২৮ বছরে আমরা-৮

২৮ বছরে আমরা-৮

কলাম ও ফিচার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
২৮ বছরে আমরা-৯
২৮ বছরে আমরা-৮ ।। নাজনীন সীমন।।
আবার সক্রেটিস বলেছেন, “বন্ধুত্ব গড়তে ধীর গতির হও। কিন্তু একবার হয়ে গেলে প্রতিনিয়তই তার পরিচর্যা করো”। কথাটা অবশ্য আমার কেবল বন্ধুত্বের ক্ষেত্রেই নয়, বরং সব সম্পর্কের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য মনে হয়। আমাদের, বাঙালীদের, মধ্যে একটি ঝোঁক দেখতে পাই যেটি সহসা অন্য কোনো জাতির লোকদের মধ্যে আমি আজও দেখতে পাইনি, সেটি হলো কোনো সম্পর্ক তৈরীতে দেরী না করার প্রবণতা–

প্রথম পরিচয়েই আমরা এতো কাছাকাছি এসে যাই মনে হয় যেনো বহু যুগ ধরে পরিচয় এবং কেউ কেউ প্রথম ধাক্কা না কাটতেই ‘তুই’ সম্বোধনে চলে যায় যেনো সেই ছোট্ট বেলা থেকে একসাথে বড়ো হওয়া গলাগলি করে। অবশ্য বলা বাহুল্য, কেউ কেউ এর চরম বিপরীত।

খোলসের ভিতর থেকে বের না হবার ধনুভাঙা পণ করে বসে থাকে এবং সহজে এদের বৃত্তের ভিতর প্রবেশ করা অসম্ভব যে কারো পক্ষে। সম্পর্কের এই সুপারসনিক গতিতে যারা থাকে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কিছু দূর গিয়েই তাদের থমকে পড়তে হয় প্রথম ধাক্কাতেই সর্বোচ্চ গতি তুলে দিয়েছে বলে এবং গতি কমানো ছাড়া গত্যন্তর নেই বলে। একজন মানুষ চিনতে যথেষ্ট পর্যবেক্ষণ শক্তির প্রয়োজন হয়, যদি সেটা দ্রুততম সময়ে জানতে হয়। কিন্তু বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই একজন মানুষকে মোটামুটি চেনা সম্ভব এ সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য যে ব্যক্তি জীবনে তাকে কতোটুকু জায়গা আমরা দেবো যদিও ঘসেটি বেগম, মীরজাফর, মোশতাকদের মতো মানুষ চেনা দুষ্কর। শুধু পঞ্চ ইন্দ্রিয় ব্যবহার করে তাদের চেনা অসম্ভব; দরকার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় এবং অতি বিশ্বস্ত ও বিচক্ষণ কিছু কাছের মানুষের সাহচর্য যারা বিপদ দেখলে চুপ করে না থেকে কাছের মানুষটিকে সতর্ক করে দেয় এবং অপর পক্ষের মুখোশ উন্মোচন করে দেয়ার সাহস রাখে। এর সাথে আরও দরকার এই বিশ্বস্ত মানুষদের উপর আস্থা রাখা এবং উদ্দিষ্ট ব্যক্তিটির আচার আচরণ গভীর বিশ্লেষণ করা।
ফলত বন্ধুত্ব সময়ের ব্যাপার–এতে আদর্শ, পছন্দ অপছন্দ, চিন্তা ও মনন ইত্যাদিতে সাযুজ্য থাকা প্রয়োজন। এতে প্রত্যয়, নির্ভরতা, সততা, সময় প্রভৃতি অত্যাবশ্যক উপাদান। দোদুল্যমানতা বন্ধুত্ব নয় বরং এটি এক ধরনের অলিখিত প্রতিশ্রুতি। প্রতিটি ক্ষণ এর পরিচর্যা করতে হয় অর্থ অর্থাৎপার্থিব সৌভাগ্য দিয়ে নয়, কিন্তু অর্থ অর্থাৎ তাৎপর্য বুঝে। আজ এতো বছর পেরিয়ে এসে মনে হয় আমি কি এসবের কিছু বুঝেছি বা যথেষ্ট সময় দিয়েছি বন্ধু নির্বাচনে কিংবা তার পরিচর্যায়? যাদেরকে ধরে রাখতে চেয়েছিলাম, কিন্তু পারিনি, তারা কি তবে যত্নের অভাবে ঝরে গেলো না সঠিক মানুষ ছিলো না? অথবা যারা এখনও রয়ে গেছে কিন্তু মনের ঠিক সেই জায়গায় যাদের বসাতে পারিনি, আমার একান্ত সময়ে ভাগ বসাতে দিতে পারিনি যাদের, তারা কি আমার ভুল বোঝার ফল? বন্ধুত্ব কি গণতান্ত্রিক নির্বাচন পদ্ধতির ফল যে বেছে নেবো সবচেয়ে মিল যার সাথে আছে তাকে? জীবনের মধ্যাহ্নে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন জাগে, আমি কি কারো বন্ধু হবার যোগ্য আসলে? কিছুই করিনি কারো জন্য কখনও। হয়তো সে সুযোগ আসেনি, আর সুযোগ এলেও করতে যে পারতাম, নিশ্চিত নয়। মানুষের হাত পা অনেক জায়গায় বাঁধা থাকে। আর মেয়েদের তো ঘাটে ঘাটে বাঁধা। এর সাথে মেশা যাবে না, তার সাথে কথা বলা যাবে না, ছেলে মেয়েতে বন্ধুত্ব হয় না, কতো শতো কথা! কোনো মেয়ের ছেলে বন্ধু থাকলে তাকে নিশ্চিন্তে ‘বেলেল্লা’ পর্যন্ত আখ্যা দিয়ে দেয় সমাজ অনায়াসে, গলা ভাত টুপ করে গিলে ফেলার মতো। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করে থাকেন বিপরীত লিঙ্গে বন্ধুত্ব সম্ভব নয় বলে’ তাদের ধারণা প্রেম সেখানে আসবেই। ব্যক্তি অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, বিপরীত লিঙ্গের বন্ধুত্ব মানেই নারী-পুরুষের প্রেম নয়; বন্ধুত্ব বন্ধুত্বই–সে এক মহাপ্রেম যাতে শরীর নেই, চাওয়া পাওয়া নেই, বরং আছে শুধু নির্ভরতার ছোঁয়া, বিশ্বাসের চূড়ান্ত রুপ, একত্রে সময় কাটানোর প্রবল আকর্ষণ এবং নিজের সব ভালো দিয়ে বন্ধুর ভালো করার ইচ্ছে।
রক্তের সম্পর্ক যে জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়, একজন ভালো বন্ধু যার আছে, সে দৃঢ়চিত্তে বলতে পারবে এ কথা। অসংখ্য, অগণিত বললেও বোধ হয় ভুল হবে না, আত্নীয়ের মাঝে বেড়ে ওঠা আমি জীবনের পরতে পরতে বুঝতে পেরেছি রক্ত আসলে খুব বড়ো কিছু না যদি না হার্দিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আরও জেনেছি অনেক দাম দিয়ে কেবল স্বার্থের জন্য পরিবার পর, বহু দূরের হয়ে যায় কেমন, বুঝেছি পিছন থেকে ছুরি এসে পিঠে বিঁধে এফোঁড় ওফোঁড় হয়ে গেলে কতোটা রক্ত ঝরে, দেখেছি সামনে দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে বুকের মধ্যে হাত দিয়ে ধারালো প্রকাণ্ড নখে হৃৎপিণ্ড ছিঁড়ে নিতে কেমন করে উদ্যত হয় ‘প্রিয়’ মুখেরা সব এবং তার যন্ত্রণাটুকু দগ্ধে দগ্ধে উপলব্ধি করেছি, টের পেয়েছি ঘাড়ে কামড় দিয়ে ড্রাকুলার মতো কেমন রক্তের রক্ত শুষে নেয় রক্তের সেই প্রিয়তম আত্নীয়রা এবং তখন প্রশ্ন জাগে নিজের শরীরে বহমান রক্ত নিয়ে–থমকে পড়ি, হতাশ হই, দুঃখ পাই। এ দুঃখ ভাগ করে নিতে গেলে অপমানে কুঁকড়ে যাই, আরও বেশী ব্যথিত হই। আর সেই সুযোগে দৃঢ়তর ও আগ্রাসী হয় আত্নীয়দের অনাত্নীয় আচরণের শিকড়। সে সব কথা মনে হলেই বিবমিষা জাগে। মনে হয় যদি সম্ভব হতো শরীরের রক্ত বদলে ফেলা, যদি সম্পর্কের সমস্ত স্মৃতি মুছে ফেলতে পারতাম, বেঁচে যেতাম!
এর চেয়ে ঢের ভালো অপরিচিতরা;আঘাত দিলেও কষ্ট হয় না, তেমন কোনো আশা থাকে না তাদের কাছে, না পোষালে পথ ভিন্ন করে নেয়া যায় নিমেষে যদিও বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে তা হয় না। থমাস কার্লাইল বলেছেন, “বন্ধুত্ব একবার ছিঁড়ে গেলে পৃথিবীর সমস্ত সুতো দিয়েও তা রিপু করা যায় না”, কথাটা ধ্রুব সত্য এবং এই বাণীও কিন্তু কেবল বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে নয়, বরং জীবনের সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বরং আমি সিনেকা’র সাথে একমত পোষণ করি যখন তিনি বলেন, “যারা বন্ধুদের অপমান করে, বন্ধুদের অপমানিত হতে দেখে কাপুরুষের মতো নীরব থাকে তাদের সঙ্গে সংসর্গ করো না” কেননা এরা বন্ধু হতে পারে না। কেউ কেউ হয়তো মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, ঝামেলা এড়ানোর প্রবৃত্তির কথা, সঙ্কোচ বা ভয় অথবা অন্য অনেক কিছুর কথা বলতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি নিজের বেলায় না হলেও বন্ধুর বেলায় নীরব থাকা অমার্জনীয় অপরাধ। অথচ দিনের পর দিন মানুষকে এসব করতে দেখেছি এবং প্রতি পদে চিনেছি মানুষ। মানুষ চিনেছি দু’দিক দিয়েই। এবং এই চেনার মধ্য দিয়ে যাকে বা যাদের বন্ধু করে পেয়েছি, অত্যন্ত যত্নের সাথে তাকে বা তাদের আমার সাথে রাখি প্রতিনিয়ত, কৃতজ্ঞ হই এইসব মানুষের কাছে, এইসব মানুষের জন্য। সাথে জানি, আর কিছু করতে না পারলেও কোনো দিন কারো কাছে আমার সামনে তাদের ছোটো হতে দেবো না, তাদের মর্যাদা রক্ষার জন্য রুখে দাঁড়াবো যেমন দাঁড়িয়েছি এতো কাল, পরিণতি যতোই কঠোর হোক, বিনিময় মূল্য তার যা-ই হোক না কেনো। এবং মৌনতা দেখে আবারও প্রশ্ন জাগে, তবে কি ভুল মানুষের সঙ্গ পেতে চেয়েছিলাম? এবং আবারও ক্ষতি বিক্ষত হই মনে ও মননে… যেনো অনাদি অনন্ত এই প্রক্রিয়া…. চলমান…
লেখক : নাজনীন সীমন। প্রবাসী লেখক, প্রকাশক, নিউওয়ার্ক।