২৮ বছরে আমরা-১৫ (১)

২৮ বছরে আমরা-১৫ (১)

সাহিত্য কলাম ও ফিচার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
২৮ বছরে আমরা-১৫ (১)
২৮ বছরে আমরা-১৫ (১)
নাজনীন সীমন।।  কথায় বলে যে দিন যায়, ভালো দিন যায়। কাটিয়ে আসা সময় প্রত্যেকের কাছেই অনন্য। এটা ঠিক নিজের জীবন নয়, বরং জীবনকে ধারণ করে যাপন করতে দেয়া সময়টুকু যা আমাদের প্রত্যেকের জন্যই স্বতন্ত্র। তাই আমাদের পূর্ব প্রজন্মের অনেক কিছু না থাকা সত্ত্বেও তাদের সময়টা তাদের জন্য শ্রেষ্ঠ, ঠিক যেমনি পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তাদেরটা এবং সঙ্গত কারণেই আমাদের সময়টা আমাদের জন্য শ্রেষ্ঠ। মুরুব্বীদের বহুবার বলতে শুনেছি, “আমাদের সময়ে…”। এখন আমিও বলি একই কথা। সেই কম্পিউটার-সেলফোন-হরেক রকমের গেইমস-ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপ-স্কাইপহীন সময়ও ভালো মনে হয় এখনকার থেকে যদিও এসবের সবই যেনো দরকার এই আমার। প্রশ্ন জাগে, আমি, আমরা তো দিব্যি এখানে রয়েছি। তাহলে এই সময়টা কেনো আমার বা আমাদের নয়? আমাদের সময় বলতে কেনো সেই শৈশব, কৈশোর আর তারুণ্যের দিনগুলোই মাথায় রাখি আমরা? নিশ্চয়ই কোনো একটা ব্যাখ্যা রয়েছে এর; নইলে বেশীর বিদ্যুতের দিনমান লুকোচুরি, গরমে ঘেমে নেয়ে একাকার হওয়া, মশার প্রায় উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া, দিনের পর দিন জলের জন্য সংগ্রাম করা দিনগুলো কেনো ক্রমেই প্রিয়তম হয়ে উঠবে, মগজে কেনো ফিরে যাওয়ার তাড়না হাতুড়ি পেটাবে?
আমিও ফিরে যেতে চাই আমার ছোটোবেলায়। চট্টগ্রামে আসার আগ পর্যন্ত আমি বাবা মায়ের সাথে আর যে সব জায়গায় থেকেছি, তার কিছুই মনে নেই। শৈশব মানেই আমার কাছে চট্টগ্রাম। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময় এখানে; আমার বেড়ে ওঠার সাক্ষী এই চট্টগ্রাম। ফলতঃ অনেক সুন্দর, ছিমছাম শহর বা জায়গা দেখার সুযোগ হলেও চট্টগ্রামের স্থান আর কোনো জায়গা এখনও করে নিতে পারেনি আমার কাছে, এমনকি হালের উন্নয়ন হওয়া বন্দর নগরীও না; বরং আমার মনে হয় ইট পাথর কালো ধোঁয়া নির্গত মানুষে ঠাসাঠাসি করা এই শহর আমার ফেলে আসা স্মৃতির শহর থেকে ঢের আলাদা, অনেক বেশী সুন্দর ও মায়াঘেরা। সুদীর্ঘ সময় পার করে তাই যখন সুযোগ হলো সত্তার সাথে অঙ্গাঙ্গি জড়িয়ে থাকা শহরে ফিরে যাবার, ভীষণ জোরে একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম। এতোটাও বদলাতে পারে কোনো কিছু! প্রতি পদে স্মৃতি যেনো বিদ্রোহ করছিলো বর্তমানের সাথে। আমি হাতড়ে মরছি পুরনো সৌন্দর্য যখন, পরিবর্তন তখন তাতে জোরে জোরে ধাক্কা দিয়ে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে আমাধারণ র করা সময়ের ছবি। অথচ এতোটা অবাক হবার কথা ছিলো না আমার কারণ এর আগে থেকে আমি দেখতে শুরু করেছি চেনা মানুষদের বদলে যাওয়া। শুধু তাই কেনো, মানুষ যে পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রাণী, তাও বুঝতে শুরু করেছি বেশ আগে থেকে। কখনও নখে, কখনও দাঁতে, কখনও জিহ্বা দিয়ে অনবরত রক্তাক্ত করাই তার কাজ। আর তার সীমানার মধ্যে কেউ ঢুকে পড়লে তো কথাই নেই; কতোটা হিংস্র হয়ে উঠতে পারে সে যে তারকাঁটা অতিক্রম করেছে, সে-ই জানে ঠিকঠাক। এমন কতো শত কষ্টের ফোঁড় প্রতিটি মানুষের জীবনে আছে, ইয়ত্তা নেই। অনেক সময় বোঝার ভুলেও বা বোঝানোর ভুলেও কষ্ট পাই আমরা। প্রায়ই আমি ভাবতে বসি কতোটুকু ভুল বুঝলাম কাউকে, যা বুঝেছি তার পুরোটাই ভুল কি না।
যেমন খুব ছোটোবেলায়, সবে তখন আমরা চট্টগ্রাম এসেছি; মা বাবার প্রায় নতুন সংসার… চারজনের সংসার–মা, বাবা, ছোটো কাকা আর আমি। এসেই প্রথম যে কোথায় ছিলাম সঠিক বলতে পারবো না কারণ তখন আমি ছোটো; ছোটো মানে খুবই ছোটো। এরপর আমার এক মামা, তখন ম্যাজিস্ট্রেট, সবে বিয়ে করেছেন। বিশাল বাসা তাঁর হেমসেন লেইনে। মামীকে একা রাখতে মামা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন না কিংবা মামী ভয় পান অথবা এর দুটোই মিলে হবে মামা নাকি অনেক বুঝিয়ে মাকে রাজী করিয়েছিলেন ওনাদের সাথে থাকতে। একটা ইংরেজী ‘এল’ অক্ষরের মতো একতলা বাড়ি ছিলো সেটা; সামনে বড়ো উঠোন যেখানে কাঁঠাল গাছসহ আরও কিছু গাছ ছিলো। মামা, মায়ের চাচাতো ভাই, ভীষণ স্নেহ করতেন। ওনার আহ্লাদ প্রকাশের একটি ভঙ্গি ছিলো গাল ধরে টেনে দেয়া। মাঝে মাঝে মনে হয়, ভ্যাগ্যিস ওখান থেকে আবার নিজেদের বাসায় এসে উঠেছিলাম; নইলে আমার মুখ আর মুখ থাকতো না মামার আদরে! মামীকে সেই বয়সে দেখেও যেমন মুগ্ধ হতাম, এখনও ঠিক ততোটাই মুগ্ধতা রয়ে গেছে ওনার প্রতি। কিছু কিছু মানুষের হাঁটা চলা বলা সবই যেনো কলা মানে শিল্পকলা। মামীও যেনো ঠিক তাই–চাঁদপানা মুখ, চমৎকার মিষ্টি সাদা গাত্রবর্ণ, উচ্চতাও তেমনি; সব সময় পরিপাটি করে শাড়ি পরা। তখনও আমাদের ঘরে সকালের নাস্তায় রুটির প্রচলন হয়নি। মামীর বাবা ছিলেন বিচারক; হয়তো ওনাদের বাড়িতে রুটি খেতো সকাল বেলা টিভিতে যেমনটা দেখি আমরা এবং ভাবি পাওরুটিতে জেলি মিশিয়ে খাওয়াই ভদ্র ও বড়োলোকের লক্ষণ; সাথে সিদ্ধ বা পোঁচ ডিম আর ঝুড়িতে কলা, আপেল, কমলা বা আঙুর। অবশ্য কলা ছাড়া অন্য সবগুলোই অর্থবানদের খাবার, অন্তত ছিলো সে সময়ে–এতে সন্দেহ নেই। তো সকাল বেলা মামা অফিস যাবেন, নাস্তা সারছেন। আমি ঘরের বাইরে বিশাল বারান্দায় ঐ ঘরের সাথেই লাগোয়া একটি কাঠের টেবিলে বসে খেলছিলাম। জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে মামা এক টুকরো রুটিতে বরবটি ভাজি নিয়ে আমার মুখে পুরে দিলেন। ঠিক ঐ সময়েই মাকে যেনো যেতেই হলো ঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরের দিকে। আর যাই কোথায়! ধরে এনে ঘরের দরজা বন্ধ করে এমন মারটা মারলেন! কোনো কারণে তিনি ধরে নিয়েছিলেন আমি খেতে চেয়েছি হয়তো এবং এই চাওয়ার অভ্যেস যেনো কখনও না হয়, অন্যের জিনিস দেখে যেনো পাওয়ার বাসনা না হয়, মা ছোটোকাল থেকে শিখিয়েছিলেন মন্ত্রপড়ার মতো করে কিন্তু তার প্রথম ধাপটা ছিলো আমার মনে থাকার হিসেবে এই পিটুনী। অথচ মায়ের চেনা উচিৎ ছিলো মেয়েকে। যে জীবনের বেশীর ভাগ সময় মার খেয়েছে না খাওয়ার জন্য, খাবার মুখের একপাশে মিনিটের পর মিনিট রেখে দেয়ার জন্য, সে কেনো খাবার চেয়ে খাবে? কিন্তু, ঐ যে বললাম বোঝার ভুল। আমরা খুব বেশী সময় নেই না দেখা বা শোনা থেকে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার আগে ব্যাপারটা বোঝার জন্য–সে জটিল বা সহজ বিষয়ই হোক, চেনা বা অচেনা মানুষই হোক।
এই বাড়িটিতে যখন আমরা থাকতাম, তখনও স্কুলে যাওয়া শুরু করিনি। কিন্তু মামা ধরে নিয়েছিলেন আমি খুব বড়ো হবো জীবনে; প্রচণ্ড শিক্ষিত হবো। কারণটা ছিলো খুব ছোটো। একদিন আমি খেলছিলাম। তখন তো আর এখনকার মতো এতো এতো খেলনা ছিলো না! উঠোনে হয়তো পাখিদের খাবার দিয়ে বা উঠোনের মাটিতে আঁকিবুকি বা পিঁপড়া নিয়ে খেলছিলাম–কিছু একটা হবে। পিঁপড়া নিয়ে খেলা নাকি আমার এ সময় থেকেই শুরু। কৌটা থেকে চিনি এনে তাদের খেতে দিতাম। বলে রাখা ভালো জীবনের অর্ধেকের বেশী বয়স পেরিয়ে গেলেও পিঁপড়ার এই সার বেঁধে চলা, অতোটুকু শরীর নিয়ে খাবার সংগ্রহ করে তা বয়ে নেয়া, পথ ভুল না করা–আমাকে ছোটোবেলার মতোই আপ্লুত করে এবং এখনও খাবার দিতে ভালো লাগে। কখনও সখনও লবণ বা চিনির সাথে মরিচের গুঁড়ো মিশেয়েও পরীক্ষা করার চেষ্টা করেছি কি করে ওরা এবং দেখেছি দুটোই সাদা বলে নিত্যদিন ব্যবহার করার পরও মানুষ চিনি ও লবণ গুলিয়ে ফেললেও পিঁপড়ে তা কখনোই করে না। মানুষ মানুষ চেনে না মুখোশ পরার কারণে, কিন্তু পিঁপড়ের কোনো মুখোশ নেই। মানুষ মানুষকে কামড়ায়, আঁচড়ায়, বুকে ছুরি মারে, পিঠে ছুরি মারে, বিপদে ফেলে পালিয়ে যায়, মিথ্যে বলে, সুবিধা খোঁজে। পিঁপড়েরা এসবের কিছুই করে না। যাই হোক, হঠাৎ নাকি কাঁঠাল গাছের কাছে দৌড়ে গিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে গাছটা দেখেছিলাম খানিকক্ষণ। গাছটিতে তখন অনেকগুলো কাঁঠাল ঝুলছে। তারপর দৌড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম সব গাছের ফল তো উপরে হয়, কাঁঠাল কেনো নীচে ধরে! ব্যস, মামা লুফে নিলেন সেটা। এই বয়সে যে এমন প্রশ্ন করতে পারে, সে বুদ্ধির হাঁড়ি না হয়ে পারেই না! কতো কতোবার যে শুনেছি এই গল্প এবং বলতেই হয়, বেশ একটা আনন্দের বাতাস দোলা দিয়ে যায়। তবে সে দোলা বেশী দূর না এগিয়ে থমকে পড়ে যখনই বাস্তব আমার কথা মনে পড়ে যায়। মা চেয়েছিলেন ডাক্তার হই ও গান শিখি। একটাও হয়নি। বাবা স্বপ্ন দেখতেন বড়ো একজন সরকারী কর্মকর্তা হবো বা ডাক্তার হবো। হতে পারিনি। আত্নীয়দের কেউ কেউ ভাবতেন আমি বিসিএস দিয়ে প্রশাসনে ঢুকবো। কেউ ভাবতেন আমি খুব কামেল একজন হয়ে উঠবো। কিছুই হয়ে উঠতে পারিনি আমি; কারোরই কোনো স্বপ্ন পূরণ করতে পারিনি। আমি রয়ে গেছি খুব সাধারণ, খুব সাদামাটা একজন পৃথিবীর আরও কোটি কোটি মানুষের মতো এবং একদিন ঠিক বুদ্বুদের মতোই মিলিয়ে যাবো কোনো অবদান না রেখেই! ভিজিট করুন