২৮ বছরে আমরা-৯

কলাম ও ফিচার
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

২৮ বছরে আমরা-৯।। নাজনীন সীমন

২৮ বছরে আমরা

আমার প্রায়শই কৌতূহল জাগে যাবতীয় সমস্ত সম্পর্কের মধ্যে বন্ধুত্ব এক অলৌকিক ব্যাপার কি না ভেবে। দৈব কিছুতে যদিও বিশ্বাস নেই আমার। তাই পরক্ষণেই মনে হয় এটা নেহায়েতই কাকতালীয় নতুবা এই যে আমরা জীবনে কম করে হলেও কয়েক শত মানুষের সান্নিধ্যে আসি, তাদের সাথে কতো ভাব বিনিময় হয়, কিন্তু হাতে গোণা কিছু মানুষের সাথে হৃদ্যতা ঘটে এবং টিকে থাকে আরও কম, এটা কি সম্ভব হতো?

জীবনের টানা পোড়েনে, প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায় মানুষ এবং তার সম্পর্কের বন্ধন উঠোনে কাককে দেয়া ছড়ানো ভাতের মতো। সুর্য যেমন কেন্দ্রে থাকে আর তার চতুর্পাশে নির্দিষ্ট দূরত্বে থেকে নিজস্ব কক্ষপথে থেকে ঘুরতে থাকে গ্রহসমূহ, আবার সেই সব গ্রহেরও যেমন উপগ্রহ থাকে, প্রতিটি মানুষের জীবনও ঠিক তেমনই- –

নিজের কাছে আমরা প্রত্যেকেই তেমনি সূর্য এবং আমাদের কেন্দ্র করে ঘোরে আমাদের সবচেয়ে কাছের বুধ, তারপর শুক্র, পৃথিবী… ।

আবার কারো কাছে হয়তো আমরা এক একটি সূর্য যাকে কেন্দ্র করে তাদের জীবন ঘূর্ণায়মান। সৌরজগতে চরম অভিকর্ষ শক্তির কারণে কক্ষচূত্যি না ঘটলেও মনুষ্য জীবনে স্বার্থ সংঘাত, দীনতা, ঈর্ষা, আত্নম্ভরিতা প্রভূত কারণে প্রায়শই আমরা ছিটকে পড়ি একে অপরের জীবন থেকে এবং তারপর ধূমকেতুর মতো চূর্ণ বিচূর্ণও হয়ে যাই কেউ, কখনও সখনও, ভিতরে- – একাকী।

আবার এমনও ঘটনা ঘটে জীবনে যার দায় কাউকে দেয়া যায় না; জীবনের প্রয়োজনে, বেঁচে থাকার তাগিদে, জীবন যাপনের কারণে দূরে সরে যায় মানুষ সময়ে অসময়ে। সম্ভবত আমার ছয় মাস বয়স থেকে বছর তিন পর্যন্ত আমরা ছিলাম পটুয়াখালীতে বাবার কর্মসূত্রে।

সেই বয়সের কিছু মনে থাকার কথা নয়, অন্তত আমার মতো ‘গোল্ডফিশ মেমোরি’র কারো তো নয়ই এবং সঙ্গত কারণেই কিছু মানে কোনো স্মৃতিই কখনও উঁকিঝুঁকি পর্যন্ত দেয় না আমার মনে। কিন্তু শুনে কিছু গল্প, কোনো মানুষ নিজের হয়ে যায়, আমরা ধারণ করতে থাকি সেসব নিজের ভিতর যেমন চর্মচক্ষে না দেখেও মানুষ প্রেমে পড়ে তাজমহলের এবং শ্রদ্ধায় অনন্য সাধারণ প্রেমিক হিসেবে হৃদয়ে নাম লিখে রাখে সম্রাট শাহজানের, তাঁর চরম নিষ্ঠুরতার কথা না জেনেই।

তেমনি আমিও ধারণ করি একজনকে যে আমার থেকে বছর দুয়েকের বড়ো ছিলো- – মায়ের মুখে শোনা। সকাল থেকে দুপুরময় আমরা না কি খেলতাম বাড়ির বারান্দাতেই। কোনো এক দুপুর বেলা কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিলো না আমাকে। হৈ পড়ে গেলো চারপাশে। প্রথমে মা ভেবেছিলো বাবার অফিসে গিয়ে বসে আছি হয়তো। বাবা তো আকাশ থেকে পড়লেন, অফিসের কাজ ফেলে ছুটোছুটি শুরু করলেন। অফিসের পিয়ন কাকা (নাম জানা নেই) দৌড়ঝাঁপ আরম্ভ করে দিলেন; বলা বাহুল্য ওনার মেয়ের সাথেই আমি খেলতাম এবং হারিয়ে গিয়েছিলাম সেই দিন যেটা পরে জানতে পারে সবাই।

পত্রিকা পড়ার গল্প

যাই হোক খুঁজতে আমাদের পাওয়া গেলো সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে পুকুরের জলে মহানন্দে একে অন্যকে ভিজিয়ে দেয়ার খেলায় মত্ত অবস্থায়। এক মুহুর্ত দেরী না করে বাজের মতো ছোঁ মেরে এক হাতে আমাকে বাড়ি এনে সোজা দরজা বন্ধ করে দিলেন মা। বাইরে থেকে বাবা, পিয়ন কাকা যতো দরজা খুলতে বলেন, ততোই যেনো শব্দ বাড়তে থাকলো। সেদিন শেষ পর্যন্ত দরজা নাকি ভাঙতে হয়েছিলো এবং আমাকে পাওয়া গিয়েছিলো ঝুলন্ত অবস্থায়। হয়তো মা মনে করেছিলো মাটিতে রেখে পেটালে ভুলে যাবো; তাই দেয়ালে হুকের সাথে বেঁধে পিটিয়েছিলো।

পিয়ন কাকা বাইরে থেকে নাকি কান্নাই করে দিয়েছিলেন; কোনো অনুরোধ শোনেনি মা। বহুবার মাকে জিজ্ঞেস করেছি অমন করে মারতে পারলো কি করে! একবার কেবল হাসতে বলেছিলো কোন ভয় সেদিন পেয়ে বসেছিলো তাঁকে বোঝানো অসম্ভব। আজও আমার পিঠে আমি বহন করে চলেছি সেই দাগ, আমৃত্যু করবো; কেবল আমাকে হারানোর ভয় আর কারো থাকলো না। ভয় যার ছিলো, পুকুর থেকে বাঁচিয়ে তুলে সমুদ্রে ফেলে দিয়ে সেই মানুষটিই আমাকে চির নিঃসঙ্গ করে হারিয়ে গেলো। পিঠের দাগে প্রায়শ হাত বোলাতে মনের দাগের গভীরতা অনুভব করি; মনে হয় একবার যদি ফিরে পেতাম, বলতাম মেরে আমার সারা শরীর রক্তাক্ত করে দিতে, শুধু হারানোর এই তীব্র যন্ত্রণা যা থেকে চুঁইয়ে চু্ঁইয়ে প্রতিনিয়ত রক্ত ঝরছে, প্রায়শই যা পাহাড়ী বর্ষার মতো ভাসিয়ে নামে দু’চোখ বেয়ে, সেই দুর্বহ কষ্ট থেকে মুক্তি দিতে যদিও জানি যে যায়, সে চলেই যায় কস্মিন কালেও না ফেরার প্রতিশ্রুতি রেখে।

এবং ছোট্ট বয়সের নাম না জানা সেই বন্ধুর কথা আমার প্রায়শই মনে পড়ে তার নাম, মুখচ্ছবি কিছুই স্মৃতিপটে না ভাসলেও। অদ্ভূত এক আকাঙ্ক্ষা হয় তাকে দেখতে, তার সাথে কথা বলতে, ছোটো বেলার মতো খেলতে অথচ কিছুই মনে নেই তার সম্পর্কে বা সেই যাপিত জীবন বিষয়ে। হেতু, ব্যাখ্যা কিছুই জানা নেই আমার। আত্নায় কেমন যেনো সেলাই ছেঁড়া টান অনুভব করি হারিয়ে ফেলা সেই অনামিকা মেয়েটির জন্য পাশে বসে থাকলেও যাকে কোনো দিন চিনবো না আমি তাকে, না আমাকে সে। এর নাম কি হতে পারে? আমি জানি না। শুধু জানি ‘বন্ধু’ ডাকতে ইচ্ছে করে তার কথা মনে হলে।

আবার বয়স যখন সাত, দাঁত গাঁড়ার জন্য ইঁদুরের গর্ত খুঁজে বেড়াই, মনে মনে আওড়াই “ইঁদুর ভায়া ইঁদুর ভায়া/পুরোন দাঁত নিয়ে যাও/নতুন দাঁত দিয়ে যাও” কাল্পনিক গল্পগাথা চোখ বন্ধ করে সত্য মেনে সুতোয় বেঁধে দাঁত নাড়িয়ে তুলতুলে নরম করে এক টানে তুলে ফেলে বাইরে গিয়ে ইঁদুরের গর্ত খুঁজে মরি তাতে তুলে ফেলা দাঁত পুঁতে ফেলার জন্য, জীবনের সেই পর্যায়ে একদিন সকাল সকাল দরজায় মৃদু কড়া নাড়ার শব্দ শুনতে পাই। অতো ভোরে কেউ আসার কথা না চরম বিপদ না হলে এটা বোঝার বয়স বোধ হয় হয়নি তখনও।

দরজা খুলে দেখি আমার বন্ধু দাঁড়িয়ে আছে, বলতে এসেছে ছেড়ে যাবার কথা। স্মৃতির মোটা খাতার উপর ধূলোর পুরু আস্তরণ সাধ্যমতো সরিয়ে চালশের চোখে দেখতে পাই জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলাম সেদিন। তারপর ছোট্ট একটা তিন বাটির খেলনা টিফিন ক্যারিয়ারের মধ্য থেকে আমার প্রিয় মালাটা তুলে দিয়েছিলাম তার হাতে, আর সে এনেছিলো কয়েকটা মার্বেল। সে সময়ে মার্বেল খেলতাম খুব। মন খারাপের ঝড় উঠিয়ে দু’জন দু’জনের কাছে কথা দিয়েছিলাম চিঠি লিখবো বলে ঠিকানা নামে কোনো বস্তু দরকার হয় চিঠি পৌঁছাতে, এ কথা চিন্তা না করেই হয়তো।

দিনের পর দিন গেছে, মাস পেরিয়ে বছর। কখনও সেই চিঠি এসে আমার হাতে পৌঁছায়নি। মনে আছে চিঠি লিখে মাকে বলেছিলাম পাঠানোর ব্যবস্থা করতে এবং সেই প্রথম জানলাম হলুদ খামের উপর নাম, ডাকঘর, থানা, জেলা ইত্যাদি দরকার হয় চিঠি পৌঁছাতে যার কোনোটাই আমার কাছে ছিলো না। আজও জানতে পারিনি ইচ্ছে করেই সে লেখেনি, না ভুলে গিয়েছিলো আমাকে, না লিখেছিলো কিন্তু পাঠাতে পারেনি; শুধু টের পাই আজও সেই সকালের কথা মনে হলে একটু শিউরে উঠি, নিঃশ্বাস কিঞ্চিত ভারী হয়ে আসে; মনে হয় আহা, একবারটি যদি দেখতে পেতাম!

এর নাম মায়া, না মোহ, না বন্ধুতা, আমি জানি না। বন্ধুত্ব বোঝার বয়স কি আমার হয়েছিলো তখন? হলেও সম্পর্কের সেই অনুভূতি আজও ধরে রেখেছি ভাবতে কেমন যেনো স্বস্তি হয় না অতোটা। শিবরাম চক্রবর্তী লিখেছিলেন, “ছেলেবেলার বন্ধুরা মেয়েদের ভালোবাসার মতই কোথায় যেন হারিয়ে যায়। ভাবতে অবাক লাগে একেক সময়। মনে হয় যে, বুঝি একরকম ভালোই।

তাদের নির্মেদ দেহ আর নির্মেঘ মন নিয়ে কৈশোরের নিবিড় মাধুর্যে মিশিয়ে নিটোল মুক্তোর মতোই চিরদিনের স্মৃতির মধ্যে অক্ষয় থেকে যায় তারা – পরে যে কখনও আর ফিরে দেখা দেয় না তাতে জীবনের মতই সুমধুর থাকে, পলে পলে দন্ডে দন্ডে অবক্ষয়ে টাল খায় না, ক্ষয় পায় না”। হয়তো দেখা হয়নি বলেই এখনও তার প্রতি ভালোবাসা অক্ষয় রয়েছে। জানি না… তবে ‘মেয়েদের ভালোবাসা’ আসলেই এতো সহজে হারিয়ে যায়, না এটা মেয়েদের বিরুদ্ধে পুরুষদের আরও একটি অজ্ঞানতাবশত মুখস্ত অপপ্রচার, ভাববার অবকাশ রয়েছে যথেষ্ট।

ঠিক যেমন আমরা শুনে শুনে বড়ো হয়েছি এবং মানতে শিখেছি, “পুরুষ মানুষদের কাঁদতে নেই”। অনুভূতির কি আর নারী, পুরুষ হয়? ভালোবাসা ভালোবাসাই, অনুভূতি অনুভূতিই। অযথা সমাজ, সংস্কৃতি এসবকে নানা মার্কা দিয়ে, লিঙ্গ-জাতি-ধর্ম-অর্থ নানা বোতল তৈরী করে এক একটার মধ্যে এক একটা দিয়েছে যেনো ছিপি খুললেই বেরিয়ে আসবে প্যান্ডোরার বাক্সের ভিতরে থাকা দুঃখ, হিংসা, ক্রোধ ইত্যাদি, একের পর এক; তাই আমরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ঐ মুখ আঁটা বোতলটিকে রেখে দিয়েছি মগজের ভিতর খুব যত্নে যেনো কোনো ভাবেই তা স্পর্শিত না হয় এবং তার ভিতর জমা করা সেই চিন্তাসমূহের চর্চা করে যাচ্ছি অবলীলায় যুক্তি প্রমাণের তোয়াক্কা না করেই এবং কোনো পুরুষ কেঁদে ফেললে তাকে ‘মেয়ে’ ভরে ভর্ৎসনা করছি, চুড়ি পরাচ্ছি আবার কোনো মেয়েকে প্রেমিককে বিয়ে করতে দেখেই চোখ বন্ধ করে বলে দিচ্ছি, ‘নাটক ছিলো রে ভাই! মেয়েদের প্রেম, আর সস্তা শাড়ির রং–টেকে না কোনোটাই”… এ জাতীয় নানা একপাক্ষিক, চিন্তাহীন কথা এটা ভুলে গিয়ে যে দিন শেষে আমরা প্রত্যেকেই রক্ত মাংসের মানুষ; আমাদের দহন পীড়নসহ নানা আচরণ একই–কেবল তফাৎ প্রকাশভঙ্গিতে।

লেখক : নাজনীন সীমন। প্রবাসী লেখক, প্রকাশক, নিউওয়ার্ক।