা স্পষ্ট মনে আছে যদিও প্রতিটি জিনিস খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বলতে পারবো না। আমার এক দাদা এসেছেন বেড়াতে; সম্ভবত অফিসের কাজে এসেছিলেন চট্টগ্রামে। যাবার আগে রথ দেখার সাথে সাথে কলাটাও বেচে নেয়া আর কি! হয়তো বেলা এগারোটার মতো হবে। ছোটো চাচা আর আমকে মা ছাতু মেখে দিয়েছেন খেতে। এমন সময় বাবার মামা, আমার দাদা, ঘরে এসে টিপ্পনি কেটে বললেন হবি শিকদারের বড়ো ছেলের এমন খারাপ দশা হয়েছে যে তার পরিবারকে ছাতু খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে! হবি শিকদার, আমার দাদা, আমার বাবার বাবা, যিনি ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের রেঞ্জার ছিলেন, যার সহায় সম্পত্তি প্রতিপত্তি নেহায়েত কম ছিলো না, যিনি বারোখানা সন্তানের জন্মে সরাসরি ভূমিকা রেখে টপাত করে একদিন মরে গেলেন তাদের সব ব্যবস্থা না করেই, যার অসচেতনতা বা সারল্য বা বোকামোর–কোনটা বলতে পারবো না সঠিক, সুযোগ নিয়ে অনেকেই লুটেপুটে খেয়েছেন অনেক কিছু–তাঁর নিজের ছেলে এবং নাতনীকে ছাতুর মতো জিনিস খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে এটা নিঃসন্দেহে একটা খবরই ছিলো।
সেটা আমার অতো কিছু বোঝার বয়স ছিলো না একেবারেই; কিন্তু কথাগুলো কানে লেগে আছে এবং পরবর্তীতে পারিবারিক বহু আলোচনায় যখন এই কথা বারবার উঠে এসেছে, ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছি স্বাস্থ্যকর কি পুষ্টিকর কিছু আসে যায় না যদি না সেটা তথাকথিত সভ্য সমাজ কর্তৃক গ্রহণীয় হয় যেমনটা ডালের ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি। একটা সময় ছিলো যখন ডালকে গরীবের প্রোটিন ধরা হতো। ডাল দিয়ে ভাত খাওয়া মানে ছিলো চরম অর্থনৈতিক সঙ্কটে পড়া। এখনও আমরা অষ্ট ব্যঞ্জনের দ্বিগুণ পদ দিয়ে আপ্যায়নের ব্যবস্থা করে ঠোঁটে গর্বিত-বিগলিত হাসি মাখামাখি করে বলি, গরীবের বাড়িতে দুটো ডালভাত খাবেন আর কি কষ্ট করে! সময়ে সেই ডাল হয়ে ওঠে অভিজাত খাবার। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ভারতীয় রেস্টুরেন্টেও এই ডালই সাদা কালো চামড়ার লোকেরা চুক চুক করে খেয়ে নেয় উঁহু আহা করতে করতে স্যুপ বলে। একবার মোটামুটি ব্যয়বহুল এক ভারতীয় রেঁস্তোরায় গিয়েছি খেতে। বাঙালী হিসেবে আমার আবার স্যুপের প্রতি একটু বাড়াবাড়ি রকমের ভালোবাসা আছে।
প্রথম ধাপের খাবারে বললাম তাদের ‘স্পেশাল ডেলিকেসি লেন্টেল স্যুপ’ এর কথা; সাথে ভেজ পাকোড়া। প্রথম চুমুকেই বিস্ময়ের বেদম ধাক্কা! নড়াইলে জন্ম নেয়া, চট্টগ্রামে বেড়ে ওঠা, ঢাকার বাতাসে দম নেয়া মেয়েটি তখনও লেন্টেল মানে যে ডাল, জেনে ওঠেনি। বেসন দিয়ে বাঁধাকপি ও গাজরের বড়া খেয়ে হতাশের উপর হতাশ। মায়ের হাতে কতো এর তার বড়া খেয়েছি! শেষতক ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুই পায়ে দাঁড়িয়ে থেকে অতি কষ্টে অর্জিত সামান্য পয়সার এহেন অপব্যয়ে চোখ-মুখ-কান সব তেতে উঠলো। দামী রেঁস্তোরায় বসে ডাল আর বড়া খেতে খেতে নিজের নির্বুদ্ধিতার চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করেছিলাম সেদিন। মনে পড়ে গিয়েছিলো সেই গল্পের কথা: শালার বয়জা, তুমি শহরে আইসা হইছো মামলেট! …তবে এখানেও মনে হয় সময় না নেয়াটাই কারণ ছিলো। আমি একেবারেই সময় নেইনি জানতে খাবারগুলো কি দিয়ে তৈরী। ফলে ভুল বুঝে শাস্তি পেয়েছিলাম। কিন্তু আমার দাদার ঐ কথাগুলো যে বাবা মা দু’জনকেই ছোটো করার জন্য এটা আমার কখনোই মনে হয়নি ভুল বুঝেছি। মানুষ মাত্রই কাজের বা আচরণের একটা বিশেষ ধরন বা প্যাটার্ন থাকে যার বাইরে আমরা বেরোতে পারি না। একটু মনোযোগ দিলেই বোঝা যায় কোনটা আকস্মিক, কোনটা ইচ্ছেকৃত, কোনটা সহমর্মীতা আর কোনটা খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে রক্ত বের করার জন্য। আমি জানি না, কখনও জানতে চাইনি সেই সময়টা কি অর্থের অভাব ছিলো কিনা।
একজন সরকারী চাকুরীজীবীর কতোটুকু অভাব থাকতে পারে যাতে করে পরিবারকে ঠিকমতো খাবার দিতে অক্ষম হয়, সেটাও জানতে চাইনি। আর যাই হোক না কেনো, সেই অর্থে অভাব আমরা দেখিনি বা থেকে থাকলেও আমাদের চোখ থেকে সেটি হয়তো বাবা মা দু’জনে আড়াল করেছেন। আর যদি থেকেও থাকে আমি গর্বিত যে না আমার বাবা, না আমার মা গ্রামের বাড়ির পৈতৃক সম্পত্তি থেকে কিছু এনেছেন কোনো দিনও। তাঁদের নিজেদের অর্জিত অর্থে আমাদের মানুষ করেছেন; কখনও কাঙালীপনা করেননি কিংবা অধিকার ফলাতে যাননি অথবা লোভী হননি। এ প্রসঙ্গে বলতেই হয় আমার কোনো চাচা, ফুফু, খালাকেই সেটি কখনও করতে দেখিনি যদিও এটি প্রত্যেকের ন্যায়সঙ্গত অধিকার। বরং সবাইকেই দেখেছি গ্রামে যাঁরা আছেন তাঁদের প্রতি মনোযোগী হতে। তবে এখনও অবাক হই ভেবে যে গ্রাম থেকে মানে বাবার বাড়ি থেকে কোনো কালে কোনো একটি শষ্যদানা, একটা নারকেল, কিংবা কোনো একটা কিছু আমাদের জন্য কখনও আসেনি ভেবে। অথচ এটা পারষ্পরিক ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধেরই পরিচায়ক।
হলফ করে বলতে পারবো না অন্য কারো বাড়িতে গিয়েছে কিনা; তবে আমার দাদার বড়ো সন্তান, আমার বাবার জন্য বা তাঁর সবচেয়ে ছোটো সন্তান আমার ছোটো চাচার জন্য অথবা বাবার পরিবারের জন্য কখনও কিছু এসে পোঁছায়নি গ্রাম থেকে। এখানে কি ভুল বোঝার কোনো অবকাশ আছে? বহুবার ভেবেছি, আজও ভাবি এবং এই মহুুর্তেও ভাবছি আমি ভুল বুঝছি কি তাদের যারা কখনও এসব ব্যাপারে হাত উপুড় করেননি, না আমি লোভী যে ছোটোখাটো ব্যাপারেও ভাগ ছাড়তে চাই না? নিশ্চয়ই সেভাবেও ভাববার অবকাশ আছে। কিন্তু এই যে ছোটো ছোটো ব্যাপারগুলো, এসবই কি মানুষের মধ্যে বন্ধুন দৃঢ় করে না? এসবই কি মানুষকে একসূত্রে বেঁধে রাখে না? এটা অধিকারের ব্যাপার নয়, খাওয়ারও নয়, বা অন্য কিছুরও নয়; এটা কেবল আত্নার সাথে আত্নার স্পর্শ লাগা, আকস্মিক স্পর্শে তড়িৎ সঞ্চালনে কেঁপে ওঠার মতো কিন্তু সেটা মন প্রাণ অপার্থিব আনন্দে ভরিয়ে তোলে কেবল। বেঁচে থাকার জন্য এহেন ছোটো ছোটো আনন্দ খুব দরকার মানুষের। এসব নানা কারণে তিক্ত হৃদয় প্রফুল্ল হয়, কৃতজ্ঞতা বোধ জন্মে, একাকীত্ব ও বিরস ভাব কেটে যায়, কাছের মানুষগুলো আরও কাছের হয়ে ওঠে।
যাঁর বা যাঁদের কথা বলছি তিনি বা তাঁরা যে কৃপণ তা কিন্তু একেবারেই নয়; বরং তার উল্টো। দরাজ হাত তো বটেই, যথেষ্ট স্নেহপ্রবণও। আমি অন্তত ভালোবাসা পেয়েছি অনেক। তাই মাঝে মাঝে মনে হয়, হয়তো তাঁরা কখনো মাথায়ই আনেননি এসব। অথবা কখনও মাথাতেই আসেনি কারো এসব করা দরকার পরিবারের সকলের জন্য। অথবা ভেবেছেন এই ছোটোখাটো জিনিস দিয়ে কি হবে! অনেক রকম যুক্তি দাঁড় করাই প্রশ্নগুলোর একটা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা তৈরী করতে। কিন্তু সঠিক সিদ্ধান্তে আসতে পারি না, যদিও ব্যাপারগুলো আমার বুঝতে খুব ইচ্ছে করে। তখন অবশ্য ইংরেজীতে যাকে বলে জাক্সটাপজিশন, তেমন ভিন্ন চিত্র দেখতে পাই কারো কারো ক্ষেত্রে এবং মনে হয় এটা ছিলো ইচ্ছেকৃত উদাসীনতা এবং অসংখ্য ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মনে হয় আমি কোনো ভুল করছি না, ভুল বুঝছি না। কেউ যদি বুঝিয়ে দিতো একবার! ভিজিট করুন

1 thought on “২৮ বছরে আমরা-১৫(২)

Comments are closed.