২৮ বছরে আমরা-১০

কলাম ও ফিচার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
২৮ বছরে আমরা-১০।। নাজনীন সীমন
এই যে মানুষের আচরণ, এক সময়ে ভাবতাম এটা শিক্ষা থেকে হয়। ছোটোবেলা থেকে মা শিখিয়েছিলেন বংশ কিছু না, শিক্ষাই আসল। ভাবতাম অশিক্ষিত লোকেরাই বুঝি যতো অপকর্ম–চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই ইত্যাদি করে। ধর্ষণ শব্দটার সাথে তখনও পরিচিত হইনি হয়তো পত্রিকার ভিতরের পাতায় ঐসব খবর ছাপা হতো বলে, যদি হয়ে থাকতো। খবরের কাগজ পড়া আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিলো এবং বাবা নির্ধারণ করে দিতেন কোন কোন খবর পড়বো।
শিরোনাম থেকে শুরু করে পুরো খবরটা পড়ে শোনাতে হতো জোরে জোরে। সেখানেই মুক্তি মিলতো, তা নয়। সারমর্ম করতে হতো। তখন বয়স ছয় সাত। তখন বুঝিনি এটাও এক ধরনের পড়ানো–সময় লেগেছে বুঝতে। তবে আমি ভক্ত ছিলাম জ্যোতিষ কথা এবং পাত্র-পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনে। সেই সময়ে আমাদের ইউটিউব বা হাজার হাজার চ্যানেল ছিলো না বিনোদনের জন্য। উদ্ভট উদ্ভট চাহিদার উল্লেখ করা বিশেষত পাত্রী চাই বিজ্ঞাপনগুলো বেশ মজা লাগতো।
আর দিন কেমন যাবে পড়ে মেলাতাম আদতে দিনটি কেমন গেলো এবং খুব আশ্চর্যের ব্যাপার জোড়াতালি দিয়ে মিলিয়েও ফেলতাম এবং বিশ্বাসের খুঁটির গোড়ায় আরও একটু মাটি দিতাম প্রতিদিন। একই কারণে এক শালিক দেখা যে ঝগড়াঝাটি আসন্ন হবার সঙ্কেত, দুই শালিক বন্ধুত্ব দৃঢ় হবার ইশারা–এসব খুব মেনে চলতে শিখেছিলাম। ঘর থেকে বেরোনোর সময় বাধা পড়লে দাঁড়িয়ে যেতে হবে নতুবা বিপদ আসবে, ঘর ঝাড়ু দেবার সময় সেটা গায়ে লেগে গেলে রোগবালাই আসবে, বেরোনোর সময় কেউ পিছু ডাকলে বিপদ অনিবার্য, পরীক্ষার দিনে ডিম খেলে দুটো ডিমই মিলবে, সন্ধ্যায় চুল ছাড়া থাকলে ভূতে ধরবে, ছেলেরা হাঁস মুরগীর কলিজা খেলে কলিজা ছোটো হবে, সাহস কম হবে এবং সে কারণে ওটা শুধু মেয়েরা খাবে যেহেতু মেয়েদের অতো সাহস থাকতে নেই, ভর দুপুরে মেয়েরা একা ঘুরলে বা চুল ছাড়া থাকলে ভূত ভর করবে, সন্ধ্যার পর কাপড় বাইরে নাড়া থাকলে সেটি বেয়ে বদজ্বীন ঘরে আসবে–এমনি কতো শতো জিনিস সে সেই ছোটো বয়সে মেনে চলতাম! মজার ব্যাপার হলো এই মাত্র কিছুদিন আগে এক অনুষ্ঠান বাড়ি থেকে একলা ফিরবো দেখে দু’ তিনজন শুভাকাঙ্ক্ষী ভীষণ পীড়াপীড়ি শুরু করলেন চুল যেনো বেঁধে নেই, না হলে খোলা চুলে রাতে জ্বীন আছর করবে।

হাসলাম খুব এবং মনে মনে বললাম, বহুকাল আগে সাপের খোলস ছাড়ার মতো যে সব কুসংস্কার ছেড়ে এসেছি, আবার তা পরি কিভাবে? ওতে যে আর আঁটবো না আর আমি! যাই হোক, বড়ো হতে হতে জীবনের ধাপে শিখেছি পুঁথিগত শিক্ষা, সার্টিফিকেট, তোয়ালে ঢাকা বড়ো বড়ো চেয়ার কিছুই নির্ধারণ করে না।

আর বংশ ঠিক নয় তবে রক্তের প্রভাব থেকেই যায় অথবা বলা ভালো বাবা মায়ের জীন থেকে আমরা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য পেয়ে থাকি, ডারউইনবাদানুযায়ী, নতুবা একই বাবা মায়ের একাধিক সন্তান থাকলে তাদের মধ্যে ক্ষেত্র বিশেষে যে আকাশ পাতাল তফাৎ থাকে সেটা থাকতো না। আমার এক নিকটাত্নীয়কে দেখেছি আজীবন পরিবারের জন্য অর্থাৎ ভাইবোনের জন্য দু’হাতে উজাড় করে দিতে। এবং সেই ভাইবোনদের দেখেছি কেবল দুই হাত পেতে নিতে এবং নিতে। এরপর এও দেখেছি কেমন করে সেই বোনের সংসার ভাঙতে অন্য বোন নানা ছলাকলায় প্রাণান্ত চেষ্টা করে চলে এবং শেষতক সফলও হয়। আরও দেখেছি কেমন করে সেই বোনেরই আদরের সন্তানদের এমনকি খাওয়া দাওয়া নিয়ে পর্যন্ত কষ্ট দিয়েছে। অথচ টাকার পাহাড় বললে বোধ হয় ভুল হবে, রীতিমত যেনো জমজমের কুয়ো ছিলো সেই আত্নীয় ভদ্রলোকটির–টাকা বেরোতো এবং বেরোতোই। কোত্থেকে? সেটা বুঝতে মহাকাশ বিজ্ঞানী হতে হয় না কারো, আমাদেরও দরকার হয়নি। অথচ উনি কম শিক্ষিত নন। বৃহৎ পরিবারের অংশ হয়ে দেখেছি ভাই কেমন করে ভাইয়ের শত্রু হয়ে ওঠে সরাসরি কিছু না বলে বা না করেও। এবং নিশ্চিত করে বলতে পারি এতে সেই পরিবারে বাইরে থেকে আসা অর্থাৎ বৈবাহিক সূত্রে আত্নীয় হওয়া নারী চরিত্রগুলোর তেমন কোনো ভূমিকা নেই। অথচ হরহামেশা আমরা শুনে থাকি বিয়ে হওয়ার পর ছেলেগুলো বদলে যেতে।
এই যে এক মহা দায় নারীরা বয়ে চলেছে যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে কেবল মাত্র মুখস্ত বুলির কারণে, কেউ কোনো প্রশ্ন করছে না, কেউ জানতে চাইছে না সেই নারী কি আদতে এতোই শক্তিধর যে সব বদলে দিতে পারে? কেউ জিজ্ঞেস করছে না তাহলে কি পুরুষটির মেরুদণ্ড নেই? সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো এই যে মানুষগুলো, এরা কিন্তু সবাই সেই শিক্ষিত মানুষের দল। গন্ধম খাওয়ার কোনো সদিচ্ছা আদমের ছিলো না। খেলো কেনো? হাওয়ার অনুরোধ ফেলতে পারলো না যে! মাথা কাজ করছিলো না। আদরের বাবু সোনা ধর্ষণ করলো কেনো? পর্দা পুষিদা না করে মেয়ে অমন খোলামেলা পোষাকে বাইরে বেরোলে ছেলেদের তো মতিভ্রম হতেই পারে। মাথা তেতে গিয়েছিলো।
কিছু পুরুষের কোনো মাথাই কখনও কাজ করে না, কোনোটির উপরেই তাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। অথচ এমনকি সার্টিফিকেটধারী লোকেরাও এসব বলে। ঠিক তেমনি কোনো কোনো নারী মনে করে পুরুষ মানুষ তো; একটু আধটু বিভ্রম হতেই পারে। সার্টিফিকেট তাদেরও আছে। আবার নারীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, যারা রেঁনেসা জামার পকেটে বা হাতব্যাগে নিয়ে ঘোরে, মনে করে থাকে পুরুষ মাত্রই ধর্ষক। প্রতিটি পুরুষকে তারা দেখে উত্থিত শিশ্ন নিয়ে তাড়া করে বেড়াতে। প্রশ্ন করলেই তারা একে একে নিজের বাবা, নিজের ভাই, নিজের ছেলে, নিজের কাছের বন্ধু, নিজের মামা চাচা ইত্যাদিকে এই তালিকা থেকে বাদ রাখে যেনো গুটিকয় পুরুষাত্নীয় ছাড়া তাদের পতি দেবতাসহ প্রতিটি এক্সওয়াই ক্রোমোজোমধারী সারা দিনমান কেবল জোরপূর্বক রতিক্রিয়ার জন্য ‘মেয়েমানুষ’ খুঁজে বেড়ায়।
এরা শিক্ষিত কেবল নয়, ভীষণ শিক্ষিত। অথচ একটু ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে ভাবলেই যে সূক্ষ্ণ পর্দা দিয়ে আমরা সমাজে ঘটে যাওয়া সত্য বা বাস্তব ঘটনাকে মনের মাধুরী মেশানো ফ্রেমে বন্দী করতে ভালোবাসি মানুষকে, সে পর্দা উঠে যাবে, প্রকাশিত হবে উলঙ্গ সেই সত্য যা আমরা জানি হয়তো কিন্তু মানতে চাই না কারণ তাতে ভেঙে পড়বে আমাদের বিশ্বাস, আস্থা, বিস্রস্ত ‘সভ্য’ সমাজ, আঁতকে উঠবো আমরা। আমি জানি এ কথা শুনলে হৈ হৈ রৈ রৈ পড়ে যাবে আমাদের মনোজগতে, পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাবে, চোখ বিস্ফারিত হবে। আমরা কখনও ভেবে দেখি না অসংখ্য পুরুষ আছে যাদের প্রথম যৌন অভিজ্ঞতা হয় কিশোর বয়সে কোনো পারিবারিক, হয়তো একটু দূরের বা কাছের, অথবা প্রতিবেশী নারীর উদ্যোগে, প্ররোচনায়, কিংবা জোরাজুরির কারণে এবং পুরুষত্ব হারানোর যাত্রা শুরু করে তারা হয়তো এক অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। আবার যদি বলা হয় মন ভাঙা বা সুযোগ না নেয়ার কথা, ছেলে ও মেয়ে কে না করছে সেটা? আলোচনায় যদি এরপর উঠে আসে ব্যবহার করার কথা, সেটাও উভয় পক্ষই করছে এবং বিশেষত এই যুগে মেয়েরা এর যে চরম সুবিধা ভোগ করছে। ইচ্ছে মতো সম্পর্ক করছে এরা এক বা একাধিক জনের সাথে; এরপর কোনো কারণে ঝামেলা হলেই সেই প্রেমিককে প্রাক্তন করে তার বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা করে দিচ্ছে। আমার স্বল্পবুদ্ধিতে কেবল খেলে না বিয়ের ‘প্রলোভন’ দেখিয়ে হোক বা অন্য যে কোনো লোভ দেখিয়েই হোক, যে শারীরিক মিলন তো দু’জনের সম্মতিতে হয়েছে, তাকে ধর্ষণ দাবী করা কোন যুক্তিতে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? বরং এই যে স্বার্থ ফুরিয়ে গেলেই ছোবল মারা স্বভাব, এর কি শাস্তি হওয়া দরকার নয়?
শাস্তি কতোটুকু কি হবে, আইন যা বলে, সে সব নিঃসন্দেহে সমাজের এবং বিশেষত আইনের বিজ্ঞজনদের ব্যাপার। কিন্তু এই যে মানুষকে ঠকিয়ে স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা, মিথ্যে অপবাদ দেয়া, স্বার্থে ঘাটতি পড়লে অন্যের চরম ক্ষতি করা, বিশ্বাসের ভিত নড়িয়ে দিয়ে সন্দেহের বিষবৃক্ষের বীজ বোনা–নারী পুরুষ নির্বিশেষে যে এর জন্য দায়ী, এসব নিকৃষ্ট কর্মকাণ্ড যে সমাজের জন্য ক্ষতিকর, এর মূলে যে কুশিক্ষা রয়েছে, সেটা বোধ হয় বোঝার সময় এসেছে; নতুবা আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে একজন সার্টিফিকেটধারী তার মতের সাথে না মিললেই অশ্রাব্য গালি বুক চিতিয়ে দিয়ে প্রশান্তি পেতে পারতো না, ধর্ষিত না হয়েও একটি মেয়ে কেবল মাত্র প্রতিহিংসাপরায়ণতার বশবর্তী হয়ে এমন জঘন্য অপবাদ দিতে পারতো না একটি ছেলের বিপক্ষে তার সারা জীবন নষ্ট করে দেয়ার জন্য, অথবা সাময়িক সুযোগ সুবিধার জন্য অন্যকে ব্যবহার করে সময় ফুরিয়ে গেলে তাকে সের দরে বিক্রি করে দেয়ার কথা মাথায়ও আসতো না কারো। এই শিক্ষা কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মনে হয় না; বরং এই শিক্ষা পারিবারিক শিক্ষা। প্রবাদ শুনেছি বহুবার, “কুসন্তান যদি বা হয়, কুমাতা কদাপি নয়’। প্রশ্ন করতেই হয় আজ সামগ্রিক যে অধঃপতন আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা কি কেবলই সন্তানের দায়, না এর পেছনে বাবা মায়ের সঠিক শিক্ষার ভূমিকাও রয়েছে? আর তাই যদি হয়, তবে ‘কুমাতা’ (বাবা এবং মা উভয়েই) কেনো নয়? বাবা মা হিসেবে আমরা কতোটুকু সচেতন? আমরা তাদের উপর কতোটা নজর রাখছি, তাদের সঠিক পথে তুলে দিতে পারছি? আমরা কি তাদের উপর কেবল শিক্ষার বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছি যে শিক্ষা কেবল সার্টিফিকেট এনে দেয়, না নৈতিক শিক্ষাসহ পারিপার্শ্বিক বিষয় সম্পর্কেও শিক্ষা দিচ্ছি। ক’জন ছেলেমেয়ে আজকাল গল্প শুনে ঘুমাতে যায়? অথচ তারা কমপ্লান, হরলিক্স এসব খাচ্ছে বেড়ে ওঠার জন্য। আমরা কি পরবর্তী প্রজন্মকে শিক্ষিত করছি না সুশিক্ষিত করছি, ভাববার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।
সেই সময় বুঝতে পারিনি বাবার পত্রিকা পড়ানোর মাহাত্ন্য। আজ বুঝি। রাস্তার কোন পাশ ধরে চলতে হবে, হাঁটার সময় মাথা কতোটুকু নীচে থাকতে হবে এবং চোখ কতো দূর প্রসারিত হতে হবে, কাজে ফাঁকি দেয়া চলবে না–রোদ বৃষ্টি শীত যাই হোক না কেনো সময় বেঁধে, প্রয়োজনে আগে যেতে হবে কিন্তু পরে না, যতো ঠাণ্ডাই হোক না কেনো, স্নান করা বাদ দেয়া যাবে না, বাইরে থেকে এসেই হাত মুখ এবং পা ধুতে হবে ইত্যাদি বাবাকে দেখে দেখে শেখা। আজ এই করোনা কালে বুঝি হাত মুখ ধোয়ার এই অভ্যাস কতোটা জরুরী। বাবা থাকলে হয়তো তাঁর কাছে কৃতজ্ঞতা স্বীকার করতে পারতাম; কিন্তু সব সন্তানের তেমন সুযোগ হয় না ইচ্ছেয় কোনো খামতি না থাকা সত্ত্বেও। অনেকে বলে কপাল পোড়া! জানি না! তাই বাতাসে ছড়িয়ে দিলাম আমার কথাগুলো। তুমি শুনে নিও প্রিয়তম বাবা আমার! শুনতে পাচ্ছো কি? খুব ভালোবাসি বাবা, খুব খুব খুব ভালোবাসি….
লেখক : নাজনীন সীমন। প্রবাসী লেখক, প্রকাশক, নিউওয়ার্ক।