ভবদহ প্রকল্প

নতুন প্রকল্পে থাকছে না ভবদহে জোয়ারাধার

জাতীয় খবর
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

gonopress.com

যশোরের ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া নতুন প্রকল্পে বাদ দেয়া হচ্ছে জোয়ারাধার বা টাইডল রিভার ম্যানেজমেন্ট (টিআরএম) কার্যক্রম। এ কার্যক্রম বাদ দেওয়ার প্রস্তাবে ক্ষুব্ধ ও হতাশ ভবদহ পানি নিস্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতারা।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) যশোর কার্যালয় ‘ভবদহ ও তৎসংলগ্ন বিল এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রস্তাবনা’ সংশোধন করে তা অনুমোদনের জন্য প্রধান কার্যালয়ে পাঠিয়েছে। ৬৫৫ কোটি ৮৮ লাখ ৯৬ হাজার টাকার সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবনায় নদী পুনর্খনন, নদী ড্রেজিং, খাল পুনর্খনন, খালের ওপর কালভার্ট নির্মাণ, বাঁধ নির্মাণ, স্লুইসগেট নির্মাণ ও মেরামতের কথা বলা হয়েছে। তবে প্রস্তাবনা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে ভবদহের জলাবদ্ধতা দূর করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর কার্যক্রম জোয়ারাধার।

সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলছেন, টিআরএম প্রকল্প বাতিল খুবই হতাশাজনক, গণবিরোধী এবং এ অঞ্চলের ভৌগোলিক-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, জনগণের নদী-ভূমি সম্পর্কিত অভিজ্ঞতা ও বিশেষজ্ঞদের বৈজ্ঞানিক মতামতের পরিপন্থি। মহলবিশেষকে রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপাটের সুযোগ করে দিতেই এটা বাদ দেওয়া হচ্ছে।
গত বছরের জানুয়ারিতে ৪৪৮ কোটি ৭১ লাখ ২৩ হাজার টাকার ‘ভবদহ ও তৎসংলগ্ন বিল এলাকার জলাবদ্ধতা দূরীকরণ প্রকল্পের (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়। কিন্তু একই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যাচাই কমিটির সভায় তা বাতিল হয়ে যায়। কারণ হিসেবে বলা হয়, জোয়ারাধার বাস্তবায়ন হলে জলাভূমি ভরাট হবে। ফলে পরিবেশের ওপর প্রভাব পড়বে। ওই বৈঠকে দাবি করা হয়, স্থানীয় জনগণও জোয়ারাধার চান না। এর পর জোয়ারাধার বাদ দিয়ে প্রকল্প প্রস্তাবনা সংশোধনের জন্য পাউবো যশোরে ফেরত পাঠানো হয়।

নির্দেশনা অনুযায়ী, পানি উন্নয়ন বোর্ড যশোর প্রস্তাবনা সংশোধন করে সম্প্রতি তা আবারও প্রধান কার্যালয়ে পাঠায়। এ প্রস্তাবনায় ১০৭ দশমিক ৯০ কিলোমিটার নদী পুনর্খনন, ৩০ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং, ৬২টি খালের ২৬৪ দশমিক ৫১ কিলোমিটার পুনর্খনন, বিভিন্ন খালের ওপর ১৯টি কালভার্ট নির্মাণ, ৫০ দশমিক ২০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ, একটি স্লুইসগেট নির্মাণ ও ১৯টি স্লুইসগেট মেরামত করার কথা বলা হয়েছে।

যশোর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী বলেন, প্রকল্প প্রস্তাবনাটি পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যাচাই কমিটির সভায় পাস হওয়ার পর যাবে পরিকল্পনা কমিশনে। সেখানে পাস হলে সেটা পাঠানো হবে জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক)। একনেকে অনুমোদনের পর শুরু হবে বাস্তবায়ন পর্যায়।

অবশ্য সংশোধিত প্রস্তাবনায় জোয়ারাধার (টিআরএম) কার্যক্রম বাদ দেওয়া হলেও পটভূমিতে বলা হয়, ২০১৩ সাল থেকে বিল খুকশিয়ায় সাত বছর মেয়াদি জোয়ারাধার কার্যক্রম পরিচালনা বন্ধ হয়ে যায়। বিল খুকশিয়ার পর বিল কপালিয়ায় জোয়ারাধার পরিচালনা সম্ভব না হওয়ায় ২০১৩ সাল থেকে সাগরবাহিত পলি ভবদহ ও তৎসংলগ্ন এলাকার নদী ও খালগুলোকে ক্রমান্বয়ে ভরাট করে ফেলে। ফলে ২০১৫ ও ১৬ সালের বর্ষাকালে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।

ভবদহ পানি নিস্কাশন সংগ্রাম কমিটির নেতারা জানান, ভবদহ অঞ্চলে জোয়ারাধার বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যশোরে ২০১৭ সালের ১৬ মাচের্র এক জাতীয় কর্মশালায়। তৎকালীন পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ কর্মশালায় ঘোষণা দিয়েছিলেন, পরের শুস্ক মৌসুমে জোয়ারাধার বাস্তবায়ন শুরু হবে। কিন্তু এর পর কার্যক্রম আর এগোয়নি। পরে সংগ্রাম কমিটির নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে পানিসম্পদমন্ত্রী জোয়ারাধার বাস্তবায়নের কথা আবারও প্রকাশ করেন। এ জন্য পাউবো একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়।

এর পর এ ক্ষেত্রে দৃশ্যত অন্য কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। তবে গত ২ আগস্ট পানিসম্পদমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু প্রকল্প প্রস্তাবনায় স্বাক্ষর করেন। কিন্তু গত ১৮ জুলাই পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব ভবদহ পরিদর্শনে এসে স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় ঘোষণা দেন, জোয়ারাধার ভবদহ জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধানের কোনো পথ নয়। এতে জলাশয় শূন্য হবে। সমস্যা সমাধানে নদী-খাল কাটতে হবে।
কেশবপুরে পুলিশের বিশেষ অভিযানে গ্রেফতার ১৫

এ প্রসঙ্গে সংগ্রাম কমিটির উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, নদী কেটে নদী বাঁচানো যায় না; নদীর প্রবাহ নিশ্চিত করেই কেবল তা বাঁচানো সম্ভব। নদী বাঁচাতে হলে সাগর থেকে উঠে আসা পলি বিলে বিলে ধারণ এবং উজানের পানিপ্রবাহের নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। তিনি বলেন, গত চার বছর ধরে নদী কাটা হচ্ছে। এতে নদীর অবস্থা ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। চলতি বছর নদীগুলোর অবস্থা ভয়াবহ খারাপ। প্রায় ৫০ কিলোমিটার নদী পলিতে ভরাট হয়ে গেছে। এ অবস্থায় টিআরএমের কোনো বিকল্প নেই।

উল্লেখ্য, মূল নদীসংলগ্ন যে কোনো একটি নির্বাচিত বিলের তিন দিকে পেরিফেরিয়াল বাঁধ নির্মাণ করে অবশিষ্ট দিকের বেড়িবাঁধের একটি অংশ উন্মুক্ত করে বিলে জোয়ারভাটা চালু করা হয়। এটাই টিআরএম বা জোয়ারাধার নামে পরিচিত। এ পদ্ধতিতে সাগর থেকে জোয়ারের সঙ্গে আসা পলি পর্যায়ক্রমে এলাকার একটি করে বিলে ফেলে বিল উঁচু করার পাশাপাশি নদীর নাব্য বাড়ানো হয়। এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষকদের উদ্ভাবিত একটি সনাতন কৃষি-পদ্ধতি।
অতীতে কৃষকরা বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে নদীতে বাঁধ দিয়ে নোনা পানি ঠেকিয়ে আবাদ করতেন এবং আবাদ শেষে বাঁধ কেটে জোয়ারের পলি তুলে বিল উঁচু করে নিতেন। এর নামই অষ্টমাসী বাঁধ। মাঘী পূর্ণিমায় বাঁধ দিয়ে আষাঢ়ী পূর্ণিমায় খুলে দেওয়া হতো। এইভাবে একই সঙ্গে চলত চাষাবাদ আর ভূমি গঠনের কাজ। এতে নদীতে নাব্য থাকত। নদী দিয়ে পানি নিস্কাশিত হওয়ায় কোনো জলাবদ্ধতাও সৃষ্টি হতো না।

যশোর শহরসহ ভবদহ অঞ্চলের পানি নিস্কাশিত হয় মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদী দিয়ে। সাগর থেকে প্রতিদিন দুইবার জোয়ারের পানি নদীগুলো দিয়ে ভবদহ অঞ্চলে আসে। তার পর একইভাবে সাগরে ফিরে যায়। কিন্তু পলি পড়ে মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদী নাব্য হারিয়েছে। ফলে পানি নিস্কাশিত না হওয়ায় গত কয়েক বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে ভবদহের অসংখ্য বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, মাছের ঘের, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পানিতে তলিয়ে যায়। অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হয় এলাকার কয়েক লাখ মানুষ।-তৌহিদুর রহমান।

Leave a Reply

Your email address will not be published.